জীবন ছোট। সময় দ্রুত চলে যায়। তাই প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা উচিত। এই ভাবনার নাম ‘কার্পে ডিয়াম’। ল্যাটিন ভাষার এই বাক্যাংশ বলতে বোঝানো হয় ‘দিনটাকে লুফে নাও’। সহজ বাংলায় বলা যায়, ‘দিনটাকে জিতে নাও’ বা ‘মুহূর্তকে উপভোগ করো’।
এই বাক্যাংশ এসেছে হোরাস নামে সমধিক পরিচিত রোমান কবি কুইন্টাস হোরাতিয়াস ফ্লাক্কাসের কাছ থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ২৩ সালে তিনি ‘কারমিনা’ (Carmina) নামে শতাধিক পদ্যের একটি সংকলন প্রকাশ করেন। গ্রিক সাহিত্যরীতির সঙ্গে মিলের কারণে এটি ‘ওডস’ (Odes) নামেও পরিচিত। ‘কারমিনা’য় একজন জ্ঞানী মানুষের মুখ দিয়ে হোরাস লিউকোনোয়ি নামের নারী চরিত্রটি উদ্দেশ্যে কার্পে ডিয়ামের কথা বলেন। হোরাস তাকে বলেন, ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। তাই আগামীকালের চিন্তায় সময় নষ্ট না করে আজকের দিনটাকে ভালোভাবে কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
জীবনকে উপভোগ করার অর্থ ভবিষ্যতের কথা না ভেবে বেলাগাম আমোদ-ফুর্তি করা নয়। বরং হোরাসের আসল বার্তা ছিল অন্যরকম। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, জীবন অনিশ্চিত। তাই বিলাসিতা বা লাগামহীন আনন্দ নয়, বরং প্রতিটি দিনকে গুরুত্ব দিয়ে বাঁচাই আসল কথা। বন্ধুত্ব, সাধারণ আনন্দ আর মনের শান্তি, এসবই ছিল তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই চিন্তাধারার সঙ্গে গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের শিক্ষার মিল রয়েছে। হোরাস এপিকিউরীয় ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন। এপিকিউরাস বলতেন, সহজ-সরল জীবনেই আসল সুখ।
কালের পরিক্রমায় হোরাসের ‘কার্পে ডিয়াম’ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কার্পে ডিয়াম ধারণায় অনুপ্রাণিত ইংরেজ কবি রবার্ট হেরিক তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘টু দ্য ভার্জিনস, টু মেইক মাচ অব টাইম’-এ নব-তরুণীদের উদ্দেশে লেখেন, ‘যত পারো, যৌবনের প্রারম্ভেই, আনন্দের কুঁড়িগুলো কুড়িয়ে নাও।’
জীবন আসলে এমনই, সময় থাকতে উপভোগ করতে হয়।
পরবর্তীতে সিনেমা, গান, নাটকেও কার্পে ডিয়াম কথাটি বারবার ফিরে এসেছে।
১৯৮৯ সালের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য ডেড পোয়েটস সোসাইটি’তে শিক্ষক জন কিটিং ছাত্রদের বলেন, দিনটাকে জিতে নাও, জীবনকে অসাধারণ করে তোলো। কিটিংয়ের এই সংলাপ আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।
(এখানে পড়ুন: আনন্দধারা বহিছে ভুবনে' নিয়ে সাত তরুন)
নতুন শতকে ‘ইওলো’ (YOLO) কথাটি বেশ শোনা যাচ্ছে। YOLO হচ্ছে You Only Live Once। এর অর্থ দাঁড়াতে পারে, ‘জীবন তোমার একটাই’। এই কথাটিও আসলে কার্পে ডিয়ামেরই আধুনিক রূপ।
হোরাসের কার্পে ডিয়াম মানে দায়িত্বহীনভাবে উন্মত্তের মতো দিন কাটানো নয়। বরং এর মানে হলো, ভয় বা আলস্যে সময় নষ্ট না করা। ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় বর্তমানকে হারাতে না দেওয়া। প্রতিটি দিন আসে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। মানুষ যেন সেই সম্ভাবনার সদ্ব্যবহার করে আরও পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।