রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেছিল জীবনজয়ী। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে লিখেছেন সাত তরুণ। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ শিক্ষক, কেউ চাকরিজীবী।
মেহেরুন্নেছা মনিকা
আনন্দধারা বহিছে ভুবনে নিয়ে লিখবো। শুরুতে মনে হল, এই ভুবনে তো এখন আনন্দ নয়, বরং অনাকাঙ্ক্ষিত আশঙ্কা আর অস্থিরতার ধারা বইছে। গানটি শুনতে শুরু করলাম। শুনতে শুনতে যেন চলে গেলাম ঠাকুর পরিবারের চন্দননগরের বাগানবাড়িতে। গঙ্গার ধারের সবুজে ঘেরা প্রশস্ত মাঠ, ফুলে-ফলে ভরা গাছ-গাছালির ছায়ায় বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সঙ্গীত চর্চার দৃশ্য চোখে ভেসে উঠল। মনে হল, আমিও সে গাছতলায় বসে আছি, কবির পাশেই।
এই শহুরে জীবনে আমরা কতরকম অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাই। এর মধ্যে ভালো যতটা না থাকে, খারাপ যেন আরো বেশি থাকে। প্রতিনিয়ত বঞ্চনা, অবহেলা, শোষণ, ঘৃণা আমাদেরকে ঘিরে থাকে। অথচ আমাদের জীবনে কিছু ভালো সময়ও তো আসে, কিন্তু সেগুলো কেমন যেন স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়।
এ গানের একটি পঙ্ক্তি—“প্রেম ভরিয়া লহ শূন্য জীবনে”—কী সহজ, কী অকপট এক আহবান জীবনের কাছে! তবে তাই হোক! এভাবেই প্রেম, প্রীতি, সহমর্মিতার ছোঁয়ায় আমাদের শূন্য জীবন ভরে উঠুক। সেই ভালোবাসা যেন আমরা ছড়িয়ে দিতে পারি চারপাশে। তবেই না ভুবনে বইবে সত্যিকারের আনন্দধারা, বিরাজ করবে শান্তি!
জাফরিন খান
ভাদ্র মাসের এক রোববার। দিনের মধ্যভাগ ছুঁইছুঁই। ঘড়িতে দেখলাম ১১টা ৪৬ বাজে। বৃষ্টিস্নাত শীতল হাওয়া মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। মনে গান গুনগুনিয়ে উঠলো—“অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে।”
ইউটিউব থেকে ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’ খুঁজে নিলাম। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ইয়ারফোনে গানটা শুনতে শুরু করলাম। পুকুরের জলে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি নৃত্য, নারকেল গাছের গা বেয়ে জলের ধারা—প্রকৃতির রূপ উপচে পড়ছে। পশ্চিমের জানালায় দেখা যায় আমাদের কাঁঠাল গাছটাকে। জীবনানন্দ দাশ মনে এলেন,
“তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও,
আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব;
দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে।”
এদিকে দেয়ালের কার্নিশ বেয়ে টপটপ করে পড়ছে বৃষ্টির জল। আমার চোখ ছলছল করে উঠে এক অজানা গভীর মায়ায়। গানের অন্তিম চরণটুকু গাইছেন অদিতি মুহসিন—“চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি, প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে”।
রবীন্দ্রনাথ এই গানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে আনন্দের সুর খুঁজে পেয়েছেন। এ গান আমাদের শিখিয়ে দেয়, কীভাবে দুঃখকে তুচ্ছ করে, আনন্দকে সম্বল করে এগিয়ে যেতে হবে। প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই আনন্দ, যা আমাদের সংকীর্ণতা দূর করে ভুবনকে মুখরিত করে তোলে।
মাকসুদ খান সোহান
ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের গান আর কবিতা আমার বড় আশ্রয়। আমি আবৃত্তি করি। কিন্তু গাইতে পারি না এতটুকু। আমি মনপ্রাণ ঢেলে গান শুনি। কিছু গান শুনলে হৃদয় প্রশান্ত হয়। আজ সকাল থেকে শুনছিলাম “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে…”
অসীম তৃষ্ণায় এক ফোঁটা জল যেমন শরীরকে শান্তি দেয়, তেমনই এই গান আমার ক্লান্ত হৃদয়কে ভরিয়ে দিচ্ছে অনাবিল প্রশান্তিতে। শহরের রুক্ষতা যেন সবুজের সমারোহে ঢেকে গেল। হঠাৎ মরুর আকাশে যেন দেখা দিল মেঘ-বৃষ্টি। আমি আনমনে বসে আছি, হাতে গরম চায়ের পেয়ালা। আর মিশ্র মালকোষে অদিতি মুহসিন গাইছেন—
“চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে…”
এ কি কেবল গায়িকার গায়কি? নাকি ভক্তের প্রতি গুরুদেবের কোনো ইঙ্গিত?
পাষাণের কাঠিন্যে ঠোকর খেতে খেতে যে আহত, যে ভুলে গেছে বাঁচার আনন্দ—এই গান যেন তারই প্রতি অনুপ্রেরণা, ভালোবাসার আহ্বান।
চা শেষ করে উঠে বসেছি। শেলফ থেকে নামিয়েছি ঘুঙুরের বাক্স। স্পিকারে দিয়েছি ফোন। এবার এ জগৎ-সংসারে শুধুমাত্র আমরা তিনজন—গুরুদেব, অদিতি মুহসিন, আর আমি। আমি এখন কিছু সময় নাচবো।
মোঃ কাউছার পাঠান
‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...’—এই গানটি আমার প্রতিদিনের সঙ্গী, বিশেষ করে সকালবেলার। অনেক শিল্পীর কণ্ঠে শুনেছি। তবে প্রতিদিন শুনি কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুকণ্ঠে। তাঁর গায়কীতে আমি এক অনন্য আবেশ পাই।
গানের কিছু কথা কষ্ট জয় করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে আমাকে।
“চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় প্রসারি
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি”
এই পঙ্ক্তিগুলো আমার জীবনে এক অদৃশ্য অনুপ্রেরণা। ছোট ছোট দুঃখ পাশ কাটিয়ে আনন্দের সঙ্গে বাঁচার রসদ।
রবীন্দ্রনাথ প্রেমের এক মূর্ত প্রতীক। সব যুগ-কাল ভেদে তিনি তাই ছিলেন, তাই রবেন। তাঁর গান-কবিতা এ জগতের হিংসা, বিদ্বেষকে পাশ কাটিয়ে প্রেমকে গ্রহণ করার এক আকুল নিবেদন।
আমার কাছে রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছে জীবনের জন্য প্রার্থনা। ফুরফুরে সকালের প্রথম কিরণ গায়ে মেখে সুরের মায়ায় হারিয়ে যাওয়ার নামই তো জীবন।
আজকাল আমরা এত ব্যস্ত যে গান শোনার সময় নেই। অথচ ভালো সংগীত আমাদের মস্তিষ্কের কোষে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আমাদের দখল নিয়েছে। আমার জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে সংগীতের ভূমিকা অপরিসীম। আর সেটা যদি হয় রবীন্দ্রসংগীত, তাহলে বাণী ও সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। গান আমার আত্মার প্রশান্তি।
সুপ্তি রায়
সোমবার, সকাল সাতটা বাজে। শান্ত চারিদিক। স্নিগ্ধ ও নির্মল। পাখিদের কিচিরমিচির, বারান্দায় সারি সারি কয়েন প্ল্যান্টস আর বাগানবিলাসে মৃদু হাওয়া। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ইউটিউব প্লেলিস্টে শুনছি রবীন্দ্রনাথ—‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...’।
শুনতে শুনতে মনে হলো—এই গানে এক অদ্ভুত মায়া আছে। জীবনের প্রতি, পৃথিবীর প্রতি, মানুষের প্রতি। আর সত্যিই তো, পৃথিবীতে আনন্দের উৎসের অভাব নেই! সকালবেলার পাখির ডাক, স্নিগ্ধ আকাশ, প্রিয় বই, মায়ের হাসি; তাঁর বকা, আইসক্রিম, হাওয়াই মিঠাই, জোনাকি পোকা, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রঙবেরঙের ফুল—এসবের জন্য বেঁচে থাকা যায়।
কবি যখন বলেন—
“স্বার্থ নিমগ্ন কি কারণে?
চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি!”
তখন মনে হয়—আমরা কতটা স্বার্থপর হয়ে বাঁচি! ছোট ছোট দুঃখ জমিয়ে রাখি, অথচ যদি অন্যের দুঃখ বুঝতে পারি, তাতেই তো জীবনের সার্থকতা।
গান শুনতে শুনতেই মনে পড়ে যায় আরেকটি প্রিয় চরণ—
“বিকশিত হৃদয়কুসুম হে—
আনন্দবসন্তসমাগমে!”
অতঃপর মনে হয় জীবন সুন্দর।
নওরিন নাহার মুনা
আজকের সকালটা শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...’ গানখানি দিয়ে। এর সুর ও তাল যেমন মনকে শান্ত করেছে, তেমনি এর কথাগুলো মনকে দিয়েছে এক ইতিবাচক দিশা।
সময়ের বাস্তবতায় বিষাদ, বেদনা, রাগ, বিরক্তি ছাড়া একটি দিন কাটানো যেন দুঃসাধ্য। কিন্তু এই গানটি মনে করিয়ে দেয়—দুঃখ, বিষণ্ণতা, হতাশা সবই ক্ষণস্থায়ী ও ক্ষুদ্র। সাময়িক কষ্টের দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং চারপাশের সৌন্দর্যকে অনুভব করতে হবে, হৃদয়কে প্রসারিত করে প্রেম ও আনন্দে ভরে তুলতে হবে।
এই টুকরো ভাবনার মধ্যেই গানের একটি পঙ্ক্তি আমাকে বিশেষভাবে ছুঁয়ে যায়, “পান করি রবে শশী অঞ্জলি ভরিয়া, সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি..”।
এই চরণ থেকে আমার উপলব্ধি—চাঁদ ও সূর্য যেমন চারপাশের আলো ও আনন্দ ধারণ করে বলেই চিরকাল দীপ্ত থাকে, তেমনি আমরাও যদি পৃথিবীর সৌন্দর্য, ভালোবাসা, ইতিবাচকতা ধারণ করি, তবে আমাদের জীবনও আলোকিত থাকবে। বিষণ্ণতার ছায়া আমাদের ছুঁতে পারবে না।
এই গানটি প্রতিদিনের পথচলায় আমার এক অনুপ্রেরণা, এক নির্দেশনা। হৃদয়কে প্রসারিত করতে শেখায়, ছোট ছোট দুঃখকে তুচ্ছ করে বৃহৎ আনন্দকে গ্রহণ করতে বলে। প্রেম, সহমর্মিতা, সৌন্দর্য আর সুরের মূর্ছনায় ভরিয়ে তোলে জীবন।
আনন্দধারা জগতে সবসময়ই বইছে—যদি আমরা তা গ্রহণ করতে জানি।
স্মৃতি রানী বর্মণ
চোখে ঘুম আর মাথাভর্তি কাজ নিয়ে প্রতিদিন সকাল শুরু হয়। আজও ব্যতিক্রম নয়। সকাল শুরু হয়েছে তাড়াহুড়ো করে। দিনের শুরুই নাকি বলে দেয় পুরো দিনটা কেমন যাবে। তাই সকালটাকে ভালো করার একটা উপায় পেয়ে গেলাম। রবি ঠাকুরের গান। ইউটিউবে সার্চ করে "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে" নিয়ে নিলাম। হাতে সারাদিনের বিশাল এক টু-ডু লিস্ট আর তাড়াহুড়ো করে শুরু করা বিরক্তিকর সকালটাকে পালটে দিয়ে, নিমিষেই অন্য এক জগৎ রচনা করে ফেললো রবিঠাকুরের গানে।
সকালবেলার যোগব্যায়াম শেষ করে শবাসনে বিশ্রাম নিলে যেমন শরীর, মন, আত্মায় এক প্রকার শান্তি ভর করে, ঠিক একইভাবে রবিঠাকুরের লেখায় অদিতি মুহসিনের কণ্ঠে এমন আবেশিত হওয়ার উপাদান খুঁজে পাচ্ছি গানটা শুনে।
বিরক্তিকর সকালটাকে একটু অন্যরকম করাই যায়। তাই এক কাপ কফি বানিয়ে হেডফোনে গানটা বাজিয়ে সরাসরি চলে গেলাম ছাদে। ছাদে বেশ নয়নতারা ফুলের গাছ হয়েছে। পুরো ছাদ নয়নতারার গোলাপি ফুলে ভরা। ইশশ! কী যে অপূর্ব লাগছে দেখতে ছোট ছোট নয়নতারা সোনামনিদের। পাশেই আমার পুঁইশাক গাছ। নতুন একটা কুঁড়িও বেরিয়েছে পুঁইশাকের। দেখেই মনটা খুশি হয়ে গেলো। ছোট্ট একটা পুঁইশাকের কুঁড়িও এতো আনন্দ দিতে পারে! হয়তো এই আনন্দ আমার নিজেরই তৈরি, অর্থাৎ মন নিজে থেকে বেদনাকে সরিয়ে আনন্দকে আঁকড়ে ধরেছে। কী ব্যাপার! হঠাৎ করে আমার এতো ভালো অনুভব কেন হচ্ছে? সকালটা এতো সুন্দর কেনো মনে হচ্ছে? সবটাই কী কেবল ভ্রম? নাকি সত্যি আনন্দধারা বহিছে ভুবনে?
সকালের মৃদু রোদ গায়ে এসে পড়ছে, কফিতে চুমুক দিচ্ছি আর কানে বাজছে আমার প্রিয় লাইন—
“পান করি রবে শশী অঞ্জলি ভরিয়া
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি--”
আমার মনে হলো—Life is worth living...