সৌজন্য, বাৎসল্য আর আন্তরিকতা বাঙালি তথা বাংলার ঐতিহ্য। বহুকাল ধরে বাংলার মানুষ ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে একসঙ্গে বাস করে আসছে। তাই ‘রাম-রহিমের দেশ’ বিশেষণে বাংলাকে আমরা বিশেষায়িত করি।
পিরোজপুর জেলার একটি ছোট্ট গ্রামে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। গ্রামের নাম কুমারখালী। ধনী-দরিদ্র মিলিয়ে প্রায় শ'চারেক পরিবারের বাস আমাদের গ্রামে। জরিপ করলে দেখা যাবে, এখানকার এক-চতুর্থাংশ মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী। বাকিরা সবাই মুসলমান। কিন্তু তাদের সহাবস্থানে ধর্ম বা পেশাগত ও সামাজিক শ্রেণি কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এখানকার সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গ্রামের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করে। মুসলমানরা প্রতিবছর ঈদের আনন্দ সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং প্রীতিভোজে নিমন্ত্রণ জানায়। মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসে এখানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কোনো না কোনো দিন ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেখানেও অংশ নেন হিন্দু প্রতিবেশীরা।
এখানে পড়ুন: আমার কিশোরীকাল: এক
এখানে মহাসমারোহে পালিত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে গ্রামের প্রায় সব পরিবারে সাধ্যমতো বিতরণ করা হয় মিষ্টি, নাড়ু, বাতাসা, লুচি প্রভৃতি। মুসলমানরাও সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে অনন্য স্বাদের এসব খাবার উপভোগ করার জন্য। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিবছর পালিত হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতীর আরাধনা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরাই নিজেদের উদ্যোগে এই আয়োজন করেন। আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও। এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বিদ্যালয়ের হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীরা। দর্শকসারিতে উপস্থিত থাকেন গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা।
গ্রামের প্রায় প্রতিটি বিয়েবাড়িতে অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন পর্যন্ত সব কাজে দুই ধর্মের নবীন-প্রবীণদের অংশগ্রহণ থাকে। মুসলমান বাড়ির নারীদের কাছে আলপনায় পারদর্শী হিন্দু প্রতিবেশিনীর কদর বাড়ে। তরুণীরা হাত লাগায় কনের সাজসজ্জাসহ নানা শৈল্পিক ও নান্দনিক কাজে। আমাদের গ্রামের প্রায় সব বিয়েতেই একধরনের বিশেষ বিয়ের গান প্রচলিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই গান পরিবেশনের জন্য ডাক পড়ে হিন্দু প্রবীণাদের। এভাবেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গ্রামের সবাই সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। দিন শেষে একাকার হয়ে যায় শঙ্খধ্বনি আর আজানের সুর।
বিপদে-আপদে এই গ্রামের সবাই মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষজন লোকচক্ষুর আড়ালে দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সব প্রাকৃতিক দুর্যোগে একে অন্যের ঢাল ও আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে পড়ে, সিডর, আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ একে অপরের প্রতি যে সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে, তা সত্যিকার অর্থেই অনন্য।
এখানকার প্রতিবেশীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আপনাকে মুগ্ধ করবে। বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে পাশের বাড়ির বৃদ্ধ বা শিশুদের জন্য সেই খাবার পাঠানো হয়। সেই পাত্র আবার কখনোই শূন্য হাতে ফেরে না। সাধ্যমতো সৌজন্যের প্রকাশ ঘটে ফেরত পাঠানো পাত্রে। বিরাট কিছু নয়, হয়তো প্রতিবেশীর রান্না করা একবাটি তরকারিই হয়ে ওঠে দুই পরিবারের বন্ধুত্বের সেতু।
আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগেও এখানকার ছেলেমেয়েরা বই পড়তে ভোলেনি। এখনো এখানে এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরে বেড়ায় শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা বিভূতিভূষণের নাটক, উপন্যাস ও কবিতার বই। বাড়িতেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বইয়ের সংগ্রহশালা। বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে তৈরি হয় নতুন বন্ধুত্ব। আড্ডা আর আলোচনায় উঠে আসে সেসব বইয়ের গল্প। সত্য ও সুন্দরকে এখনো অনেকেই ধারণ করে আছে মননে, বিশ্বাসে ও চর্চায়। বহু দিন ধরেই মানবিক পরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠছে এই গ্রামের শিশু-কিশোরেরা।
এখনো বিকেল হলেই গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে নারীদের আড্ডা জমে। গল্পের ছলে চলতে থাকে কুশিকাঁটা কিংবা সুঁই-সুতার কাজ। এসব আড্ডায় চলে কুশল বিনিময় এবং গ্রামের সবার খোঁজখবর নেওয়া। আড্ডার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে রান্নাবান্না, শিশুর যত্ন কিংবা অতীতের নানা গল্প।
ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে মেতে ওঠে বিভিন্ন খেলায়। এর মধ্যে ক্রিকেট ও দাঁড়িয়াবান্ধা বেশ জনপ্রিয়। কারও কারও খেলার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে তাদের বিচিত্র সব সংগ্রহ। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা একত্র হন চায়ের দোকানে। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে চলমান পরিস্থিতি। একই সংবাদপত্র ঘুরে বেড়ায় বহুজনের হাতে। মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীরা মিলে আয়োজন করেন বনভোজন। কখনো চাঁদা তুলে, আবার কখনো নিজেদের বাড়ি থেকে চাল-ডাল সংগ্রহ করে তাঁরা এসব আয়োজন করেন। এর ফলে তাঁদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়, বলিষ্ঠ হয় পারস্পরিক ঐক্য।
প্রতিবছরই আমাদের গ্রামে তরুণদের উদ্যোগে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ফুটবল ও হাডুডু খেলা বিশেষ জনপ্রিয়। বর্ষাকালে সুবিধাজনক একটি সময়ে উৎসবমুখর পরিবেশে এসব খেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের কিশোর-তরুণেরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন উৎসাহী প্রবীণ এই খেলায় রেফারির দায়িত্ব পালন করেন। খেলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মাঠে ছোটখাটো একটি মেলা বসে। ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা ছোটদের খেলনা, ঘরে তৈরি খাবার আর হরেক রকম মনোহারি জিনিসের পসরা সাজান। খেলা শেষে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা থাকে। এসব খেলায় গ্রামের সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি জানান দেয় খেলাধুলার প্রতি তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা।
এখানে নবীনেরা বিনয়ী আর প্রবীণেরা স্নেহশীল। সততাকে সম্বল আর একতাকে পুঁজি করে চলে এখানকার মানুষের জীবনযাপন। এখানে পেশা শুধুই জীবনধারণের মাধ্যম আর ধর্ম কেবল একটি পথ। এখানে ভোর হলে আজানের সুরে ঘুম ভাঙে, আর সন্ধ্যাবেলায় শঙ্খধ্বনি শুনে শিশুরা খেলা শেষে বাড়ি ফেরে। এখানে সবার প্রচেষ্টা একটি সুখী ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই আমাদের গ্রামে দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবনে সাহায্য-সহযোগিতার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রয়েছে।