সাময়িকী

হোপস্ক্রলিং : ডিজিটাল যুগের আশীর্বাদ


  • সুপ্তি রায়   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ২১:৪৮
হোপস্ক্রলিং : ডিজিটাল যুগের আশীর্বাদ
ছবি: ইমরুল আহসান

আনিকা দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী। সামনে তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। পড়ার টেবিলে বসে সে একটা ইংরেজি শব্দের অর্থ খুঁজতে ফোনটা হাতে নিলো। ব্যাস! চলে গেলো দুই ঘন্টা।ফেইসবুক থেকে ইউটিউব, ইউটিউব থেকে ইন্সটা,হোয়াটস্যাপ স্ক্রল করে সে যখন বইয়ের দিকে তাকালো,তখন তারমনে পড়লো,শব্দার্থ খোঁজার জন্য সেফোনটা হাতে নিয়েছিল। উপরের ঘটনাটি আমাদের অনেকেরই দৈনন্দিন জীবনের চিত্র। এই প্রযুক্তির যুগে ডুমসস্ক্রলিং যেন এক অযাচিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। 

আপনিও কি ফোনস্ক্রল করতে গিয়ে সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলেন? সকালে বা মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে প্রথম আপনি ফোন খোঁজেন ? তবে এই লেখাটিআপনার জন্য। 

যদিও ফোনের অহরহ ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলেছে,তা সবসময় আমাদের ভালোর জন্য নয়। কখনো কখনো আমরা স্ক্রলিং এর দুষ্টচক্র এমন ভাবে আটকে যাচ্ছি যে আমাদের জীবনের লক্ষ্য, সময় আর স্বপ্নগুলো ফোনের স্ক্রিনেই হারিয়ে যাচ্ছে। 

আমরা কেন স্ক্রল করি? 

জেন কেলি, এইচএইচএস ইনসুরেন্স এবং নাওমি ওয়াইল্ড এর লেখা অবলম্বনে জীবনজয়ীর প্রতিবেদন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন তা ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।তাই এটা পুরোপুরি আমাদের দোষ নয়।

‘ডু নট ডিসটার্ব: হাউ টু সে নো টু ইওর ফোন’ বইয়ের লেখক মার্শাল এবং লিন্ডসের মতে, প্রযুক্তিআমাদেরকে টানে। কারণ যখনই আমরা একটি লাইক বা কমেন্ট পাই,আমাদের মস্তিস্ক ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।আর আমরা বারবার ফিরে আসতে থাকি, যা ডুমস্ক্রলিংএর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। তবে আশার কথা এইযে, এই নেতিবাচক ডুমস্ক্রলিংকে পাল্লা দিয়ে হোপস্ক্রলিং নামক আরেকটি ধারণা ইদানীংজনপ্রিয় হয়েউঠছে। বিশেষজ্ঞরা একে কাইন্ডনেস স্ক্রোলিংও বলে থাকেন। 

হোপস্ক্রলিংকি?

হোপস্ক্রলিং হলো এমন একটি ধারণা যাতে অবচেতন মনকে প্রশ্রয় না দিয়ে আমরা সচেতনভাবে নিজেদের ফোনের নিউজফিড নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ইতিবাচক কন্টেন্ট বা পেজ ফলো করতে পারি। যেমন- অনুপ্রেরণা দানকারী বিভিন্ন গল্প,কবিতা বা ভ্রমণসংক্রান্ত ভিডিও বা শিক্ষণীয় বিভিন্ন ভিডিও থেকে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারি। এর জন্য মূলত প্রয়োজন আত্মসচেতনতা। আমার হাতের ফোনটি যেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, বরং আপনি কি ধরণের কনটেন্ট দেখবেন- তা সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন।ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক পেজ বা একাউন্টগুলো আনফলো করে দিন। যেন সেগুলো আপনার দৈনন্দিন কাজে ‘ডিজিটাল বাধা’ হয়ে না দাঁড়াতে পারে। এটিই হোপস্ক্রলিং এর মূল ধারণা। 

হোপস্ক্রলিং এর সুবিধা কী

মানসিক চাপ কমানো: 

ডিজিটাল পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা হাজারটা নেতিবাচক খবর, ভুয়া গল্প এসব নিয়মিত দেখার ফলে আমাদের শরীর ও মনে যে প্রভাব পড়ে, তা অকল্পনীয়। হোপস্ক্রলিং এই নেতিবাচক দুনিয়া থেকে আমাদের দূরে রাখে এবংমানসিক চাপ কমায়।

সহমর্মিতা বাড়ানো : মানুষ যেন ইদানীং যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। নিত্যদিনের নানা ঝামেলা, চারপাশে এত নেতিবাচকতা থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুক্তি দেবে হোপস্ক্রলিং। এতে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।

হতাশা কমানো : গবেষণায় দেখা গেছে যে, হোপস্ক্রলিং এর অভ্যাস মানুষের মধ্যে নেতিবাচকতা কমিয়ে হতাশা, দুঃখ বা অহেতুক চিন্তার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম নিশ্চিত করে। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মত বড়বড় রোগের ঝুঁকি কমায়। কিভাবে হোপস্ক্রলিং এর অভ্যাস গড়ে তোলা যায়?

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতমকঠিন কাজ। অনেকদিন ধরে গড়ে ওঠা এই ডিজিটাল ডুমস্ক্রলিং এর নিয়ন্ত্রণ করা খুব একটা সহজ নয়। তবে, কিছু বিষয় মাথায় রাখলে অবশ্যই হোপস্ক্রলিং এর অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। 

একটি নির্দিষ্ট সময় সেট করুন

হোপস্ক্রলিং এর মানে একেবারে স্ক্রলিং বাদ দিয়ে দেয়া নয়।বরং আপনি নিজের ইচ্ছামতো ফোনে একটি ২০/৩০ মিনিটের টাইমার সেট করে নিন এবং শিক্ষণীয় কিছু (যেমন, খবরের হেডলাইন বা বেসিক কম্পিউটার স্কিলস) দেখুন। এছাড়াও এখন ফোনে স্ক্রিন টাইম লিমিটও সেট করা যায়, সেটিও করতে পারেন।

প্রয়োজনে ডিলিট করুন

যদি আপনার মনেহয়, নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়েও কাজ হচ্ছেনা- সেক্ষেত্রে আপনি সেইএপসগুলো কিছুদিনের জন্য ডিলিট করে দিতে পারেন। এতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার পথে আপনি আরো একধাপ এগিয়ে যাবেন! 

নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন

এই এন্ড্রোয়েড, ফেইসবুক, টুইটারের যুগে সবচেয়ে পরিচিত শব্দ নোটিফিকেশন , যা মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। 

তাই কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ। 

আপনার নিউজফিড নিয়ন্ত্রণ করুন 

বিভিন্ন ইতিবাচক পেজঅনুসরণ করুন, যেগুলো আপনাকে নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী করে তোলে। এমন কিছু মানুষকে ফলো করুন যারা আপনাকে বরাবর অনুপ্রাণিত করে, যারা ভ্রমণ করে,ছবিআঁকেন, পোষাপ্রাণী রাখে এবং জীবনকে উপভোগ করেন।

নিজেকে সময় দিন 

এই ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’ এর ভেতরে কোথাও যেন আমরা নিজেকে সময় দিতেই ভুলে গেছি। ফোনে মুখ গুঁজে না থেকে আমরা যদি নিজেকে প্রশ্ন করি- আমরা কি চাই? এই জীবন নিয়ে আমরা কি অনুভব করি?

তাহলে এই ডিজিটাল ট্র্যাপ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলবে। তাই যতটা সম্ভব নিজেকে সময় দেয়া উচিত,যোগ্য করে তোলা উচিত। 

এনড্রয়েড ব্যবহার না করা

যদি এরপরও আপনার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তবে আপনি বিকল্প উপায় বাটন ফোন ব্যবহার করতে পারেন। এই ফোনগুলো আপনার জন্য একটি ভালো অপশন হতে পারে- যেহেতু এই ফোনগুলোতে ইমেইল, হোয়াটস্যাপ বা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ নেই। যদি আপনি সপ্তাহে কয়েকবারও ডুমস্ক্রলিং ছেড়ে হোপস্ক্রলিং করেন, অর্থাৎ সচেতনতার সাথে ফোন ব্যবহার করেন,তবে নিজেই আপনার উন্নতি বুঝতে পারবেন। তবে, এতকিছুর পরও যদি আপনার আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব নাহয়, সেক্ষেত্রে আপনি কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। 


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

শরৎ শশী

শরৎ শশী

  • মাকসুদ খান সোহান |
  •  ০১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

  • সজীব কুমার মন্ডল|
  •  ২২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।