মেয়েবেলা কিংবা শৈশবকাল খানিকটা যেন শরতের শিউলির মতো, যার স্থায়িত্ব খুবই অল্প কিন্তু কোমলতা ও স্নিগ্ধ সুবাসের আবেশ রয়ে যায় সারা দিন। মফস্বলের ছোট্ট একটি শহরে জন্ম আমার, মা-বাবা দুজনই চাকরিজীবী হওয়ায় খুব একটা আলতোভাবে বেড়ে না উঠলেও আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের একটা স্নেহের পরশে ঘেরা ছিল আমার শৈশবের দিনগুলো। মধ্যবিত্ত পরিবারের গণ্ডিতে আমি বেড়ে উঠেছি, কিন্তু পারিবারিকভাবে আমার মা-বাবা কখনোই মেয়ে হিসেবে বাধানিষেধের আবর্তে জীবনকে বেঁধে দেয়নি। বরং তাদের কাছেই প্রথম শিখেছি, সংকীর্ণতা নয়, ব্যাপ্তিই জীবন।
শৈশব বা কৈশোরের মিষ্টিমধুর স্মৃতিগুলো মনের কোণে যেন এখনো জীবন্ত। মা–নেওটা মেয়ে হওয়ায় বেশির ভাগ ছুটিই আমার কাটত মামাবাড়িতে। গ্রীষ্মের আম, জাম, লিচুর সমারোহ থেকে শুরু করে শীতের দিনের বনভোজন, জ্যোৎস্নারাতের নৌকায় শাপলার বিল দেখা, পুকুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটা, সবই যেন এই সেদিনের ঘটনা। গ্রামীণ জীবনে এক আলাদা প্রাণশক্তি আছে, যা বরাবরই আমাকে মুগ্ধ করে।
যদিও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের স্রোতে আজ গ্রামীণ সেই নির্মল আবহমান জীবনযাত্রায়ও অনেক পরিবর্তন এসেছে। যা–ই হোক, আজ এসব নিয়ে কথা না–ই বলি। আজ বলব আমার স্মৃতিপটে থাকা মেয়েবেলার কথা, যখন বৃষ্টির দিনে পুকুরে ডুব দিতাম খই ফোটার শব্দ শোনার জন্য, যখন ঝড়ে আম কুড়াতাম, সেসব দিনের কথা। সেই যে প্রথম দিন মাকে ছেড়ে অন্য স্কুলে পাঠানোর সে যুদ্ধ, বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে একাডেমিতে নাচ শিখতে যাওয়া, স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে নানা খুনসুটি, খেলার মাঠ ছেড়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার জন্য প্রতিদিন মায়ের বকুনি, বৃষ্টিতে ভেজার জন্যে স্কুলবাসে করে শেষ স্টপেজে গিয়ে নামা; রোদেলা শীতের সকালে বাড়ির ছাদে বসে নতুন বইয়ের মলাট দেওয়া, সাথে মিষ্টি রোদের আলতো ছোঁয়া…এমন কতশত মধুর স্মৃতিতে কানায় কানায় ঠাসা যেন জীবনের এই অধ্যায়, যা স্মরণ করলে এখনো ঠোঁটের কোলে একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে নিজের অজান্তেই।
একটা শিশুকে দেখলে যেমন আপনাআপনি মানুষের মুখে হাসি ফোটে, ঠিক তেমনি শৈশবও হয় নিষ্পাপ। তাইতো শৈশব মানুষের মনে সঙ্গোপনে আজীবন থেকে যায়। মেয়েবেলা হোক আর ছেলেবেলা কিংবা শিশুকাল যা–ই বলি না কেন, এই সময়টা প্রত্যেকের জীবনের এমন একটা অধ্যায় যা বাস্তবতার ইট–কাঠের কুঠুরিতে আবদ্ধ ব্যস্ততম প্রাণে কিছুটা হলেও প্রশান্তি ও নবশক্তির সঞ্চার করে। কারণ, শৈশবের সহজ–সাবলীল প্রাণে থাকে না কোনো স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, না কোনো ভেদাভেদ। তখন স্কুলের দারোয়ানটাকে যেমন আপন মনে হয়, তেমনি মোড়ের আইসক্রিমওয়ালা, রং–পেনসিলের দোকানদার, পড়শিসহ সবাইকে যেন নিজের খুব আপনজনই মনে হয়। সেই মনের ব্যাপ্তি যেন বড় হওয়ার সাথে সাথে সংকীর্ণ হয়ে যায়। জীবন যেন এখন সর্বত্রই হিংসা–বিদ্বেষ, যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ও অসুস্থ এক লাভ–ক্ষতির প্রতিযোগিতায় মোড়ানো। দুদণ্ড সময় নেই কারও কাছে, কিন্তু কিসের পেছনে যে সবাই ছুটছে, তা–ও দিন শেষে অনেকেরই অজানা।
একদিকে আমরা যেমন উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাচ্ছি, পক্ষান্তরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের সহজ-সরলতা, মানবিকতা ও সাবলীল জীবনাচরণ। এসব উন্নয়ন আমাদের জীবনে কতটুকু সুফল বয়ে আনছে, সেটা আজ প্রশ্নবিদ্ধ!! বরং প্রতিনিয়তই আমরা পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও নীতি–নৈতিকতা হারিয়ে মানবিকতাবিবর্জিত মানুষে পরিণত হচ্ছি, যার প্রতিফলন আজ সমাজের প্রতিটি স্তরেই দৃশ্যমান।
তাইতো গোধূলিবেলায় যখন একাকী বসে সূর্যাস্ত দেখি, তখন মাঝে মাঝে মনে হয়, ঠিক যেমন করে প্রত্যেক মানুষ খুব সঙ্গোপনে নিজের ভেতরের শিশুটিকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত আগলে রাখে, তেমনি করে যদি সেই শিশুপ্রাণের সরলতা, মানবিকতা, উদারতা, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধকেও যদি কেউ নিজের মনে লালন করত, তাহলে হয়তো আবার আমরা একটা হিংসা-বিদ্বেষ–হানাহানিমুক্ত নতুন পৃথিবীর রূপ দেখতে পেতাম, যেখানে প্রত্যেক মানুষই হবে সর্বাগ্রে উদারতা ও মানবিকতায় বলীয়ান।