এক প্রজন্ম যে দাবি সামনে রেখে রাস্তায় নেমেছিল, পরের প্রজন্ম হয়তো সেই একই অধিকারের আরও বিস্তৃত রূপ দাবি করে। সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, আন্দোলনের ভাষাও বদলায়। কিন্তু বৈষম্য, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নগুলো নতুন নতুন রূপে ফিরে আসে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে এমনই এক বাস্তবতার কথা বললেন সংগঠনটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। গত ১১ আগস্ট জীবনজয়ীর সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় উঠে এসেছে নারী অধিকার আন্দোলনের সাফল্য, সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, পারিবারিক সালিশ, রোকেয়া সদনের অভিজ্ঞতা, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নারী আন্দোলনের ভবিষ্যতসহ নানা প্রসঙ্গ।
জীবনজয়ী: জীবনজয়ীর পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা। আপনার ব্যস্ত সময় থেকে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। কেমন আছেন?
ফওজিয়া মোসলেম: ভালোই। এখনো চলে ফিরে বেড়াচ্ছি। এই বয়সে এর চেয়ে বেশি আর কী?
জীবনজয়ী: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ তো বাংলাদেশে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের অধিকার সংগ্রামে একটি অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান। আপনারা অনেক বছর ধরে নারী অধিকারের জন্য লড়াই করছেন। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা যদি বলেন?
ফওজিয়া মোসলেম: প্রথমে ধন্যবাদ জানাই জীবনজয়ীকে, মহিলা পরিষদকে এত উঁচু মূল্যায়ন করার জন্য। দেশের মধ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কাজ করছে, এটা ঠিকই আছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সংগঠন হয়ে উঠেছি কি না, তা অন্যরা ভালো বলতে পারবেন। আমি জানি, আমাদের অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
নারী অধিকারের ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা বলতে গেলে, এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বলব, নারীদের মধ্যে অধিকার নিয়ে বড় ধরনের জাগরণ এসেছে। নারীদের মধ্যে আত্মপরিচয়টাকে তুলে ধরার একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে। এটা আমি মনে করি সবচেয়ে বড় সাফল্য।
অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে হয়তো এতটা সাফল্য নেই, কিন্তু নারীরা অধিকারসচেতন হয়েছে, এটা একটা বড় সাফল্য বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া নারীরা প্রতিকূলতার মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু সুযোগ-সুবিধা তৈরি হয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
এখন এমন অনেক পেশায় নারীরা যাচ্ছেন, যেসব পেশায় যাওয়ার কথা আগে কেউ ভাবত না। ট্রেনের ড্রাইভার, এখন তো মাঝে মাঝে নারীকে রাস্তায় সিএনজি চালাতেও দেখা যায়। অর্থাৎ সব পেশায় নারীরা ঢুকছে।
নারীরা যখন সাংবাদিকতা পেশায় আসতে শুরু করেছিলেন, তখন তাদেরও অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নানা ধরনের কটু মন্তব্য, বাঁকা মন্তব্য শুনতে হয়েছে। তারপরও মেয়েরা সাংবাদিকতা করছে। এটা একটা জয় বলেই আমি মনে করি। মেয়েরা এগিয়ে আসছে, চাকরি করছে, বিভিন্ন পেশায় আসছে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীর প্রতি যে বৈষম্য, সেই বৈষম্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। নারী-পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য সমাজে আছে, সবাই এটা না ভাবলেও অনেকেই তা ভাবছেন। ইস্যুটি সামনে আছে।
কেউ এই বৈষম্য দূর করতে চায়, কেউ এই বৈষম্যের পক্ষে থাকে। কিন্তু নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের বিষয়টি এখন আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন।
জীবনজয়ী: মহিলা পরিষদ কাজ করেছে, এমন কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা সফল আন্দোলনের কথা যদি বলেন?
ফওজিয়া মোসলেম: সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের অনেক আন্দোলন হয়েছে।
১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে সিলেটের ছাতকছড়ায় ফতোয়া দিয়ে পাথর ছুড়ে নূরজাহানকে হত্যার বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলনের কথা মনে পড়ছে। তালাকের পরে আবার নতুন সংসার করা তাঁর অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছিল। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেটা শুধু জাতীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
যৌতুকের বিরুদ্ধেও এরকম আন্দোলন আছে আমাদের, যেগুলোর নাম আমি এই মুহূর্তে হয়তো বলতে পারছি না।
এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের যে নির্দেশনা এসেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি সহিংসতার অভিযোগ করতে হবে, অভিযোগ কমিটি থাকতে হবে। এই হাইকোর্টের নির্দেশনাটা এখনো আইন হয়নি, কিন্তু নির্দেশনা এসেছে।
সহিংসতার বিরুদ্ধে কিছু আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও আমাদের কিছু অর্জন আছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও পারিবারিক সুরক্ষা আইন হয়েছে। যদিও এগুলোর প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু কিছু আইন তৈরি হয়েছে, যেগুলো নারীবান্ধব।
আমরা রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী রাখার যে নির্দেশনা রয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের কথাও বলছি। এর জন্য আমরা ক্রমাগত অ্যাডভোকেসি করে চলেছি।
কিছুদিন আগে পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ ও পাঠাগার এবং উত্তরবঙ্গে আমাদের সব শাখা নিয়ে একটা সমাবেশ করেছিলাম। এটা বড় একটি আয়োজন ছিল। ২০২৪ সাল থেকে বেগম রোকেয়াকে নিয়ে যেভাবে নানা ধরনের কটূক্তি করা হচ্ছে, সেটার বিরুদ্ধে একটা অবস্থান নেওয়ার জন্য আমরা সেখানে দাঁড়িয়েছিলাম।
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও আন্দোলন হয়েছে। নারী অধিকারের বিপরীতে যেসব ইস্যু প্রচার করা হচ্ছিল, সেগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি।
(এখানে পড়ুন: বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে)
জীবনজয়ী: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?
ফওজিয়া মোসলেম: চাকরির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে যদিও আমাদের সুযোগ খুবই সীমিতভাবে বেড়েছে। তারপরও লক্ষ্য করবেন যে রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী থাকার যে নির্দেশনা আছে, এর পক্ষে চাপ বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলো এটা নিয়ে কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে।
জীবনজয়ী: সারা দেশে মহিলা পরিষদ কাজ করছে। দীর্ঘকাল ধরেই করছে। চলতি বছর বা সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো ঘটনা বা কাজের কথা কি মনে পড়ে, যেটাকে আপনি উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন?
ফওজিয়া মোসলেম: কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমাদের নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। কোভিডের সময় আমাদের একটা বড় বিষয় ছিল সংগঠনটাকে টিকিয়ে রাখা এবং কাজগুলো করা। তখন আমরা দেখেছি, সারা দেশের কমিটিগুলো নতুনভাবে নিজেদের তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অনেক ইন্টারেস্টিং প্রোগ্রাম তারা করেছে। কোথাও কোথাও বিকেলবেলায় পত্রিকা পাঠের আসর হয়েছে। আবার স্কুলের মেয়েদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম করেছে। ঢাকাতে আমরা এগুলো কম করতে পেরেছি।
এখনো বিভিন্ন জেলায় দারুণ কিছু কাজ হচ্ছে। সুনামগঞ্জ, দিনাজপুরের মতো জায়গায় অনেক ধরনের কাজ হচ্ছে। যেমন, উঠান বৈঠক। সেখানে আলোচনার ভিত্তি ও পদ্ধতি ভিন্নতর।
জীবনজয়ী: সালিশির ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতার কথা কি বলতে পারেন?
ফওজিয়া মোসলেম: যদি বৈবাহিক সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের দিকে চলে যায়, তখন নারীর জন্য দেনমোহরের টাকাটা আমরা আদায় করে নিই। চলতি বছরে জেলাগুলো এবং কেন্দ্র মিলে আমরা ৬৮ লাখ টাকা আদায় করেছি। খোরপোষের টাকা নিয়ে একটু সমস্যা হয়। কোর্টে খোরপোষের অর্ডার হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এটা মান্য হয় না।
জীবনজয়ী: বর্তমানে কী কী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে মহিলা পরিষদ?
ফওজিয়া মোসলেম: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ শুরু থেকেই একটা হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে কাজ করে। আমাদের লিগ্যাল এইড আছে, ট্রেনিং-রিসার্চ আছে, অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট আছে, ক্যাপাসিটি বিল্ডআপ আছে। এগুলো সবই চলছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ১৪টি উপপরিষদের মাধ্যমে কাজ করে। আমরা বেশ কয়েকটি জেলায় সম্মেলন করেছি। নতুন কমিটি করা হয়েছে। আমরা নিয়মিত সহিংসতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে আসছি।
প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও এ বছর আমাদের দ্বিতীয় কোর্স হয়েছে। গত বছর থেকে আমরা গবেষণাপদ্ধতির ওপর নতুন একটা কোর্স শুরু করেছি। সমাজের মানুষের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে আমরা দুটি কাজ শুরু করছি। একটি হচ্ছে কিশোরী স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ঢাকা শহরে একটি এবং নারায়ণগঞ্জে একটি কেন্দ্র শুরু করেছি।
একটি রিসার্চ ও রিসোর্স সেন্টারের কাজ অচিরেই শুরু হবে। এর জন্য আমরা দেশের ভেতর থেকে ভালো একটি অনুদান পেয়েছি। এ ব্যাপারে অচিরেই আমরা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেব।
এ ছাড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সেক্রেটারিয়েটে ৬৪টি সংগঠন নিয়ে একটি সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আছে। এই সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নিয়ে এ বছর আমরা কাজ করেছি। এখনো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। প্রস্তুত করে পার্টনারদের কাছে দেওয়া হয়েছে।
মহিলা পরিষদকে সংগঠিত করা, আমাদের প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করা এবং গ্লোবাল মুভমেন্টের সঙ্গে আমাদের অংশগ্রহণ করা, এই তিনটি কাজ আমরা ধারাবাহিকভাবে করার চেষ্টা করছি।
(এখানে পড়ুন: জুনকো তাবেই : আমি একবারের জন্যও হার মানার কথা ভাবিনি)
জীবনজয়ী: আপনি সুদীর্ঘকাল মহিলা পরিষদের সঙ্গে আছেন। আপনার নিজের এমন দুই-একটি অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করেন, যেগুলো মনে পড়লে আপনার ভালো লাগে?
ফওজিয়া মোসলেম: মহিলা পরিষদে যখন যুক্ত হই, তখন বুঝিনি যে এর কাজটা এত বিশাল। এটা যে এক প্রজন্মে শেষ হবে না, দুই প্রজন্মেও শেষ হবে না, সেটা ভাবিনি। এখন এসে বুঝতে পারি যে এই অভিজ্ঞতাটা আমার জন্য একটা বড় বিষয়।
আমরা যদি সেনেকা ফলসের দিকে তাকাই, ১৮৪৮ সালে নারীর প্রথম সংগঠিত আন্দোলনের সময় যে কথা বলা হয়েছিল, এত বছর পরে এখনো আমরা অনেকটা সেই কথাই বলছি। কিন্তু তার মানে কি আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি? তা কিন্তু না। একই কথা বলছি, অন্যভাবে বলছি।
আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইস্যুর ক্ষেত্রে খুব বড় পরিবর্তন হচ্ছে। কিছু ইস্যুর মধ্য দিয়ে, কিছু কল্যাণমূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কিছু সুযোগ হয়তো হচ্ছে, কিন্তু অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।
জীবনজয়ী: আপনার নিজের কথা কিছু কি বলবেন?
ফওজিয়া মোসলেম: মহিলা পরিষদে আমি যুক্ত হয়েছি ১৯৭২ সালে। তখন নতুন জীবনও শুরু হয়েছে। পড়ালেখা শেষ করেছি, বিয়ে-শাদি করেছি, বাচ্চা হয়েছে। একদিকে সংসার, আরেকদিকে চাকরি। আমার স্বামী সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ ছিলেন। আমরা বিয়েই করেছিলাম এই বোঝাপড়া নিয়ে যে সংসারটা আমি চালাব।
একবার মানিকগঞ্জ যাব, ঠিকঠাক হয়ে আছে। আমি আর আমাদের শান্তি দত্ত নামে একজন সিনিয়র আপা, আমরা দুজন যাব। যাওয়ার দুই-এক দিন আগে আমার বাসার কাজেকর্মে সহযোগিতা দেওয়া মেয়েটি চলে গেল। আমার মেয়ে তখন দেড় বছরের। তাকে আমি কার কাছে রেখে যাব?
খুঁজে-খুঁজে আগের দিন একজনকে পেলাম। পরের দিন মেয়েটাকে তার কাছে রেখে আমি মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে বের হলাম। তিন দিনের জন্য যেতে হবে। তখন রাস্তাঘাটও ভালো ছিল না। মানিকগঞ্জের তিন-চারটি জায়গায় মিটিং করব। বাসে গিয়ে ওইসব এলাকা ঘুরে তিন দিন লাগবে।
আমি যখন বাসা থেকে বের হচ্ছি, তখন আমার মেয়ের চোখের দৃষ্টি এখনো মনে আছে। কী একটা অসহায় অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম ওকে। কিন্তু আমি তখন কাজটাকে প্রায়োরিটি দিয়েছি। কাজটাকে সবসময় প্রায়োরিটি দিয়েছি। বাচ্চাদের হয়তো অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু কাজকে কখনো সংসারের সামনে নিয়ে আসিনি।
রোকেয়া সদনের গল্পটা বলি।
হাজারীবাগে আমাদের একটা কমিটি ছিল। সেই কমিটিতে আমাদের একজন আপা ছিলেন, রাবেয়া আপা। তাঁর স্বামী খলিল সর্দার মারা যাওয়ার পর স্বামীর আগের ঘরের বড় ছেলেরা তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তখন উনি কোথায় থাকবেন, কী করবেন? সেখান থেকেই আমাদের মনে হলো, মহিলা পরিষদের যদি একটা শেল্টার হোম থাকত, তাহলে এই ধরনের নারীরা থাকতে পারত।
খালাম্মা, মানে সুফিয়া কামাল, তিনিও নানা কারণে হয়তো এ কথা ভাবছিলেন। আমরা জোর দিলাম। রোকেয়া সদন করলাম। রোকেয়া সদন ১৯৮৩ সাল থেকে কাজ শুরু করেছে। আমরা ঠিক করেছিলাম, নির্যাতিত নারীদের যেসব মামলা চলছে, যাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয়, তাদের সেখানে রাখা হবে।
এভাবে কয়েকজন মেয়ে এসেছিল। তাদের পড়ালেখা করানোর চেষ্টা করেছি। তারা পড়ালেখা করেছে। ওদের নানা ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখতাম। এত যে আমরা তাদের সাপোর্ট দিচ্ছি, তারপরও তাদের মধ্যে পরিবারের সঙ্গে থাকার একটা আকুলতা ছিল। পরিবার যেমনই হোক, কিছু দিতে পারুক বা না পারুক, পারিবারিক যে মমতা, তার একটা অভাব ওদের মধ্যে সবসময় থেকে গেছে।
যারা এখান থেকে বের হয়ে গেছে, তাদের আমরা দেখাশোনা করেছি। তারা এখন চাকরি করে। সবাই চাকরি করে। একজন আছে, সে ডাক্তার হয়েছে। সে সুইডেনে চাকরি করে।
আরেকজন মেয়ে আছে, তাকে আমরা একবার একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে সে হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কামরাঙ্গীরচর থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। আমাদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেট লাইলি তাকে সেখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন। পরে মেয়েটি ম্যাট্রিক পাস করে। অনেক বুঝিয়ে তাকে মানিকগঞ্জে ডাক্তার রওশনের নার্সিং সেন্টারে পাঠানো হয়। সে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি করেছে। এখন সে একজন দক্ষ মিডওয়াইফ হয়েছে এবং একটি প্রজেক্টে চাকরি করেছে। প্রজেক্ট শেষ হয়ে যাওয়ার পর অন্য জায়গায় চাকরি পেয়েছে।
এ ছাড়া আরও দুজন আছে। একজন নারায়ণগঞ্জে স্কুলে শিক্ষকতা করে এবং একজন আমাদের অফিসে কাজ করে।
এই যে রোকেয়া সদনের মেয়েদের সাফল্য, এটা আমার কাছে খুবই ভালো লাগে।
একটা মজার অভিজ্ঞতা বলি।
নয়া পল্টনের কমিটির একজন খালাম্মা ছিলেন, সকিনা খালাম্মা। আমি মিটিংয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু মহিলা পরিষদ করে অনেক শক্ত হয়েছি। এই যে নয়া পল্টন থেকে গেন্ডেরিয়া, আমি এখন নিজে রিকশা ভাড়া করে যাইতে পারি।’
এখান থেকেই যাত্রা শুরু।
আর এখন যখন সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা মেয়ে বলতে পারে, ‘সারারাত আমরা বাইরে থাকব’, দুই সময়ের পার্থক্যটা দেখুন।
আমরা যখন শুরু করেছি, ১৯৭০ সালে, তখন একটা মহিলা নিজে রিকশা ভাড়া করে যেতে পারাটাকেই স্বাধীনতা মনে করত। আর এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের মেয়েরা আন্দোলন করছে সকাল-সন্ধ্যার দরজা খোলা রাখার জন্য।
আন্দোলনের দাবি বদলে গেছে। কিন্তু ওই যে নারী, তুমি যে নারী হিসেবে সমাজে চিহ্নিত, তোমার যে অধিকারটা একটা গণ্ডির মধ্যে আছে এবং সেই গণ্ডির মধ্যে থেকে তোমাকে কিছু কল্যাণ, কিছু সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে, এই জায়গায় নারীদের বসায় রাখা হয়েছে। এটা পাল্টাতে হবে।
জীবনজয়ী: তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মহিলা পরিষদ কীভাবে কাজ করছে? তারা কীভাবে যুক্ত আছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আরও যুক্ত হতে পারে?
ফওজিয়া মোসলেম: আমার মনে হয়, শহরে এই সুযোগটা বেশি। গ্রামে যেহেতু সুযোগ কম, সেই জন্য স্ট্রাগলটাও বেশি থাকে।
জেলা পর্যায়ে গিয়ে আমরা দেখি, মেয়েরা অনেক বেশি এগিয়ে আসে। তারা মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত আছে, যুক্ত হয়। তারপর তাদের চাকরি, ব্যক্তিগত জীবন, বিয়ে-শাদির কারণে হয়তো টিকে থাকতে পারে না, হারিয়ে যায় বা অন্য জায়গায় চলে যায়।
আমাদের নতুন সম্মেলনগুলো হচ্ছে। সম্মেলনগুলোতে জেলা কমিটিতে তরুণরা অনেক বেশি আছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে গত দুই-তিন বছর ধরে একটা প্রোগ্রাম নিয়েছি। ২০২৩ সালে ৮ মার্চ উপলক্ষে ‘তারুণ্যের স্বপ্ন’ এবং ‘তারুণ্যের মেলা’ নামে একটা প্রোগ্রাম করেছিল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সেখানে প্রায় ১৫০ মেয়ে এসেছিল। এরপর তাদের সঙ্গে ফলোআপ প্রোগ্রাম করেছি। ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, আলোচনা, নানা ধরনের কার্যক্রম তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে করেছি। একপর্যায়ে তাদের বললাম, তোমরা আমাদের উপপরিষদে যুক্ত হও। তারা যুক্ত হলো।
গত সপ্তাহে আমরা তাদের নিয়ে আলাপে বসি। দেড়শ জনের মধ্যে মাত্র ১২ জন এসেছিল। তারপরও আমার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, এই ১২ জনের মধ্যে কয়েকজন মহিলা পরিষদে টিকে যাবে। সংখ্যাটা কম হলেও, মহিলা পরিষদের সঙ্গে তরুণদের যে একটা যোগাযোগের ধারাবাহিকতা, সেটা তৈরি হলো।
আমাদের যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের বুঝতে হবে যে আমাদের সময়ের পদ্ধতি, আমাদের সময়ের সমস্যা, আমরা সমস্যাগুলোকে যেভাবে দেখতাম, এখন সেটা একই রকম নয়।
আমরা আসলে অ্যাডজাস্ট করে রাইট প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন তো অ্যাডজাস্ট করার প্রশ্নটা নেই, আমার রাইটটাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু সেটা যে আমি পারব না, আমাকে যে অনেক কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে করতে হবে, এই জায়গাটাতে তরুণদের সঙ্গে আমাদের একটু গ্যাপ আছে। সেই জায়গাটাতে তাদের জায়গা থেকেই ভাবতে হবে। আমাদের নিজেদেরও তৈরি হওয়ার ব্যাপার আছে।
এখন যারা আন্দোলনে আসে, তারা হয়তো মনে করে, কেন এখনই দাবি আদায় হয়ে যাবে না? হচ্ছে না কেন? এরকম মনে হয় তাদের কাছে।
সময়ের দিক থেকেও যখন ভাবি, আমরা হাসি মাঝে মাঝে। পাগল-টাগল ছিলাম, না হলে ১৯৭০ সাল থেকে এই ২০২৬ পর্যন্ত বেলা ৩টা বাজলে একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চলে আসলাম মহিলা পরিষদে।
এখন কেউ আসতে পারবে? এ সময় তো তাদের চাকরি, তাদের কাজ।
আমরাই তো, ধরেন আমি নিজে চাকরি করেছি। আমি তো খুঁজে খুঁজে বের করেছি, এমন চাকরি করব, যেখানে রেসপন্সিবিলিটি কম, তাহলে আমি সংগঠনের সময় দিতে পারব।
জীবনজয়ী: বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় নারী অধিকার নিয়ে এত বছরের লড়াই-সংগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?
ফওজিয়া মোসলেম: আমরা দেখছি, এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে একটা অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা। রাজনৈতিক শূন্যতার ক্ষেত্রে বলা যায়, পলিটিক্যাল বিগ পাওয়াররা দক্ষিণ এশিয়াকে কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে, তাদের যে প্রতিযোগিতা, এইটার মধ্য দিয়েও নারী আন্দোলন হচ্ছে।
বিশেষ করে অর্থনীতির ক্ষেত্রে নারীর যে অংশগ্রহণ, এটাকে আমাদের অর্থনৈতিক মডেলের মধ্যেই করতে হচ্ছে। সেখানে নারীকে ব্যবহার করার জায়গাটাই মূলত বেশি। একটা অফিস-আদালতেই বলি, গণমাধ্যমেই বলি, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে যেটা হয়, নারীকে ব্যবহার করা হচ্ছে তার প্রতিভাটাকে বিকাশের জন্য বা তার অধিকার দেওয়ার জন্য, এমন না।
কাজেই আমাদের এখন আন্দোলনটা, মানে নারী আন্দোলনটা, সমাজের স্থিতিশীলতা, সমাজের একটা সুস্থ প্রগতিশীল রাজনীতি, সমাজকে অগ্রসর করে নেওয়ার রাজনীতির সঙ্গে মিলাতে হবে।
যেমন আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় আন্দোলন করেছি, ঠিক এখন একইভাবে সমাজের অগ্রসর হওয়ার রাজনীতির সঙ্গে নারী রাজনীতিকে পাশাপাশি নিয়ে যেতে হবে।
জীবনজয়ী: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য।
ফওজিয়া মোসলেম: আপনাকেও ধন্যবাদ।