এই লেখা একজন ইংরেজ নারীকে নিয়ে। নাম মেরি অ্যান বিভান। একসময় তিনি নিজেকে ‘পৃথিবীর কুশ্রীতম নারী’ বলে পরিচয় দিতেন। জীবনজয়ী প্রতিবেদনের জন্য তথ্য নেওয়া হয়েছে হেক্টোয়েন ইন্টারন্যাশনাল ও হিস্ট্রি ইজ নাও ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন থেকে।
মেরির জন্ম ১৮৭৪ সালে ইংল্যান্ডে। আট ভাইবোনের একজন। বাইশ বছর বয়সে তিনি নার্সের কাজ শুরু করেন। জীবন তখন মোটামুটি সাধারণভাবেই চলছিল। ১৯০২ সালে বিয়ে করেন থমাস বিভানকে। তাঁদের চার সন্তান হয়। দুই মেয়ে, দুই ছেলে। সংসার ভালোই চলছিল তখন। ১৯১৪ সালে থমাস হঠাৎ মারা যান। মেরি একা হয়ে পড়েন। সংসারের সব ভার এসে পড়ে তাঁর ওপর। চার সন্তানের দায়িত্ব তাঁকে একাই নিতে হয়।
এর কিছুদিন আগে থেকেই মেরির শরীরে বদল আসতে থাকে। বয়স তখন প্রায় বত্রিশ। ১৯০৬ সালের দিকে তাঁর মুখের গঠন পাল্টাতে শুরু করে। মাথাব্যথা বাড়ে। চোখে কম দেখতে শুরু করেন। পরে জানা যায়, তাঁর শরীরে একটি রোগ বাসা বেঁধেছে। রোগের নাম অ্যাক্রোমেগালি। এই রোগ সাধারণত পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার হলে হয়। শরীরে তখন গ্রোথ হরমোন বেশি তৈরি হতে থাকে। এর ফলে মাথার খুলি বড় হয়ে যায়। নাক চওড়া হয়। চোয়াল বেড়ে যায়। হাত-পায়ের আঙুল মোটা হয়ে যায়। মেরির পায়ের মাপও অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। এই রোগ কোনো দোষে হয় না। এটা ছিল নিছক একটি শারীরিক অসুস্থতা। কিন্তু সমাজ তাঁকে সহজভাবে নেয়নি।
এই বদলের কারণে মেরি আর নার্সের কাজ করতে পারেননি। টুকটাক কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু চেহারার কারণে কেউ তাঁকে কাজে রাখতে চাইত না। চার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়া দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ে। টাকার অভাবে তাঁর হাতে খুব বেশি পথ খোলা ছিল না।
এখানে পড়ুন: অযোধ্যা: আনিসের ঘোড়া গাড়িতে রামের বারাত
সেই সময় পশ্চিমা দুনিয়ায় এক ধরনের প্রদর্শনী খুব জনপ্রিয় ছিল। যেখানে মানুষকে তার আলাদা চেহারার জন্য দর্শকদের সামনে হাজির করা হতো। এটাকে তখন স্বাভাবিক বিনোদন হিসেবেই দেখা হতো। মেরির জীবনও একসময় সেই পথেই মোড় নেয়। এমন কঠিন সময়ে একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। আয়োজকেরা তখন ‘কুশ্রীতম নারী’ খুঁজছিল। উপায় না দেখে মেরি নাম লেখান সেই প্রতিযোগিতায়। জিতেও যান। এরপর কাজ পান নিউইয়র্কের কনি আইল্যান্ডে একটি প্রদর্শনীতে। মানুষ টাকা দিয়ে সেখানে তাঁকে দেখতে আসত।
শুধু মেরি একা ছিলেন না সেখানে। আরও অনেকে কাজ করতেন সেই প্রদর্শনীতে। তাঁদের শরীরের গঠন সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা ছিল। কারও উচ্চতা খুব কম। কারও চেহারা একেবারে ভিন্ন। সবাইকে দাঁড় করানো হতো দর্শকদের বিনোদনের জন্য। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য পরে ভালো আয়ও করেছিলেন, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে।
মেরির চিকিৎসক এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি একটি পত্রিকায় চিঠি লেখেন। প্রতিবাদ জানান। বলেন, রোগ নিয়ে ঠাট্টা করা ঠিক নয়। তবু মেরি সেই কাজ চালিয়ে যান। তাঁর হাতে অন্য কোনো পথ ছিল না। জীবনের বাস্তবতা তাঁকে সেই পথেই রেখে দিয়েছিল।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি মেরি নিজের ছবিওয়ালা পোস্টকার্ডও বিক্রি করতেন। এভাবে বছরের পর বছর কাজ করে তিনি অনেক টাকা আয় করেন। প্রায় পঞ্চাশ হাজার ডলার। আজকের হিসেবে যা প্রায় দশ লাখ ডলারের সমান। এই টাকায় তিনি সন্তানদের লেখাপড়া চালান। তাঁদের ভরণপোষণ করেন। এটাই ছিল মেরির জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। নার্সের কাজ করে এত টাকা তিনি কখনো আয় করতে পারতেন না।
এখানে পড়ুন: ছাড়া পেয়ে পাখি শূন্যে উড়াল দেয়
১৯৩৩ সালে মেরি মারা যান। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল একটাই। তাঁকে যেন ইংল্যান্ডে কবর দেওয়া হয়। সেই ইচ্ছা পূরণও হয়েছিল।
মেরির গল্প শুনলে মন খারাপ হয়। কেউ কেউ বলেন, এটা তাঁর জীবনের জয়ের গল্প। কেউ আবার বলেন, এটা সমাজের নিষ্ঠুরতার গল্প। দুটো দিকই হয়তো সত্যি। কিন্তু এর ভেতরে একটি শক্ত বার্তাও আছে। জীবনের কঠিন সময়ে মানুষ কতটা লড়তে পারে, মেরি তার একটি উদাহরণ। সমাজ তাঁকে যেভাবে দেখেছে, তিনি নিজেকে সেভাবে হারাতে দেননি। বরং নিজের কঠিন পরিস্থিতিকেই সম্বল করেছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েছেন সেই সম্বল দিয়ে।
আমাদের আশপাশেও এমন মানুষ আছেন, যাঁরা শারীরিক ভিন্নতা নিয়ে বেঁচে থাকেন। কঠিন অসুস্থতা নিয়েও বেঁচে থাকেন। সমাজ অনেক সময় তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয় না। কাজের জায়গায় সুযোগ পান না। একটু বোঝাপড়া দেখাতে পারলে, একটু সম্মান দেখাতে পারলে, তাঁদের জীবনযুদ্ধ কিছুটা সহজ হয়ে যায়।
এখানে পড়ুন: থ্রি স্টুজেসের কাহিনি