কে রবিনহুড? নিখুঁত ধুরন্ধর এক তীরন্দাজ। দস্যু বটে। তবে তার দস্যুতা নিজের জন্য নয়। দরিদ্রজনের সখারুপে লোককথায় তুমুলভাবে বিরাজমান রবিনহুড ও তার বন্ধুরা। রবিনহুড নিয়ে লোকে বিভক্ত। রবিনহুড বলে কেউ কোনকালে ছিলো না - এই মত অনেকের। অন্যদিকে, রবিনহুড বলে একজন মানুষ এককালে সত্যিই ছিলেন বলে দাবি একদল মানুষের। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট হিস্ট্রি ইউকেতে বেন জনসনের লেখা একটি প্রবন্ধ অনুসারে, রবিনহুড ছিলেন আসলেই এক বাস্তব চরিত্র।
ব্রিটিশ জাদুঘরে
সংরক্ষিত স্লোয়ান পান্ডুলিপি অনুসারে, আনুমানিক ১১৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের সাউথ
ইয়র্কশায়ারের লকারস্লিতে জন্মগ্রহণ করেন রবিনহুড। তবে, অন্য এক ইতিহাসবিদের মতে, তার
জন্ম ওয়েকফিল্ড শহরে এবং তিনি ১৩২২ সালের ল্যাংকাস্টারের বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। কিছু
ইতিহাসবিদের মতে, রবিনহুডের আবির্ভাব রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের সময়। আবার অনেকে বলেন,
তিনি রাজা প্রথম রিচার্ড বা সিংহহৃদয় রাজার সময়কার মানুষ। যদিও জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ
আছে, তবে এরা সবাই একমত যে, তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের কোনো এক গ্রামের সন্তান।
পরবর্তীতে তিনি পরিচিত হন শেরউড জঙ্গলের আতঙ্ক হিসেবে। রবিনের ঘাঁটি ছিল ইয়র্কশায়ারের
উপকূলীয় অঞ্চলে।
রবিনহুড ও
তার বিশ্বস্ত সহচর লিটল জন একবার গিয়েছিলেন ইয়র্কশায়ারের হুইটবির দিকে। সেখানে দুই
বন্ধু মজা করে নিজেদের মধ্যে এক তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা শুরু করেন। এরা দুজনেই ছিলেন
অসাধারণ তীরন্দাজ। প্রতিযোগিতা চলাকালীন তারা সিদ্ধান্ত নেন— দুজনে একসঙ্গে তীর ছুঁড়বেন,
আর তীর যেখানে পড়বে, সেটাই হবে তাদের আস্তানা। এক মঠের ছাদ থেকে ছোঁড়া দুজনের তীর গিয়ে
পড়ে প্রায় এক মাইল দূরে একটি কারখানার সামনে। সেই জায়গাটি পরবর্তীতে পরিচিত হয় রবিনহুড
ও লিটল জনের আস্তানা নামে।
রবিনহুড ছিলেন
এক বিদ্রোহী হৃদয়ের মানুষ। তিনি ঘৃণা করতেন শেরিফ নামে পরিচিত স্থানীয় আইনরক্ষকদের,
যারা আইনের নামে সাধারণ মানুষকে নিপীড়ন করত। রবিন এদের সম্পদ লুট করে এনে দান করে দিতেন
দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের মাঝে। এই দানশীলতার কারণে তিনি হয়ে ওঠেন ইংরেজি লোককাহিনীর
সবচেয়ে জনপ্রিয় হিরো।
প্রচলিত একটি
গল্পে বলা হয়েছে, ক্রুসেড শেষে ইংল্যান্ডে ফিরে রবিন দেখতে পান, শেরিফরা তার আস্তানা
দখল করে নিয়েছে। তখন থেকেই শুরু হয় তার বিদ্রোহী জীবনের যাত্রা।
শেষ জীবনে
বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রবিন পাড়ি জমান হাডার্সফিল্ড অঞ্চলের কার্কলেস শহরে, তার এক
আত্মীয়ার কাছে। সেখানে সংঘটিত হয় ইতিহাসের এক করুন অধ্যায়। আশ্রয়দানকারী আত্মীয়া একদিন
ধারালো অস্ত্র দিয়ে অসুস্থ রবিনের শরীর থেকে রক্ত বের করে দিতে থাকেন। জনৈক রজার ডি
ডাঙ্কাস্টারের ষড়যন্ত্রে এই ঘৃন্য অপরাধটি করেন এই আত্মীয়া। নির্জীব হয়ে যাবের আগ মুহূর্তে
বাঁশি বাজিয়ে লিটল জনকে ডাকেন রবিন। কিন্তু
ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। লিটল জন তাকে জানালার কাছে নিয়ে যান। রবিন তার প্রিয় ধনুক
দিয়ে একটি তীর ছোঁড়েন, এবং অনুরোধ করেন—তীর যেখানে পড়ে, সেখানেই যেন তাকে সমাধিস্থ
করা হয়। এত শতাব্দী কেটে যাবার পর আজও সেই জায়গায় একটি উঁচু ঢিবি দেখা যায়। লিটল জনের
কবরের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছে ডার্বিশায়ারের হিদারসেজ গির্জা প্রাঙ্গণে।
রবিনহুড নামের
কেউ একজনের হদিস পাওয়া গেলেও, তার প্রেমিকা ম্যারিয়নের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া
যায়নি। ধরে নেওয়া হয়, ম্যারিয়ন একটি কাল্পনিক চরিত্র—যা রোমান্টিক গল্পকারদের সৃজন।
বেন জনসনের মতে, ইতিহাসে একজন সত্যিকারের রবিনহুড ছিলেন। তবে তিনি ঠিক সিনেমায় দেখা
চড়া-রঙয়ের চরিত্রটির মত ছিলেন না।
রবিনহুডের গল্প আজও ছড়িয়ে আছে কবিতায়, গানে, উপন্যাসে, সিনেমায়। তিনি ইতিহাসের সেই বিরল দস্যু — যিনি দস্যুতা করে হয়েছেন হিরো। রবিনহুড বেঁচে আছেন এক রোমান্টিক ন্যায়বোধের প্রতীক হয়ে লোককাহিনীর পাতায়-পাতায়, আর মানুষের কল্পনায়।