‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ কিংবা ‘লাইফ উইথ দ্য কার্দাশিয়ানস’ এই রিয়েলিটি টিভি শোগুলোর কথা শোনেননি, এমন মানুষ নেই বললেই চলে। রিয়েলিটি টিভি শো মানে এমন একটি অনুষ্ঠান, যেখানে সিনেমার মতো সবকিছু সাজানো থাকে না। বরং সাধারণ মানুষের জীবনের মুহূর্তগুলো কোনো ফিল্টার ছাড়াই ক্যামেরায় ধরা হয়। সেটা হতে পারে নাচ-গানের লড়াই, নির্জন দ্বীপে টিকে থাকার লড়াই কিংবা বড় কোনো বাড়িতে একদল মানুষের ঝগড়া-বিবাদ। আমাদের সবার চোখ থাকে পর্দার ওই মানুষগুলোর ওপর, যাঁদের জীবনকে বাস্তব বলে মনে হয়। আমরা ভাবি, এটি বুঝি হালের ফ্যাশন। কিন্তু রিয়েলিটি টিভির ইতিহাস আসলে আট দশকের পুরোনো। হিস্ট্রি ডট কমের তথ্য অনুযায়ী, সিনেমার মতো চিত্রনাট্য ছাড়াই সাধারণ মানুষের জীবনকে পর্দায় তুলে ধরার এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে।
রেডিও থেকে টেলিভিশনের যাত্রা
অনেকেই মনে করেন, রিয়েলিটি শোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে আমেরিকান টেলিভিশনে ‘ক্যান্ডিড ক্যামেরা’ অনুষ্ঠান দিয়ে। আসলে এটি টেলিভিশনের আগে শুরু হয়েছিল রেডিওতে। ১৯৪৭ সালে অ্যালেন ফান্ট ‘ক্যান্ডিড মাইক্রোফোন’ নামে একটি রেডিও শো শুরু করেন। এর ধারণা ছিল খুব সহজ, প্র্যাংক তথা মজার করে ফাঁদে ফেলা। অর্থাৎ, অচেনা মানুষদের সঙ্গে এমন অদ্ভুত বা হাস্যকর কাণ্ড ঘটানো, যা তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না। আর আড়ালে থাকা মাইক্রোফোনে তাঁদের অপ্রস্তুত প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করে সম্প্রচার করা হবে।
১৯৪৮ সালে এই শোটি টেলিভিশনে আসে এবং এর নাম হয় ‘ক্যান্ডিড ক্যামেরা’। অনুষ্ঠানের শেষে যখন কৌতুকের শিকার ব্যক্তি বুঝতে পারতেন যে তাঁকে নিয়ে মজা করা হয়েছে, তখন বলা হতো সেই স্মরণীয় সংলাপটি: “হাসুন! আপনি এখন ক্যান্ডিড ক্যামেরায় আছেন!”
এভাবেই সাধারণ মানুষকে তাঁদের অজান্তে পর্দায় নিয়ে আসার একটি নতুন ধারার সূচনা হয়েছিল।
প্রথম ‘ডকুমেন্টারি’ ঘরানার রিয়েলিটি শো
আমরা এখন যে ধরনের রিয়েলিটি শো দেখি, যেমন ‘বিগ বস’ বা ‘দ্য কার্দাশিয়ানস’, তার আদি রূপ হিসেবে ধরা হয় ১৯৭৩ সালে পিবিএস চ্যানেলে প্রচারিত ‘অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি’কে। প্রায় ১২ ঘণ্টার এই ডকুমেন্টারি সিরিজে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারায় বসবাসকারী লাউড পরিবারের সাত মাসের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরা হয়েছিল।
সেখানে কোনো চিত্রনাট্য ছিল না, ছিল শুধু একটি সাধারণ পরিবারের বাস্তব সমস্যাগুলো। সেই শোতে স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সমকামিতার মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। লাউড পরিবারের বড় ছেলে ল্যান্স লাউড ছিলেন মার্কিন টেলিভিশনে প্রকাশ্যে সমকামী পরিচয় তুলে ধরা প্রথম ব্যক্তিত্বদের একজন।
গেম শো-এর বিবর্তন
রিয়েলিটি শোর আরেকটি জনপ্রিয় অংশ হলো প্রতিযোগিতা। শুরুতে এগুলো ছিল সাধারণ কুইজ ও প্রতিভা অন্বেষণের অনুষ্ঠান। ১৯৩৫ সালে রেডিওতে শুরু হওয়া ‘মেজর বাওস অ্যামেচার আওয়ার’ ছিল আজকের ‘আমেরিকান আইডল’ বা ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর মতো অনুষ্ঠানের পূর্বসূরি।
তবে প্রতিযোগিতামূলক রিয়েলিটি শোর আধুনিক রূপটি আসে ১৯৯৭ সালে সুইডেনের ‘এক্সপিডিশন: রবিনসন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই শোর নতুনত্ব সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এতে একদল পরস্পরের অপরিচিত মানুষকে নির্জন দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়। খাবার সংগ্রহ, থাকার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিযোগীদেরই নিতে হয়। প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচার করা হতো এই শোতে। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা প্রতিযোগী হতেন বিজয়ী। পরবর্তী সময়ে ‘এক্সপিডিশন: রবিনসন’-এর মার্কিন সংস্করণ ‘সারভাইভার’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এটি এখনো চালু আছে।
মানুষের ভরসার জায়গা আর রেডিও
টেলিভিশন আসার আগে মানুষ যখন রেডিওতে মগ্ন থাকত, তখনই রিয়েলিটি ধারণাটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকায় ‘দ্য গুডউইল আওয়ার’ নামে একটি রেডিও অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। সেখানে পরিচয় গোপন রাখা অতিথিরা তাঁদের দাম্পত্য জীবনের সমস্যা কিংবা গোপন দুঃখের কথা বলতেন। জন জে. অ্যান্থনি নামের একজন উপস্থাপক তাঁদের পরামর্শ দিতেন। মানুষের জীবনের এই বাস্তব কথাগুলো শোনার আগ্রহই আজ রিয়েলিটি শোকে শত শত কোটি ডলারের শিল্পে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে।
রিয়েলিটি টিভির দাপট
শুধু আমেরিকায় নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ও ইতালিতেও ট্যালেন্ট শোর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। জাপানের ‘কোহাকু উতা গাসেন’ এবং ইতালির ‘সানরেমো’ মিউজিক ফেস্টিভ্যাল রেডিও থেকে টেলিভিশনেও জায়গা করে নেয়। এসব আয়োজন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৫৬ সালে শুরু হয় বিখ্যাত ‘ইউরোভিশন সং কনটেস্ট’।
রিয়েলিটি শোর ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মানুষ সব সময় অন্যের জীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। চিত্রনাট্যের ছাঁচে তৈরি নাটকের চেয়েও সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না আমাদের বেশি টানে। গত ৮০ বছরে প্রযুক্তির পরিবর্তন হয়েছে, ক্যামেরার লেন্স আরও উন্নত হয়েছে, কিন্তু রিয়েলিটি টিভির মূলমন্ত্র একই রয়ে গেছে: বাস্তব মানুষের সত্যিকারের গল্প।
‘ক্যান্ডিড ক্যামেরা’ থেকে শুরু করে আজকের ‘সারভাইভার’ কিংবা ‘মাস্টারশেফ’, রিয়েলিটি টিভির পথচলা দীর্ঘ। এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবিও বটে।
প্রিয় পাঠক, সবশেষে আপনাদের কাছে একটি প্রশ্ন: রিয়েলিটি শোতে যা দেখানো হয়, তা কি পুরোপুরিই সত্যি? নাকি এর মধ্যেও অন্য কোনো গল্প আছে? আপনাদের কী মনে হয়?