সাময়িকী

ম্যাডোনার চোখে মাইকেল


  • মাহিরা মেহরীন খান  |
  • প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ২৩:৩১
ম্যাডোনার চোখে মাইকেল
ছবি: এআই

বিংশ শতাব্দীর পশ্চিমা সঙ্গীতজগতে উজ্জ্বলতম দুটি নাম, সবাই চেনেন তাদের, ম্যাডোনা এবং মাইকেল জ্যাকসন। জন্ম একই মাসে, একই বছরে। ১৯৫৮ সালের আগস্ট মাসে। ম্যাডোনা ১৬ তারিখে, জ্যাকসন ২৯ তারিখে। দুজনের জন্মই আমেরিকার মিডওয়েস্ট অঞ্চলে। ম্যাডোনা জন্মেছেন মিশিগান আর জ্যাকসন জন্মেছেন ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে। এটা সম্ভবত তর্কাতীত যে এই দুই শিল্পী নিজ নিজ পথে সঙ্গীত, নৃত্য এবং সংস্কৃতির জগতকে বহুলাংশে বদলে দিয়েছেন। ম্যাডোনা মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। জ্যাকসন এসেছেন নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। তার ভাইবোনের সংখ্যা আট। ম্যাডোনারও তাই।

ম্যাডোনা, যিনি "কুইন অব পপ" হিসেবে পরিচিত, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও শিল্পসাধনা তাকে নিয়ে গিয়েছে খ্যাতির শীর্ষে। মাইকেল জ্যাকসন, যাঁকে বিশ্ব চেনে "কিং অব পপ" নামে, মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই মঞ্চ কাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর অতুলনীয় কণ্ঠ, জাদুকরী নৃত্যভঙ্গি এবং সৃজনশীল সঙ্গীত শত কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। সুখ্যাতির আলোতে এই দুইজন সমুজ্জ্বল হয়েছিলেন কয়েক দশক। আবার সুখ্যাতির উল্টোপাশে ম্যাডোনা ও জ্যাকসন দুজনেই ব্যক্তিগত জীবনে ভোগ করেছেন অপার যন্ত্রণা ও একাকিত্বের বেদনা।

২০০৯ সালে মাইকেল জ্যাকসনের অকাল মৃত্যুর পর এমটিভির ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানের শুরুতে, মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে একটি দীর্ঘ ও আবেগময় বক্তব্য রাখেন ম্যাডোনা। এই বক্তৃতা পরবর্তীতে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। জীবনজয়ী পাঠকদের জন্য নিচে ম্যাডোনার বক্তৃতাটির বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো:

মাইকেল জ্যাকসন ১৯৫৮ সালের আগস্ট মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আমিও একই বছরের একই মাসে পৃথিবীতে এসেছিলাম। মাইকেল জ্যাকসন মধ্যপশ্চিম আমেরিকার শহরতলিতে বড় হয়েছিলেন। আমিও হয়েছিলাম। মাইকেল জ্যাকসনের আট ভাই-বোন ছিল। আমারও ছিল। যখন মাইকেল জ্যাকসনের বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর, তখন তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সুপারস্টার, সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু। আর যখন আমার বয়স ছয়, তখন আমি আমার মাকে হারাই। মা হারানোর কষ্ট আমাকে সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তবুও আমি মনে করি, জীবন তুলনামূলকভাবে তাকেই কষ্টের ভাগটা বেশি দিয়েছে। আমি আমার মাকে পাইনি, কিন্তু তিনি তাঁর গোটা শৈশবটাই পাননি। আর যখন কেউ কোনো কিছু কখনো পায় না, তখন সে সেটির প্রতি সারা জীবনের জন্য আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

আমি আমার পুরো শৈশব কাটিয়ে দিয়েছি মায়ের মতো কাউকে খুঁজতে খুঁজতে। কখনো কখনো সফলও হয়েছি। কিন্তু যখন কাউকে পুরো পৃথিবীর আতশকাচের নিচে থাকতে হয়, তখন কি কেউ নিজের শৈশব ফিরিয়ে আনতে পারে? মাইকেলও পারেননি। তাঁর জন্য শৈশবের অতি সাধারণ ব্যাপারগুলোই ছিল অপ্রতুল।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মাইকেল জ্যাকসন পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। মাত্র ৮ বছর বয়সে গান গেয়ে তিনি আপনার হৃদয়কে একজন পরিণত মানুষের মতো সুরের তালে মোহগ্রস্ত করে ফেলতে পারত। তাঁর নাচে ছিল ফ্রেড অ্যাস্টেয়ারের মতো সূক্ষ্মতা এবং মুহাম্মদ আলীর মতো দৃঢ়তা। তাঁর সঙ্গীতে ছিল এক অবর্ণনীয় জাদু যা আপনাকে কেবল নাচতে নয় বরং উড়তে পারার স্বপ্ন দেখাত, আপনি যা হতে চান তা হওয়ার অনুপ্রেরণা দিত। মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারা বীরদের কাজ; আর মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন একজন বীর। আমাদের সকলের একজন বীর।

তিনি বিশ্বের ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোকে মাতিয়েছেন, শতকোটি রেকর্ড বিক্রি করেছেন, বিশ্বের নামিদামি ব্যক্তিবর্গ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিদের সঙ্গে ডিনার করেছেন। মেয়েরা তাঁর প্রেমে পড়েছে, ছেলেরা তাঁর প্রেমে পড়েছে, সবাই তাঁর মতো নাচতে চেয়েছে। তিনি যেন অপার্থিব কেউ ছিলেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবুও সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি ছিলেন একজন মানুষ।

বেশিরভাগ শিল্পীর মতোই তিনি ছিলেন লাজুক এবং নিজেকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভরা। আমি বলতে পারব না যে আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম, তবে ১৯৯১ সালে আমি তাঁকে আরও ভালোভাবে জানার চেষ্টা করি। আমি তাঁকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাই এবং বলি, "ট্রিটটা আমার, গাড়ি চালাব আমি। শুধু তুমি আর আমি থাকব।" তিনি রাজি হলেন এবং কোনো দেহরক্ষী ছাড়াই আমার বাড়িতে এলেন। আমরা আমার গাড়িতে রেস্তোরাঁর দিকে রওনা হলাম। বাইরে অন্ধকার ছিল তবুও তিনি সানগ্লাস পরে ছিলেন। আমি বললাম, "মাইকেল, মনে হচ্ছে আমি একটি লিমোজিনের সঙ্গে কথা বলছি। তুমি কি চশমাটা খুলতে পারো যাতে আমি তোমার চোখদুটো দেখতে পাই?" তিনি সঙ্গে সঙ্গে চশমাটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। এক চোখ টিপ মেরে হেসে বললেন, "এখন কি দেখতে পাচ্ছো? এভাবে কি ভালো লাগছে?"

সেই রাতটার এই মুহূর্তটার কথা আমি কখনো ভুলব না। সানগ্লাসের আড়াল সরিয়ে তাঁর চোখে যখন প্রথমবার সত্যিকারের মতো চোখ রাখলাম, তখন বুঝতে পারলাম এই মানুষটা ভেতরে ভেতরে কতটা একা। ডিনারের টেবিলে আমি শুধু চাইছিলাম সে একটু বাকি দশটা মানুষের মতো স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ পাক। একটু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাক, এক চুমুক ওয়াইন নিক, হাসুক, দুষ্টুমি করুক। এসব সহজ স্বাভাবিক জিনিসগুলোই তাঁর কাছে যেন অনেক দূরের কোনো জগতের গল্প ছিল। পরে আমরা আমার বাড়িতে ফিরে একটি সিনেমা দেখতে বসলাম এবং দুটি শিশুর মতো সোফায় পাশাপাশি বসে রইলাম। সিনেমার মাঝামাঝি কোনো একসময়, তাঁর হাত চুপিচুপি এসে আমার হাত ধরল। সেই স্পর্শে প্রেমের চেয়ে বেশি ছিল বন্ধুত্বের আবেদন। আমিও সেই নিবেদন সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি কোনো কিংবদন্তি ছিলেন না বরং ছিলেন একজন অতি সাধারণ একাকী একজন মানুষ।

আমরা এরপরও আরও কয়েকবার একসঙ্গে বেরিয়েছিলাম, তারপর কিছু কারণে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর তারপরই শুরু হলো মাইকেলের জীবনের সেই নিষ্ঠুর অধ্যায় — চারদিক থেকে অভিযোগ, নিন্দা, বিচারের ঝড়। এই যন্ত্রণাটা আমি চিনতাম, হাড়ে হাড়ে চিনতাম। যখন চারদিক থেকে সমালোচনার ঢেউ আছড়ে পড়ে আর নিজের কণ্ঠস্বরটুকু সেই শোরগোলে হারিয়ে যায়। নিজের কাছেই নিজেকে তখন অপরিচিত লাগতে শুরু করে। কিন্তু আমার একটা শৈশব ছিল, ভুল করার সুযোগ ছিল, আড়ালে কাঁদার জায়গা ছিল। তাঁর সেটুকুও ছিল না কেননা জন্ম থেকেই তিনি ছিলেন সবার। যেন তার দায়বদ্ধতা ছিল সবার কাছে।

যেদিন খবর এলো তিনি আর নেই, আমি তখন লন্ডনে। মাত্র এক সপ্তাহ পরে তিনি সেই একই মঞ্চে দাঁড়াতেন যেখানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। মাথায় শুধু একটাই কথা ঘুরছিল, “আমি তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমরা সবাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।” যে মানুষটা নিজেকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করছিলেন, পরিবারকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলেন আমরা তখন তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিলাম। তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করার মরিয়া চেষ্টায় আমি তৎক্ষণাৎ ইন্টারনেটে গিয়ে টেলিভিশনে ও মঞ্চে তাঁর নাচ ও গানের পুরোনো ক্লিপ ঘেঁটে দেখা শুরু করলাম আর ভাবলাম, "হে ঈশ্বর, তিনি ছিলেন এতটাই অনন্য, এতটাই বিরল যে তাঁর মতো আর কেউ কখনো এই পৃথিবীতে আসবে না। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন রাজা।"

কিন্তু তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মানুষও, এবং আমরা সকলেই মানুষ, কখনো কখনো কোনো কিছু হারানোর পরেই আমরা তার মূল্য বুঝতে পারি।

তবুও শেষটা আমি কষ্টে শেষ করতে চাই না, সুন্দরভাবে শেষ করতে চাই। আমার চার ও নয় বছরের ছোট দুটো ছেলে আজকাল পুরো বাড়ি জুড়ে মুনওয়াক করে বেড়ায়। একটি নতুন প্রজন্ম তাঁকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখছে, নিজেদের মধ্যে লালন করছে। আমি শুধু এটুকুই চাই মাইকেল যেখানেই থাকুন, এই দৃশ্যটা দেখে যেন একটু হাসতে পারেন।  


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৪.৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

শরৎ শশী

শরৎ শশী

  • মাকসুদ খান সোহান |
  •  ০১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

  • সজীব কুমার মন্ডল|
  •  ২২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।