সাময়িকী

সাবাতিনার কী হয়েছিল?


  • কানিজ সাবাতিনা দিপা  |
  • প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০২:১১
সাবাতিনার কী হয়েছিল?
ছবি: এআই

‘সাবাতিনার কী হয়েছিল’ অবলম্বনে গল্প লিখুন। গল্প পাঠাবেন ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে। জীবনজয়ীর  বিবেচনায় সেরা তিন গল্পের জন্য থাকছে যথাক্রমে তিন হাজার, দুই হাজার ও এক হাজার টাকার বুক-কূপন। 

‘সাবাতিনার কী হয়েছিল’ লেখাটি কোনো কষ্টকল্পনা বা গল্প নয়। লেখক নিজের অভিজ্ঞতার কথাই লিখেছেন এখানে। কাহিনির শেষ হয়েছে যেখানে, সেখান থেকেই শুরু করবেন আপনি। কল্পনার ডানা মেলে গল্পটিকে এগিয়ে নেবেন আপনি। জীবনজয়ীর একটাই চাওয়া—সাবাতিনার গল্প শেষ হবে বন্ধুত্ব, প্রেম ও ভালোবাসার জয়গানে।

গল্পের শিরোনামে সাবাতিনা নামটি থাকবে। সর্বোচ্চ বারশো শব্দের মধ্যে লিখুন।           

পুরো নাম, পরিচয়, যোগাযোগের মোবাইল/হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিন লেখার শুরুতে।

গল্প পাঠানোর ইমেইল: jibonjoyee@gmail.com


সাবাতিনার কী হয়েছিল? 

আমি সাবাতিনা, হুট করে একদিন ট্রেনে এক ভালো মানুষের দেখা পেয়েছিলাম। আজ তার সাথে সেই ট্রেনযাত্রার গল্প রইলো জীবনজয়ীর পাঠকদের জন্য। 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মামাতো ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান। যাবো ঢাকা থেকে রংপুর। কোন ট্রেনে যাওয়া ভালো হবে জানতে চাইলে মামাতো বোন বলল, “দ্রুতযানে যাও। ট্রেন পার্বতীপুরে নামাবে, সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে করে রংপুর খুব সহজেই যেতে পারবে।”  

দ্রুতযানের পার্বতীপুরে পৌঁছানোর কথা রাত পৌনে চারটার দিকে। শীতের রাতে সেই সময়টা মানে বুঝতেই পারেন। বোন আশ্বস্ত করে বললো, “ট্রেন তো লেট করেই যায়, তো্মাকে সকাল সাতটার আগে নামাবে না। আমি শিওর।”  

ওর কথায় বিশ্বাস করে টিকেট কেটে ফেললাম। কমলাপুর রেলস্টেশনে আসতে ট্রেন কিছুটা দেরি করলেও, পরে দেখি চমৎকার গতিতে এগোচ্ছে। দেখেশুনে টিকেট করাতে আমার সিট ছিল ঠিক জানালার পাশে। উঠার সময় পাশের সিটটা ফাঁকা ছিল। কিছুক্ষণ পর এক যুবক এসে সেই সিটে বসে পড়ল। তার বয়স হবে আনুমানিক আটাশ-উনত্রিশ।  

রোজ কতশত খারাপ অভিজ্ঞতার গল্প শুনি। শুনে শুনে  যা হয় - অপরিচিত পুরুষ পাশে বসাতে কিছুটা বিরক্তিই লাগল। কিন্তু আমি আশ্চর্য হলাম। ছেলেটি ভদ্রভাবেই বসে রইল। একবারও সিটের হাতলে হেলান দিল না, শরীর ছুঁয়ে বসার চেষ্টা করল না, কোনো কথাও বলার আগ্রহ দেখাল না।  

সবমিলিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট শুরু হলো যাত্রা। আরামে বসে ট্রেনের জানালার হাওয়া খেতে খেতে আর বাইরের মনোরম দৃশ্য অন্ধকারে যতটুকু দেখতে পাওয়া যায় তাই দেখছিলাম। জয়পুরহাট পার হওয়ার পর বুঝলাম, ট্রেন আমাকে সকাল হওয়ার আগেই পার্বতীপুর নামিয়ে দেবে। এবার কি হবে? এখন দরকার হয়ে পড়লো স্টেশন, রুট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সবকিছু জানা।  

একপ্রকার বাধ্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার বাসা কোথায়?”  

বললেন, “পার্বতীপুরেই।” 

“এই সময় পার্বতীপুর থেকে রংপুর কীভাবে যাওয়া যাবে?”  

উনি জানালেন, “স্টেশন থেকে অটোতে বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। পাঁচটায় একটা বাস রংপুর যায়। নইলে লোকাল ট্রেনের জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।”   

একি কথা! দুটো উপায়ের কোনটাই আমার কাছে যুতের মনে হচ্ছিল না। কিন্তু বিকল্পও তো আর নেই। উনি সম্ভবত আমার উদ্বেগ বুঝতে পারলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। কথা আর বাড়লো না। অনিশ্চয়তার চোটে আমার অবস্থা জেরবার!

ভোর চারটায় ট্রেন পার্বতীপুরে নামিয়ে দিয়ে গেল। চারপাশে অন্ধকার। মফস্বলি স্টেশন। মানুষের আনাগোনা কম। হঠাৎ দেখি, তরুনটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে। বললেন, “বাসে যাওয়ার চেয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করে ভোর হলে লোকাল ট্রেনে যান। আমি ট্রেনের সময় কখন খোঁজ নিচ্ছি।”  

আমি বেশ দ্বিধায় ছিলাম। চিনি না, জানি না—কীভাবে ভরসা করি? উনিও সেটা বুঝলেন। স্টেশন থানার সামনে কিছু মানুষ চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। কয়েকজন পুলিশও ছিলেন। উনি আমাকে সেখানে বসতে বললেন।  

চায়ের দোকানে গিয়ে ট্রেনের সময় জেনে এসে বললেন, “চা খাবেন?”  

আমি বললাম, “আমি চা খাই না ভাইয়া।”  

উনি হেসে নিজের জন্য চা নিয়ে বসলেন। বললেন, “ছয়টার দিকে ট্রেন আসবে।”  

এরপর টুকটাক গল্প শুরু হলো আমাদের। 

বললেন, বাবা অসুস্থ, “ইন্ডিয়া নিয়ে যেতে হয়েছিল। বাসায় মা আর ছোট বোন।”  

আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় পড়াশোনা করেন?”  

বললাম, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।”  

উনি জানালেন, IUBAT থেকে বিবিএ শেষ করে, এখন চাকরি করছেন।  

“এই দেখেন, পিচ্চি একটা রুপি।”  

হাতের দিকে তাকিয়ে দিকে একটা ভারতীয় রুপির কয়েন। হেসে কয়েনটা দেখার জন্য হাতে নিলাম।  

তিনি বললেন, “এইটা আপনি রাখেন।”  

বললাম, “না না, ধন্যবাদ!  সুন্দর। কিন্তু কয়েনটা নিবো না।”  

“ আরে রাখেন। কয়েনটা দেখলেই আজকের কথা মনে হবে। এই যে এক রাত-বিরাতে স্টেশনে বসে ছিলেন, প্যাঁচার মতো!”  

আমার পার্সে একটা দশ রুপির নোট ছিল।  

উনাকে দিয়ে বললাম, “আপনি তাহলে এটা রাখুন। অপরিচিত একটা মেয়েকে এমন দুঃসময়ে সাহায্য করেছেন—এইটা তার টোকেন।”  

“না না, এটা তো বড় নোট, ক্যামনে রাখি?”  

আমি একটু জোর করায় তখন বললেন, “একটা শর্তে রাখবো। আমার কাছে ওমানের একশ টাকার একটা নোট আছে, আপনি তাহলে সেটা নেন।”  

উনি মানিব্যাগ থেকে একটা আরবি লেখা নোট বের করলেন। আমি সাধারণত কারো কাছ থেকে কিছু নিই না। কিন্তু সেদিন নিলাম।  

আমাদের গল্প এগুতে থাকে আপনতালে। উনার পরিবারের কথাই বেশি বলছিলেন। জানালেন শীঘ্রই বাইরে চলে যাবেন, সব গুছিয়ে নিচ্ছেন।  

অবশেষে ভোর পাঁচটায় ট্রেন এল। তখনও চারদিকে  অন্ধকার।  উনি বললেন, “লোকাল ট্রেনের ভিতরে লাইট নাই। এখন উঠবেন না, আরেকটু পর উঠেন।”  

সাড়ে পাঁচটায় ট্রেনে উঠলাম। উনিও উঠলেন। বগি থেকে বগি ঘুরে দেখলেন। পুরো ট্রেনটাই প্রায় ফাঁকা। একটা বগিতে দুইজন মহিলা খুঁজে বের করলেন। আমার লাগেজ র‍্যাকে রেখে বললেন, “মহিলা দুজনের পাশে বসেন। আরেকটু পর আলো ফুটে যাবে, সমস্যা হবে না।”  

আমি বসলাম। ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত উনি সামনের সিটে বসে থাকলেন। 

ছয়টা বাজলো। ট্রেন ছাড়বে। এবার তিনি ট্রেন থেকে নেমে গেলেন। 

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। তিনি স্মিত হেসে হাত নেড়ে বিদায় দিলেন।  

আমিও হাত নেড়ে ‘টা টা’ দিয়ে বিদায় জানালাম।  

আমার মনে এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করল। এই মানুষটা আমার নামও জানেন না। একবার মনে হয়েছিল, হয়তো যাওয়ার আগে কন্ট্যাক্ট নাম্বার চাইবেন। কিন্তু না—আমার নামটা পর্যন্ত তিনি জিজ্ঞেস করলেন না।  

শীতের রাতে, ভোর চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত, শুধুমাত্র একজন অপরিচিত মেয়েকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য স্টেশনে বসে ছিলেন। কোনো প্রত্যাশা ছাড়া, নিছক মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।  

এই ভালো মানুষগুলো আছে বলেই সমাজ এখনো টিকে আছে। 


ক্যাটাগরি: সাময়িকী

         

  রেটিং: ৪

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আমার সেরা তিনটি দিন

আমার সেরা তিনটি দিন

  • ইসমাইল সাব্বির|
  •  ১২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

আমার মেয়েবেলা

আমার মেয়েবেলা

  • মৌমিতা সেন |
  •  ০৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

পুরুষশাসিত চীনে যেভাবে হলো এক নারীর উত্থান

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৪-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

শরৎ শশী

শরৎ শশী

  • মাকসুদ খান সোহান |
  •  ০১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

 কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

কার্পে ডিয়াম: মুহূর্তকে উপভোগ করো

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

মাইকেল জ্যাকসনের ধরিত্রীগীতি

  • সজীব কুমার মন্ডল|
  •  ২২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাময়িকী

৩.৭

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।