বিবিধ

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬: পর্ব চার — সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সময়ের অপচয় এবং পণ্য ফাঁদ


  • সুপ্তি রায়  |
  • প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৫৭
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬: পর্ব চার  —  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সময়ের অপচয় এবং পণ্য ফাঁদ
ছবি: এআই

ধরুন, একদিন সকালে ঘুম ঘুম চোখে বিছানার পাশে পড়ে থাকা ফোনটি খুঁজে পেলেন না। আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হবে? তড়াক করে বিছানা থেকে উঠে উল্টেপাল্টে খুঁজতে থাকবেন? মনে হবে, তক্ষুনি ফোনটি না পেলে যেন বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবে! অথচ হয়তো সেই মুহূর্তে ফোনে আপনার কোনো কাজই নেই। শুধুই অভ্যাসবশত ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের পর্দা স্ক্রল করার তাড়নায় আপনি ফোনটি খুঁজছেন।

(এখানে পড়ুন: পর্ব এক, পর্ব দুই এবং পর্ব তিন

এটি একুশ শতকের আধুনিক পৃথিবীতে কমবেশি আমাদের সবার গল্প। প্রয়োজন না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেন আমাদের অভ্যাস, কখনো বদভ্যাসে, পরিণত হয়েছে। আমরা চাইলেও সহজে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। কারণ মানুষ অভ্যাসের দাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এসব মাধ্যম ব্যবহার করছি? এতে কি সত্যিই আনন্দ ও বিনোদন পাচ্ছি, নাকি অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে নিজেদের হতাশা ও দুঃখ অজান্তেই বাড়িয়ে তুলছি?

২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট-এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে এ বিষয়ে তিনটি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার মানুষের সুখ ও মানসিক স্বস্তি বাড়ায় কি না, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। অধ্যায়ের লেখকের মতে, অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন মূলত অন্যরাও ব্যবহার করছেন বলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব হলে তাঁদের অনেকেই ভালো থাকতেন এবং এ বিষয়ে তাঁরা নিজেরাও সচেতন।

অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের আনন্দ ও স্বস্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ অনেক ব্যবহারকারীই সচেতন যে এসব প্ল্যাটফর্মে সময় কাটানো তাঁদের জন্য সবসময় উপকারী হচ্ছে না।

প্রথম গবেষণায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের আর্থিক মূল্য সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের দুটি প্রশ্ন করা হয়। একটি হলো, তাঁরা এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার জন্য কত টাকা দিতে রাজি। অন্যটি হলো, ব্যবহার বন্ধ করার বিনিময়ে তাঁরা কত টাকা দাবি করবেন। দেখা যায়, ব্যবহার করার জন্য তাঁরা যে পরিমাণ টাকা দিতে রাজি, ব্যবহার বন্ধ করার জন্য যে পরিমাণ অর্থ দাবি করেন তার তুলনায় তা অনেক কম। গবেষণাটি এমন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয় যে, অনেক ব্যবহারকারী নিজেরাই মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁরা সময় নষ্ট করছেন।

দ্বিতীয় গবেষণায় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের এক মাস ফেসবুক থেকে বিরত রাখার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। যারা এক মাস ফেসবুক ব্যবহার করেননি, তাঁরা বিভিন্ন দিক থেকে ভালো ছিলেন। তাঁরা বেশি সুখী, জীবন নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট, কম উদ্বিগ্ন এবং কম বিষণ্ন ছিলেন। তবে এই উন্নতির মাত্রা খুব বেশি ছিল না, যদিও তা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

তৃতীয় গবেষণাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কলেজ শিক্ষার্থী অংশ নেন। গবেষণাটিতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এক মাস টিকটক ডিঅ্যাক্টিভেট রাখার জন্য গড়ে ৫৯ ডলার এবং ইনস্টাগ্রাম ডিঅ্যাক্টিভেট রাখার জন্য ৪৭ ডলার দাবি করেন। কিন্তু তাঁদের কমিউনিটির সবাই, নিজেদেরসহ, এক মাস টিকটক বন্ধ রাখলে তাঁরা ২৮ ডলার এবং ইনস্টাগ্রাম বন্ধ রাখলে ১০ ডলার পর্যন্ত দিতে রাজি ছিলেন। অর্থাৎ, অনেকে নিজেরা ব্যবহার বন্ধ করার জন্য অর্থ দাবি করলেও, অন্য সবাই একই সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করলে তার জন্য অর্থ দিতে প্রস্তুত।

এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার না করলে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা। ‘অন্যরাও তো ব্যবহার করছে, আমি করলে দোষ কী?’ এই মনোভাব অনেককে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে ধরে রাখে। অন্যরা ব্যবহার করতে থাকলে নিজে ব্যবহার না করার কারণে সামাজিক ক্ষতির আশঙ্কাও করেন অনেকে। 

এই পরিস্থিতিকে গবেষকেরা ‘পণ্য ফাঁদ’ বা ‘product trap’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, মানুষ এমন একটি পণ্য বা সেবা ব্যবহার করছে, যা না থাকলে সে হয়তো ভালো থাকত, কিন্তু অন্যরা ব্যবহার করছে বলেই নিজেও ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এটি অনেকটা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার আশঙ্কার মতো।

তাই এই তিনটি গবেষণার মূল শিক্ষা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এমন কিছু ব্যবহার করছে, যা তারা একই সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চায়? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বই বড় সমস্যা। অনেক ব্যবহারকারী জানেন যে এসব প্ল্যাটফর্ম তাঁদের জন্য সবসময় ভালো নয়, কিন্তু অন্যরা ব্যবহার করতে থাকায় তাঁরাও সরে আসতে পারেন না। 

তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া জরুরি। নিজের সময়, মানসিক স্বস্তি ও ভালো থাকার কথা বিবেচনা করে এর  অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো এবং ডুমস্ক্রলিং তথা ইন্টারনেটে যথেচ্ছ কন্টেন্ট ঘাঁটার কুঅভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা প্রয়োজন। 

(এখানে পড়ুন: হোপস্ক্রলিং  এবং হোপস্ক্রলিং 


ক্যাটাগরি: বিবিধ

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

মাদক-নির্ভরতা: অন্তহীন এক চক্র থেকে মুক্ত হতে পেরেছি

  • অপু চৌধুরী|
  •  ২৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

হাইস্পিড জীবন

হাইস্পিড জীবন

  • স্মৃতি রানী বর্মণ|
  •  ১৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

কেন কুতথ্যের বদলে ছড়াব সুতথ্য?

  • আহমেদ শারজিন শরীফ|
  •  ০৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

৩.৮

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

সামাজিক পক্ষপাতের ফাঁদ কীভাবে এড়ানো যায়?

  • সুমাইয়া রহমান তুলি|
  •  ২২-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিবিধ

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।