প্রাচীন চীনের কথা ভাবলে চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? বিশাল প্রাসাদ, রাজকীয় সিংহাসন, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তার আর একের পর এক পুরুষ সম্রাটের গল্প।
কিন্তু সেই ইতিহাসেই এমন একজন নারী ছিলেন, যিনি শুধু কোনো সম্রাটের স্ত্রী ছিলেন না, কোনো সম্রাটের মা হয়েও থেমে থাকেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই সিংহাসনে বসেছিলেন। নিজের নামে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর শাসন করেছিলেন চীনকে।
নাম তাঁর উ জেতিয়ান।
চীনের ইতিহাসে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র নারী সম্রাট। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি ছিলেন চীনের প্রকৃত ক্ষমতাধর শাসক। এর মধ্যে ২৫ বছর তিনি স্বামী ও ছেলেদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ক্ষমতা ধরে রাখেন। এরপর ৬৯০ সালে নেন আরও বড় পদক্ষেপ। নিজের সবচেয়ে ছোট ছেলে সম্রাট রুইজংকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করে নিজেই হয়ে ওঠেন চীনের একমাত্র শাসক।
প্রতিষ্ঠা করেন উ ঝৌ রাজবংশ, যা টিকে ছিল ১৫ বছর।
রাজপ্রাসাদে প্রবেশ, ক্ষমতার কেন্দ্রে উত্থান
উ জেতিয়ানের গল্প শুরু হয়েছিল সম্রাটের সিংহাসন থেকে অনেক দূরে। তিনি প্রথমে সম্রাট তাইজংয়ের উপপত্নী হিসেবে রাজদরবারে প্রবেশ করেন।
তাইজং মারা যাওয়ার পর তিনি বিয়ে করেন তাঁর নবম ছেলে ও উত্তরসূরি সম্রাট গাওজংকে।
শিক্ষিত, আকর্ষণীয় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী উ জেতিয়ান খুব দ্রুতই বুঝিয়ে দেন, তিনি শুধু রাজপরিবারের একজন সদস্য হয়ে থাকতে চান না। স্বামীর তুলনায় তিনি ছিলেন বেশি দৃঢ়চেতা ও সক্রিয়। ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর প্রভাব বাড়তে থাকে।
গাওজং সম্রাট হলেও প্রকৃত ক্ষমতার বড় অংশ চলে আসে উ জেতিয়ানের হাতে। তিনি হয়ে ওঠেন সিংহাসনের আড়ালের আসল ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
তবে সেই ক্ষমতা অর্জনের গল্প ছিল অন্ধকারও।
ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় উ জেতিয়ান ছিলেন নির্মম ও কৌশলী। রাজপ্রাসাদের ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, এমনকি জাদুবিদ্যার অভিযোগও ব্যবহার করা হয়েছে তাঁর ক্ষমতার লড়াইয়ে। নিজের বিরোধীদের ওপর নজর রাখতে তিনি একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
যাঁদের তিনি বাস্তব, সম্ভাব্য কিংবা নিজের জন্য হুমকি মনে করতেন, তাঁদের অনেককেই সরিয়ে দেওয়া হয়। কেউ পদ হারান, কেউ নির্বাসিত হন। বিরোধীদের সন্তানদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি।
এমনকি তাঁর নিজের পরিবারের সদস্যরাও নিরাপদ ছিলেন না। তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা হলে রাজপরিবারের ১২টি শাখার সদস্যদের হত্যা করা হয়।
ছেলেরা সম্রাট, কিন্তু ক্ষমতা কার হাতে?
উ জেতিয়ানের ছেলেরা যখন একে একে সম্রাট হলেন, তখনও ক্ষমতা তাঁর হাতেই থেকে যায়।
তিনি ছিলেন অভিভাবক শাসক। ছেলেদের সরকারি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগও তিনি সীমিত করে দেন।
তারপর আসে ৬৯০ সাল।
তখন উ জেতিয়ানের বয়স ষাটের কোঠায়। কিন্তু বয়স তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি তাঁর সবচেয়ে ছোট ছেলে সম্রাট রুইজংকে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য করেন।
এবার আর কোনো সম্রাটের স্ত্রী হিসেবে নয়, কোনো সম্রাটের মা হিসেবেও নয়, উ জেতিয়ান নিজেই হয়ে গেলেন চীনের শাসক।
প্রাচীন চীনের পুরুষশাসিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এটি ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
শুধু ক্ষমতা নয়, বদলও এনেছিলেন
উ জেতিয়ানের শাসনকে শুধু ক্ষমতার লড়াই দিয়ে বিচার করলে গল্পের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
তিনি প্রশাসনকে আরও দক্ষ ও কম দুর্নীতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেন। অভিজাতদের একচেটিয়া প্রভাব কমিয়ে কৃষক শ্রেণিকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁর শাসনামলে চীনের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতেও নতুন গতি আসে।
সাম্রাজ্যের সীমানাও বাড়ে। কোরিয়া ও মধ্য এশিয়ায় নতুন অঞ্চল জয় করে চীনের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করেন তিনি। ফলে চীন হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য।
উ জেতিয়ান শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতাও করেন। নারীদের সামাজিক অবস্থান উন্নত করার উদ্যোগ নেন এবং নারীদের অধিকারকে সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তাওবাদের তুলনায় বৌদ্ধধর্মকে শক্তিশালী করেন এবং চীনে এর বিস্তার ও প্রভাব আরও সুসংহত করেন।
কিন্তু ক্ষমতার কোনো গল্পই হয়তো চিরস্থায়ী নয়।
তবু ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় একটিই।
পুরুষশাসিত প্রাচীন চীনে তিনিই ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র নারী, যিনি নিজের নামে সম্রাট হয়ে একটি সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন।