কোনো দিন কি আমরা মাটিতে হাত রেখে মাটিকে জিজ্ঞেস করেছি, “মাটি, তুমি কেমন আছ?” গাছের কাণ্ডে কান পেতে কখনো কি শুনতে চেয়েছি, “গাছ, তোমার সবকিছু ঠিকঠাক চলছে তো?” আমার মনে হয়, অধিকাংশ মানুষের উত্তর আসবে, “না।” প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা বা দায়িত্ববোধ দেখানো কি আমাদের উচিত নয়?
মাইকেল জ্যাকসনের ‘আর্থ সং’ এমনই একটি গান, যা শুনলে প্রকৃতি ও পৃথিবীর প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রশ্নটি মনে জেগে ওঠে। এই গান আমার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমি শুধু আমার নই; বরং আমার ওপর হক পুরো প্রকৃতি ও পৃথিবীর।
আমাদের মধ্যে অনেকেই মাইকেল জ্যাকসনকে মূলত পপজগতের সুপারতারকা হিসেবেই বিবেচনা করেন। আমরা খেয়াল করি না যে মাইকেল জ্যাকসন শুধু বিনোদনের ফেরিওয়ালা নন, তাঁর সৃষ্টিকর্মের অনেক জায়গাতেই তিনি প্রাণ-প্রকৃতি ও মানবতা নিয়ে আওয়াজ তুলেছেন। ‘আর্থ সং’ তেমনই একটি গান। প্রকৃতির পক্ষে ও পৃথিবী ধ্বংসের বিরুদ্ধে এই গান এক শক্তিশালী প্রতিবাদ ও আত্মজিজ্ঞাসা।
[এখানে পড়ুন: ম্যাডোনার চোখে মাইকেল]
মাইকেল জ্যাকসন পরিবেশসচেতনতা তথা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুধাবন থেকেই গানটি লিখেছিলেন। মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটাতে যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করছে, তার কুফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই ভাবনার দিকে ডাক দিয়ে যায় ‘আর্থ সং’। প্রাণী হত্যা এবং মানবতার ওপর সংঘটিত সহিংসতার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এই গানে। পৃথিবী ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আছে এই গানের কথায়।
‘আর্থ সং’ শুরু হয় বনের গভীরে পাখির কলকাকলিতে। এর পরপরই ভিডিওতে দেখা যায়, বন ধ্বংস করতে করতে এগোচ্ছে একটি যন্ত্রদানব। আস্তে আস্তে গানটি তীব্র হয়ে ওঠে এবং একটি শক্তিশালী কোরাসে পরিণত হয়। একের পর এক লাইন ফুটিয়ে তোলে মনুষ্যজাতির অবিমৃষ্যকারিতা।
বিনষ্ট ফুল ফোটার উদ্যান, যুদ্ধে মৃত মানবশিশু, সাগরে তিমির কান্না, দিকে দিকে মানবসন্তানের রোদন, পুড়ে যাওয়া বন-বনানী, সবকিছু স্মরণে নিয়ে আসেন মাইকেল জ্যাকসন। মনে রাখতে হবে, এই গান জাতিসংঘের এমডিজি বা এসডিজি কর্মসূচির অনেক আগের। মানুষ নিজের হাতে শেষ করছে নিজেরই বানানো সভ্যতা; তা নিয়ে আবার কোনো বিকার নেই। এই উদাসীনতার অর্থ কী, তা জানতে চাওয়া হয়েছে ‘আর্থ সং’-এ। ১৯৯৫ সালে গানটি মুক্তি পায়।
‘আর্থ সং’ কেবল একটি গান নয়, এটি একটি আন্দোলন। মাইকেল জ্যাকসন তাঁর গানটির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে সচেতন করেছেন, পৃথিবীকে বাঁচানোর দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। গানের ভিডিওর শেষাংশ দেখে যেন মনে হয়, নিহত প্রাণীগুলো জীবিত হয়ে ফিরে এসেছে। তারা তাদের আবাসস্থলে নিরাপদে বাস করছে, শিশুরা খেতে পাচ্ছে এবং নিরাপদে বড় হচ্ছে। হিমবাহগুলো তাদের গৌরব ফিরে পাচ্ছে এবং ভেঙে পড়া বিশাল গাছগুলো আবার ফিরে পাচ্ছে তাদের আগের মহিমা। শিল্পী সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন, পরিবেশের চিত্র এমনই হওয়া উচিত।
‘আর্থ সং’ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবী আমাদের কাছে এক উত্তরাধিকার এবং এর সুরক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
[এখানে পড়ুন: প্রাণ-প্রকৃতি-পৃথিবীবান্ধব পিকেটি]