সেদিন বিকেলবেলা মল চত্বর হয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরির দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশ দেখছি। রাস্তার ওপারে ভিসি চত্বরের বটগাছটার নিচটায় ঢাবির লাল বাসের সারি, মল চত্বরের কংক্রিটের বেঞ্চিগুলোতে পড়ুয়াদের আড্ডা, ঘাসের মধ্যে বসে আরও একটা-দুটো দল জমিয়ে গল্প করছে দেখতে পেলাম। দেখতে দেখতে হাসির হিড়িক পড়ে গেল একটা দলের মধ্যে। আন্দাজ করলাম, প্রথম বর্ষের কচিকাঁচা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে এসব দেখতে আজকাল ভালোই লাগে। কেমন যেন নিজেকে প্রবীণ প্রবীণ মনে হয়।
(এখানে পড়ুন: আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়)
আমার মনে পড়ে কাটিয়ে আসা দিনগুলোর কথা। এই তো সেদিনই এসেছিলাম ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হতে। ভর্তির কাজ শেষের পর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক ছবি তুলেছিলাম। তারপর তো ক্লাস শুরু হলো। নতুন মানুষজন, নতুন পরিবেশের মধ্যে থেকে নিয়মিত ক্লাস করা, মিড, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশনের ভিড়ে হাঁপিয়ে ওঠা, আরও কত কী! এর মধ্যেই গড়ে উঠেছিল আমার বেশ কিছু প্রিয় বন্ধুত্ব। রোজ রোজ সময়ে-অসময়ে আড্ডা, পুরো ক্যাম্পাস চষে বেড়ানো, বছর বছর এখানে-ওখানে ট্যুর দেওয়া, লাল বাসে করে হুটহাট দূরে কোথাও চলে যাওয়া। বেশ কাটছিল জীবন।
তখন সবে দ্বিতীয় বর্ষ। ক্লাস শেষে আমরা কয়েকজন সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টির নিচে গোল হয়ে আড্ডা দিতাম। কখনও বসতাম কলাভবনের সামনের বটগাছটার নিচে। হাতে ফুড হাটের চা। আর অফুরন্ত আড্ডা। সেই আড্ডায় দেশ উদ্ধার হতো, প্রেম নিয়ে হাসাহাসি হতো, পরীক্ষার আগের রাতের প্যানিক শেয়ার হতো। সময়ের কোনো হিসেব ছিল না তখন। যেন সময়টাই আমাদের হাতে বন্দি ছিল, আমরা নয়।
এর মধ্যেই কীভাবে যেন অনার্স শেষ হয়ে গেল। মাস্টার্স শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন রঙিন চশমাটা চোখ থেকে খুলে টুপ করে নিচে পড়ে গেল।
এখনো বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামলে সামাজিক বিজ্ঞান চত্বরে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা সবার আগে মনে পড়ে। ফ্যাকাল্টির সামনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই আড্ডার কথা মনে পড়ে। টিএসসিতে ভেজা মাটির গন্ধ, সেই ঘাসের ওপর জমে থাকা টুপটাপ জলের শব্দ যেন শুনতে পাই। সব যেন কালকের ঘটনা, অথচ কয়েকটা বছর পেরিয়ে গেছে!
আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। কিছুদিন পরপর কোনো না কোনো প্রোগ্রাম হতে হয় আমাদের ডিপার্টমেন্টে। সেবার হয়েছিল বসন্তবরণ উৎসব। অনেকটা সাহস জুগিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সেই প্রোগ্রামে আমি একটা লোকনৃত্য পরিবেশন করেছিলাম। পরিবেশনা শেষ হতেই প্রবল করতালিতে পুরো করিডোর মুখরিত হয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণের জন্য আমিই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আর সেই মুহূর্তটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বিদায়ী অনুষ্ঠানের সেই সন্ধ্যাটা। আমরা সবাই জানতাম, এরপর আর এভাবে একসঙ্গে হওয়া হবে না। মনে হতে লাগল, ফেলে আসা পাঁচ বছরের প্রতিটা মুহূর্ত। সামনে থাকা প্রতিটা মুখ, প্রতিটা হাসি-কান্না মিলেমিশে একটা অদ্ভুত মায়া তৈরি করে ফেলেছে। বাতাসে একটা চাপা কান্নার সুর, অথচ মুখে হাসি।
আজকাল বড় উপলব্ধি হয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সৌন্দর্য কোনো একটামাত্র বড় ঘটনায় ছিল না। ছিল ছোট ছোট মুহূর্তগুলোয়, বৃষ্টিতে ভেজা বইখাতা, রাতজাগা আড্ডা, বাসে বন্ধুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া, আর হঠাৎ পাওয়া নিঃশর্ত ভালোবাসার সেই দিনগুলোতে।
সেই দিনগুলো আর ফিরে আসবে না জানি। কিন্তু মনের এক কোণে তারা থেকে যাবে চিরকাল, একটা সোনালি বিকেলের মতো, যা কখনো সন্ধ্যা হয় না।
(এখানে পড়ুন: শীতের এক চাঁদনী রাতে ক্যাম্পাস)