জীবনের মানে অনেক ব্যাপক। আবার, জীবন অনেকটা স্বপ্নের মতো- কখনও মেঘলা, কখনও ঝলমলে। এই ভালো, এই খারাপ। এক কথায় জীবনটা যেন এক গোলকধাঁধা! যে ধাঁধার শুরুর বিন্দু জন্ম, আর শেষটা অনিবার্য মৃত্যু। তবে মৃত্যুর আগে ঘটে এক দীর্ঘ যাত্রা, যা আবৃত থাকে এক বিস্ময়-জাগানিয়া মায়াজালে। আর সেই মায়াজালেই আবদ্ধ থাকে সৃষ্টি জগতের সকল প্রাণী।
এই গোলকধাঁধায় আমার পদচারণা শুরু হয়েছিল এক সোনালি শুরুর আভাস নিয়ে। আমার মায়ের ভাষ্য মতে, সোনার চামচ মুখে নিয়েই আমি পা রেখেছি জীবন নামে এই গোলকধাঁধায়। কিন্তু কে জানতো, সেই চামচের নিচে ছিল ছুরি, ছিল কাঁটা। যেন এক রাজকুমারীর অদ্ভুত আশীর্বাদিত বিপন্নতার জগতে আগমন! জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত তো আর কম ঘটন-অঘটনের সাক্ষাৎ পাইনি!
জীবনে অঘটনের দেখা পেতেও আমার বেশিদিন সময় লাগেনি। প্রথমটির দেখা মেলে যখন আমার বয়স মাত্র ছয় মাস। সে যাত্রায় প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আমার মস্তিষ্কের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ওটা ব্যাপার না… যাক গে, শেষ পর্যন্ত সামলে তো উঠেছি! গোলকধাঁধাঁর এই যাত্রায় চোখে স্বপ্ন আর মনে গল্প নিয়ে ধীরে ধীরে আমি হাঁটতে শিখেছি পেছনের সীমাবদ্ধতা বুকে করে।
এরপর স্কুলে ভর্তি করা হলো বিদ্যালাভের জন্য। আমি বরাবরই দারুণ ফাঁকিবাজ ধরণের ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্যি যে, আমার পরীক্ষার ফলাফলের উপর সেটার তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। ঐ সময়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ডুবে থাকতাম রূপকথার রাজ্যে। সেই রূপকথার রাজ্যে রাজকন্যা-রাজকুমার, রাজা-রানী, দৈত্য-দানবদের সাথে ছিলো আমার বেজায় সখ্যতা! কিন্তু এই সখ্যতার ভাটা পড়ে যখন কলেজে উঠি। জুটে যায় কিছু বন্ধু-বান্ধবী। আড্ডা আর হাসির মাঝে জীবন হয়ে ওঠে যেন এক ক্যানভাস, যেখানে আনন্দ আর উদাসীনতা মিলে আঁকা হয় জীবনের মুখ।
এই আবর্তটা যেন এক দিগন্তহীন সন্ধ্যার মতো, যার আলো ক্রমশ রূপ বদলায়- মায়া থেকে মরণ, বন্ধুত্ব থেকে বিচ্ছেদ, প্রশান্তি থেকে প্রতিক্রিয়া। আড্ডাবাজি, হৈ-হুল্লোড় দিয়ে শেষ হতে থাকে আমার কলেজ জীবন। আমার চেনা পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। স্বপ্নগুলো আর শুধু রূপকথা নয়, তারা এখন বাস্তবতা ছুঁতে চায়। কখনও আসে পরীক্ষার ব্যর্থতা, কখনও সম্পর্কের জটিলতা, কখনও নিজের সঙ্গে সংঘাত। এই সময়েই টের পাই- জীবনের গোলকধাঁধা শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও বিস্তৃত। নিজেকে চিনতে গেলে, অনেকগুলো দরজা পেরোতে হয়। কিছু দরজা খুলে দেয় বিস্ময়ের জানালা, আর কিছু দরজা… চিরকালই বন্ধ থাকে।
কিন্তু এই সময়টাতেই শুরু হয় জীবনের মায়াজালের আবর্তে আটকে পড়া। এই মায়াজালে আগমণ ও বিচরণ করে একঝাঁক প্রজাপতি। যারা আমার জীবনকে রাঙিয়েছে বিচিত্র সব রঙে। সাদা, লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙের উপস্থিতি যেমন ছিলো, তেমনি ছিলো কালো রঙের ছায়াও। কেউ থেকে গেছে এখন পর্যন্ত, কেউ বা হারিয়ে গেছে এই গোলকধাঁধা থেকে। আবার হয়তো কেউ কেউ হারাবে একদিন। হারাবে কি? কী জানি!
যেদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই, আমার বাবা-মায়ের খুশি দেখে কে! আর আমি? আমি তো সেদিন পেয়েছিলাম এক মুক্ত পাখির ডানা,সেদিন ছিলো আমার উড়াল দেবার দিন! উপলব্ধি করেছিলাম, যেন নিজেই হয়ে উঠেছি এক ফিনিক্স পাখি! আগুনে ঝলসে গিয়ে নতুন রূপে ফিরে এসেছে যে। এই নাতিদীর্ঘ জীবনে সাগরের অনন্ত জল যেমন ছুঁয়েছি, তেমনি পেয়েছি পাহাড়ের দর্শনও। তবু উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে এখনো ঘুরছি এই গোলকধাঁধায়। জীবনটা সবসময় যুক্তিযুক্ত নয়, অনেকটা তাড়নায় ভাসা স্বপ্নের মতো। আমার নিজের জীবনটাও কখনও নিঃশব্দ প্রশ্নে ভরা, কখনও সীমারেখাহীন আশাবাদে। মাঝেমধ্যে ভাবি, এই গোলকধাঁধা কি শুধুই বাহ্যিক জটিলতা? না কি তা আমার ভেতরের প্রতিচ্ছবি? একটা ছোট্ট ঘটনা, একটা নীরব বিকেল, অথবা মা’র সেই সকালবেলা ছাদে বসে রোদে কাপড় শুকানোর মুহূর্ত- সবই যেন হয়ে ওঠে ধাঁধার একেকটা সূত্র। এইসব ছোট ছোট স্মৃতি, প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি বিদায়- এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই আমি গড়ে উঠেছি। আর এই গড়নটাই, হয়তো একদিন এই গোলকধাঁধার চূড়ান্ত সমাধান দেবে।
যাই হোক, বাঁধা এসেছে অনেক। কিন্তু দমাতে পারেনি। আর পারবেও না। নাকি পারবে? এই প্রশ্নটা জমা রয়ে যাক। জীবনের এই ধাঁধার শেষ প্রান্তে, যেদিন মৃত্যুর সঙ্গে প্রথম পরিচয় হবে, সেদিন হয়তো জানা যাবে আসলে কে হারল, কে জিতল। আমি, নাকি এই গোলকধাঁধা? সে কি আদৌ ছিলো নাকি না?