শীতকালের এক-দেড় মাস ছাড়া প্রায় সারা বছর গরম থাকে শহরে। কিন্তু গ্রামে সে রকম নয়। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভ্যাপসা গরম কাটিয়ে প্রকৃতির রঙ বদলের প্রথম ডাক পাওয়া যায়। রাজধানী শহরে পড়তে আসার পর থেকে, দুই ঈদের লম্বা ছুটি ছাড়া এখন আর গ্রামে যাওয়া হয় না। গত বছর করেই সেপ্টেম্বরে চলে গিয়েছিলাম গ্রামের বাড়ি। ঢাকা থেকে কয়েক ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে, উপশহর থেকে পাকা রাস্তা পেরিয়ে, কাঁচা পথে কিছুক্ষণ হাঁটলে আমাদের বাড়ি।
মেঠো রাস্তার দুই ধারে বাঁশঝাড়! এর ফাঁকে ফাঁকে বয়স্ক আম, কাঁঠাল, পিতরাজ, চেওয়া সুপারি আর অজানা গাছপালায় দুই পাশের জঙ্গল ঠাসা। যেখানে ভরদুপুরের ভ্যাপসা গরমে পোকামাকড় আর পাখির গুঞ্জনে আশপাশ মাতিয়ে রাখে।
আমাদের বাড়িতেও আগে নানান জাতের ফলের-ফুলের গাছ ছিল। তাদের অনেকে এখন বয়সের ভারে প্রাচীন হয়েছে। এখন আর ফল না দিলেও বেঁচে আছে। আগে গ্রামের সবচেয়ে উঁচু নারকেল গাছ, বটগাছ, জামরুল গাছে দলবেঁধে টিয়া পাখি আসত। স্কুলে থাকতে ছুটির সময়ে সেগুলো দেখতে যেতাম। আরও দেখতাম বৌ কথা কও, মৌটুসী, ইষ্টিকুটুম, দোয়েল, শালিক, টুনটুনি, ফিঙের ঝাঁক! এখন আর তেমন পাখি দেখা যায় না। নির্জন দুপুরে হয়তো মাঝেমধ্যে দোয়েলের ডাক শোনা যায়। তবে ঘরের কোণায় বরই গাছে যখন নতুন মুকুল আসে, সকালবেলা ছোট ছোট চড়ুই পাখির দল কিচিরমিচির করে।
আমাদের বাড়িতে এখন আর খুব একটা মানুষজন থাকে না। প্রায় সবাই শহরমুখী। আপনজনেরা অনেকে গত হয়েছেন। এখন বাড়িতে প্রবীণ গাছপালাগুলোকেই আপন লাগে। খুব চেনা-পরিচিত বলতে এখন শুধু রং ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া একটা আধা-পাকা ঘর, আর ঘরের সামনে লাগানো কয়েক রকমের বর্ণিল ফুলগাছ! যেগুলোর সঙ্গে আমার পরিচয় সেই কৈশোর থেকে।
একদিন, প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে! ঘরে ঢোকার ঠিক আগ মুহূর্তে চোখে পড়ে, পেছনের বারান্দার গ্রিল দখল করে নিজের মতো রাজত্ব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নীল অপরাজিতা ফুলগাছটির দিকে। আগে কত চেয়েছি গাছগুলোকে বারান্দার গ্রিলে তুলতে; উঠতে চাইত না। এখন পুরো গ্রিল জুড়ে অপরাজিতা তার সবুজ শরীর আর নীল ফুলে ভরে রেখেছে।
পরদিন সকালে বারান্দায় পা দিয়ে দেখি, নরম-নরম রোদ অপরাজিতার ফুল-পাতা ভেদ করে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় এই আলোতে ধরে সুন্দর সুন্দর বইয়ের ফটোগ্রাফি করতাম।
বারান্দা থেকে বাইরে পা দিলে বাগানবিলাস ফুলের গাছ। গাছটার এখন বয়স হয়েছে, পাতা নেই, কিন্তু ফুল ফুটে থাকে সবসময়। গোলাপি রং যে আসলে মিষ্টি রং, সেটা আমাদের বাগানবিলাস না দেখলে বুঝতে পারতাম না। বাগানবিলাসের পাশেই অলকানন্দা। নিজের আনন্দে সে ফুল ফুটিয়ে চলেছে। তার পাশেই শিউলি। আর কিছুদিন গেলে শিউলিও ফুটতে শুরু করবে। ঘরের কোণায় থাকা সেই পুরনো বরই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে শিউলি গাছটি আমায় দেখে নিভৃতে মাথা নাড়ে এখনো।
একটা গাছ, একটা ফুল কীভাবে সময়কে, মানুষকে, স্মৃতিকে ধরে রাখে, তা শিউলিকে দেখে মনে পড়ে গেল। কারণও আছে! অক্টোবর মাস এলেই চোখে ভাসে শিউলি। আমাদের পাশের বাড়ির অমিতের ঠাম্মা যখন বেঁচে ছিলেন, প্রতিদিন ভোরবেলা শিউলি কুড়োতে আসতেন। এখনো যখন শিউলি ফুল দেখি, তখন অমিতের ঠাম্মার সাদা কাপড় পরে ফুল কুড়ানোর দৃশ্য চোখে ভাসে। আর অক্টোবর এলেই কেন জানি মনে হয়, অদৃশ্য শিউলি শুভ্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে।
গ্রামের বাড়িতে আমার আরও কিছু প্রিয় গাছ আছে। বেশিরভাগ গাছের শুদ্ধ নাম আমার জানা নেই। আমার ছেলেবেলা যেভাবে কেটেছে, তার পুরো রেশ এখনো রয়ে গেছে এই বয়স্ক গাছগুলোর মাঝে। এখনো চারপাশে যখন ফুল-লতা-পাতা দেখি, ছোটবেলার বাড়িতে কাটানো সময়গুলো ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ভেসে ওঠে পুরোনো মানুষ আর তাদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি। মনের ভেতর চঞ্চলতা নেচে উঠতে চায় পুরোনো শৈশবের তালে।
শহরের রোদকে মনে হয় আলাদা; এযেন নাগরিক রোদ। বাতাসকে মনে হয় আলাদা বাতাস। সে বাতাসের গন্ধও আলাদা। তবে শহরের ফুলগুলোকে নাগরিক ফুল মনে হয় না। আমার বাসার ব্যালকনিতে ছোট-বড় অনেক গাছ লাগানো হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই বসা হয় গাছপালার সঙ্গে। টবে বাগানবিলাস, অপরাজিতা, ছোট টগর, দোলনচাঁপা, চামেলি, বেলিসহ লতানো বিভিন্ন প্লান্টসহ আরও নানা রকম উদ্ভিদ। প্রায়ই চেষ্টা করি নতুন নতুন পুষ্পবৃক্ষ সংগ্রহ করতে।
মনে হয়, এই গাছগুলো আমায় বাঁচিয়ে রেখেছে বড় আদরে। বেঁচে থাকার অর্ধেকটা সময় যেন এই গাছগুলোর মাঝেই মিশে আছে। যারা স্মৃতির জানালায় পুরোনো চিঠির মতো হঠাৎ করেই মুছে দেয় ক্লান্তি।
ব্যালকনির প্রতিটি গাছ যেন জীবনের একেকটি স্তবক। তাদের ডালে পাখিরা বসে গান গায়, আর আমি শুনি, শব্দ নয়, একপ্রকার নীরব সুর। যে সুর পুরোনো স্মৃতিকে জীবিত করে তোলে। আর তাই আমি এই সবুজঘেরা ব্যালকনির মাঝে দাঁড়িয়ে, একটু একটু করে ভুলে যাই শহরের কোলাহল, ভুলে যাই ব্যর্থতা আর হাহাকার।
এই গাছ-লতা-পাতা-ফুলগুলো, যারা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এখনো সেই দুচোখভরা স্বাপ্নিকের বেশে, তারা যেন প্রতিদিন সকালের নরম রোদ মেখে আমার কানে কানে এসে বলে, “তুমি এখনো বেঁচে আছো, জীবন এখনো সুন্দর।”