যুগ পাল্টেছে। প্রতিটি ছেলেমেয়েই স্মার্ট দেশের স্মার্ট নাগরিক। সবার হাতেই স্মার্টফোন। গান শোনা, ছবি দেখা, গেম খেলা, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সারাক্ষণ যোগাযোগ রক্ষা করা, সবই হচ্ছে এই স্মার্টফোনের মাধ্যমে। আমাদের দিন এখন গানে ভেসে যায়, ছবিতে বোনা হয় স্বপ্ন, আর স্মার্টফোনে ছুঁয়ে ফেলা যায় অগণিত বন্ধুত্ব। তবে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি, স্মার্টফোনে আসক্তি কথিত স্মার্টনেস বাড়ালেও নিজের জীবন থেকেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
২০১১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। মোবাইল ছিল, কিন্তু স্মার্টফোন তখনো আমাদের গ্রামের জন্য বিলাসিতা। হঠাৎ-হঠাৎ এ-তার হাতে দেখা যেত। অনেক দিন ধরে বাবার কাছে আবদার করছিলাম, “বাবা... একটা মোবাইল...”। কিন্তু বাবা তাতে রাজি ছিলেন না।
কিছু দিন পরে মামা তাঁর পুরোনো ফোনটা আমায় দিলেন। আমার সামনে খুলে গেল অন্য এক ভুবনের দরজা। পুরোনো কিন্তু ক্ষমতাশালী এই ফোনই ছিল আমার প্রথম গুরু, প্রথম প্রেম, প্রথম মাদক। গান, সিনেমা, নতুন নতুন ওয়েবসাইট, সব নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম। ইন্টারনেটের জাদু ছুঁয়ে গেল আমার চোখে-মুখে। নিজের হাতে খুললাম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, যখন আমার চারপাশের মানুষ জানেই না, “ফেসবুক” শব্দটা কী বা “ইন্টারনেট” কী জিনিস! এরপর শুরু হলো আসল মোহযাত্রা ও মোহভঙ্গের কাহিনি।
পরের বছর আমি অষ্টম শ্রেণিতে উঠলাম। রোল নম্বর পাঁচ থেকে বেড়ে দশে উঠল, পড়ালেখায় মনোযোগ কমল। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কুফল পেতে শুরু করলাম। সারাদিন ফেসবুকে পড়ে থাকতাম। নতুন নতুন বন্ধু তৈরি করতাম। তাদের সঙ্গে মেসেজে কথা বলতাম। ২০১২ সালে আমার বন্ধুত্ব হয় একজন ভারতীয় বাঙালির সঙ্গে। তিনি একবার নড়াইল শহরে এলে সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও করি।
সব সময় কারও না কারও সঙ্গে চ্যাটিং চলতই আমার। অনেক মজা লাগত। মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ ফেসবুকের মধ্যে। বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার নাম করে স্কুলের পোশাক পরে বের হতাম। বাজারের কোনো এক দোকানে বই রেখে রওনা হতাম অন্য কোথাও। ছবি তুলে আপলোড দিয়ে বুঁদ থাকতাম নিজের ভার্চ্যুয়াল জগতে। বছর ঘুরতে থাকে, আর ক্লাসে রোল নম্বরও বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালে নবম শ্রেণিতে উঠলাম। রোল হলো ১৩, মানে ক্রমাবনতি! এভাবে আরও একটি বছর কেটে গেল। রোল আরও বাড়ল।
মোবাইলের ব্যবহার আমি কমাতে পারলাম না। মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেও আমাকে ফোন থেকে দূরে রাখতে পারলেন না। ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। নেশা এতটাই চরমে উঠেছিল যে, এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীনও না পড়ে ফেসবুকে চ্যাটিং করতাম। পরীক্ষার ফলাফল এল। আমি অকৃতকার্য।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। গ্রাম থেকে ১৮ জন এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। বন্ধুরা সবাই কৃতকার্য হলো, আর আমি অকৃতকার্য। বাবা লজ্জায় বাড়ি থেকে বের হতে পারতেন না। মা অনেক কান্নাকাটি করতেন। এসব দেখে আমার মনটা ভেঙে যায়। অনুতাপে বিদ্ধ হতে থাকি! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, অকৃতকার্য যখন হয়েছি, তখন এমন কিছু করে দেখাব, যাতে সবাই অবাক হয়ে যায়। আর এটা করার জন্য আমাকে অবশ্যই ফেসবুক ছাড়তে হবে।
ফেসবুক ও মোবাইলের ব্যবহার একদম সীমিত করে দিলাম। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হতো। ধীরে ধীরে নেশা কাটতে লাগল। পড়ালেখায় মন দিলাম। যত বেশি পড়ালেখার মধ্যে ঢুকতাম, তত বেশি পড়তে ইচ্ছা করত। তখন মনে মনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও দেখতে শুরু করলাম। এর আগে ভাবতাম, অনেক ভালো ছাত্রছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার দ্বারা হবে না। কিন্তু মোবাইল ও ফেসবুকের ওপর নির্ভরতা কমাতে পেরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল।
এখানে পড়ুন: সাবাতিনা, তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?
ধীরে ধীরে পড়ালেখাই আমার নেশায় পরিণত হয়ে গেল। পড়ালেখা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগত না তখন। অজানাকে জানার ইচ্ছা আরও তীব্র হয়ে গেল। যখন কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতাম না বা বুঝতাম না, গুগলে সার্চ দিতাম। তখন তা মনে গেঁথে থাকত।
আগে মাথার মধ্যে ফেসবুক ঘুরত। কার সঙ্গে কী কথা হবে, কার সঙ্গে দেখা হবে, ছবিতে কে কে লাইক দিল, কে কী কমেন্ট করল, এসবই মাথায় ঘুরত। কিন্তু যখন জীবনে ভালো কিছু করতে হবে, এই তাগিদ মনে জাগল, তখন থেকে মাথার মধ্যে শুধু পড়ালেখাই ঘুরত।
পরেরবার আবার এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। আগেরবার অকৃতকার্য হওয়া একজন ছাত্র হিসেবে এবার জিপিএ ৪.৭২ পেলাম। আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। ফেসবুকের ব্যবহার সীমিতই রাখলাম। পড়ালেখাকে নেশা হিসেবে নিয়ে এগিয়ে চললাম। ২০১৮ সালের এইচএসসিতে জিপিএ ৫.০০ পেলাম।
এরপর এল ভর্তি পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ১৪৫তম স্থান অধিকার করলাম! বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে, আমি দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে যাচ্ছি! কিন্তু সেটাই ছিল বাস্তব! এরপর বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হয়েছে। এখন একটা চাকরি করছি। এসব সম্ভব হয়েছে শুধু দৃঢ় সংকল্প নিয়ে মোবাইল ফোনের খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম বলে।
এখানে পড়ুন: ইন্দ্র ও তার বন্ধুরা