ইতিহাসে চেঙ্গিস খান পরিচিত এক প্রচন্ড শক্তিশালী শাসক ও সাম্রাজ্য বিস্তারকারী এক মঙ্গোলীয় হিসেবে। তবে তার জীবনের এমন একটি দিক আছে, যা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো তার প্রথম স্ত্রী বোর্তের সঙ্গে সম্পর্ক। বোর্তে শুধু তার স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন তার প্রেমিকা, জীবনসঙ্গী, বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা ও পরিবারের প্রধান ভরসা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, টিম কুইন্স, দ্য পিয়ারিয়ান জার্নাল ও চীনা ভাষার প্রশ্ন-উত্তরভিত্তিক ওয়েবসাইট ঝিহুতে প্রকাশিত বোর্তেবিষয়ক বিভিন্ন লেখা অবলম্বনে এই প্রতিবেদন।
বোর্তের জন্ম আনুমানিক ১১৬১ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন ওঙ্গিরাত গোত্রের নেতা দাই সেচেন। ছোটবেলাতেই বোর্তের সঙ্গে তেমুজিনের বিয়ের কথা ঠিক হয়। তেমুজিনই পরবর্তীকালে চেঙ্গিস খান নামে পরিচিত হন। বিয়ের পর তাঁদের সংসার শুরু হয়। কিন্তু সুখের সেই সময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বিয়ের কিছুদিন পর মেরকিত গোত্রের লোকেরা বোর্তেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
বোর্তেকে হারিয়ে তেমুজিন গভীর সংকটে পড়েন। স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাহায্য নেন। শেষ পর্যন্ত বোর্তেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এই ঘটনা তেমুজিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বোর্তেকে ফিরে পাওয়ার পর তাঁদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
বোর্তে ফিরে আসার সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তেমুজিন সে অবস্থায় বোর্তেকে নিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই বোর্তে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তেমুজিন এই সন্তানের নাম রাখেন জোচি। বোর্তে শত্রুর হাতে বন্দী অবস্থায় অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন বলে এই নবজাতকের পিতৃপরিচয় নিয়ে গোত্রের মধ্যে নানা রকম কথাবার্তা শুরু হয়। কিন্তু তেমুজিন এ ধরনের কোনো কথাবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে জোচিকে নিজের প্রথম সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন।
চেঙ্গিস খানের জীবনে অন্য স্ত্রী এবং নারীরা থাকলেও, বোর্তে ছিলেন তার প্রধান স্ত্রী। বোর্তে ছিলেন সেই নারী, যার সঙ্গে তেমুজিনের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল তার ক্ষমতা ও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই।
চেঙ্গিস খান যখন বিভিন্ন অভিযানে দূরে থাকতেন, তখন বোর্তে তার শিবির ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতেন। মঙ্গোলীয় সমাজে শাসকদের স্ত্রীদের কাজ শুধু সন্তান লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা পশুপালন, সম্পদ, কর্মচারী ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দেখাশোনা করতেন। বোর্তের শিবিরেও বহু মানুষ ও বিপুল সম্পদ ছিল। এত বড় একটি ব্যবস্থা পরিচালনা করতে ধৈর্য, দক্ষতা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন হতো। বোর্তে এই কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতেন।
বোর্তে শুধু সংসার সামলাতেন না, রাজনীতিতেও তার ভূমিকা ছিল। চেঙ্গিস খান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর পরামর্শ শুনতেন। রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পারিবারিক বিষয়ে বোর্তে নিজের মতামত দিতেন। চেঙ্গিস খানের কাছে তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন একজন মানুষ। ফলে স্বামীর অনুপস্থিতিতেও তিনি নিজের অবস্থান বজায় রাখতে পেরেছিলেন।
বোর্তের জীবন সবসময় সহজ ছিল না। অল্প বয়সে অপহৃত হওয়া এবং পরে বিশাল পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া ছিল কঠিন অভিজ্ঞতা। এর মধ্যেও তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। চেঙ্গিস খানের জীবনে তাঁর গুরুত্ব শুধু ভালোবাসার জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন স্ত্রী, মা, পরামর্শদাতা এবং একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক।
চেঙ্গিস খানের ইতিহাস সাধারণত সাম্রাজ্য, ক্ষমতা ও যুদ্ধের গল্প হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু বোর্তের জীবন সেই ইতিহাসের আরেকটি দিক সামনে আনে। দীর্ঘদিনের সঙ্গ, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং বোর্তের প্রতি চেঙ্গিসের নির্ভরতা তাদের সম্পর্কের গভীরতার কথা বলে। বোর্তের গল্প তাই শুধু একজন শাসকের স্ত্রীকে নিয়ে নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ভালোবাসা, দায়িত্ব ও বিচক্ষণতার মধ্য দিয়ে তিনি ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন।