অনিরুদ্ধ মিত্র কলকাতার মানুষ। কর্মসূত্রে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত লিবারেল আর্টস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বার্ড কলেজের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান। অর্থনীতি শাস্ত্রের বাইরে সাহিত্য ও সংগীতে তাঁর অপরিসীম আগ্রহ। চলতি মাসে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন সপ্তাহখানেকের জন্য। প্রথমবারের মতো এখানে এলেও বিদ্যায়তনিক ও বন্ধুত্বসূত্রে এ দেশের অনেকের সঙ্গেই অনিরুদ্ধ মিত্রের যোগাযোগ আছে। প্রথমবার বাংলাদেশে এসে কেমন লাগল, তা নিয়ে ‘জীবনজয়ী’র পক্ষ থেকে অনিরুদ্ধ মিত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন মাসুমা হক প্রিয়াংকা।
জীবনজয়ী: জেনেছি আপনি বাংলাদেশে প্রথম এলেন। বেড়াতে নাকি কাজে?
অনিরুদ্ধ মিত্র: সেন্টার ফর বাজেট অ্যান্ড পলিসির আমন্ত্রণে একটি বক্তৃতা দিতে আমার বাংলাদেশে আসা। এটা আমার আসার অফিশিয়াল কারণ। আর মনের কথা যদি বলি, আড্ডা আর ঘুরে বেড়ানোটাই হচ্ছে মূল কাজ। আমার সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু অধ্যাপক ফাহমিদুল হকের উদ্যোগেই আমার প্রথম বাংলাদেশ আসাটা সম্ভব হয়েছে।
জীবনজয়ী: কেমন হলো সেমিনার?
অনিরুদ্ধ মিত্র: অসাধারণ অভিজ্ঞতা! এখানে যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের বিশদ জ্ঞান ও আলোচনার মান আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।
জীবনজয়ী: প্রথমবার বাংলাদেশে এলেন, কেমন লাগল?
অনিরুদ্ধ মিত্র: এটা আমার প্রথম আসা, তথ্য হিসেবে এটা ঠিক। তবে বাংলাদেশ আমার কাছে কখনো অচেনা ছিল না। আমার বাবার জন্ম খুলনার খালিশপুরে। তিনি সেখানকার বিএল কলেজে পড়াশোনাও করেছেন। এটা সাতচল্লিশের আগের কথা। আপনি হয়তো শুনে অবাক হবেন, কিন্তু তাঁর কাছে এটি ছিল পৃথিবীর সেরা কলেজ!
ছোটবেলায় ঠাকুরমার কাছে সারাক্ষণ এই দেশের কথা শুনতে শুনতে আমার বড় হওয়া। বুঝতেই পারছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে। আর একটু বড় হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের লেখালেখি ও গানের জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। সেটা পরবর্তীতে ক্রমশ বেড়েছে। ঢাকার লেখালেখি আমি নিয়মিত পড়ি। ঢাকার বাংলাবাজারে আমার একজন লোক ঠিক করা আছেন, যিনি আমার চাহিদামাফিক বই সংগ্রহ করে নিউইয়র্কে পাঠিয়ে দেন।
মাত্র এক সপ্তাহ থাকা হলো এবার। বুঝতেই পারছেন, এই সামান্য সময়ে যা যা চেয়েছিলাম তা পুরোপুরি করে উঠতে পারিনি। তবে আড্ডা ও ঘোরাঘুরি যা করেছি, তা ফেলে দেবার মতো নয়। বাংলাদেশে আমার সময়টা যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক ভালো কেটেছে।
সবার আন্তরিকতা আর শহরের প্রাণচাঞ্চল্য মিলিয়ে আমার অভিজ্ঞতাটা এক কথায় অসাধারণ।
জীবনজয়ী: ঢাকায় কোথায় কোথায় ঘুরেছেন?
অনিরুদ্ধ মিত্র: ঢাকা পৌঁছানোর পরদিন প্রায় বিকেল পর্যন্ত সেমিনারে ছিলাম। বাকি সময়টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করেছি।
পরদিন সকালেই ফাহমিদুল হক আমাকে নিয়ে যায় পুরান ঢাকার দিকে। লালবাগ কেল্লায় খুব ভালো সময় কাটে। সেখান থেকে গেলাম বিউটি বোর্ডিংয়ে। এই জায়গাটার কথা অনেক লেখায় পড়েছি। দুপুরের খাবারটা বিউটি বোর্ডিংয়েই সারি আমরা। সদরঘাট, বুড়িগঙ্গার তীর আর আহসান মঞ্জিলেও যাওয়া হয়েছে সেদিন। ‘বুড়িগঙ্গা রিভারভিউ রেস্টুরেন্ট’–এ বসে কফি খাওয়ার সময়টাও ছিল দুর্দান্ত।
আমাদের পরিকল্পনায় শাঁখারীবাজার ও বলধা গার্ডেনও ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টির কারণে আর যাওয়া হয়নি, পরের বার নিশ্চিত যাব।
তার পরের দিন আমি একা বের হই। আবার যাই পুরান ঢাকায়। বাংলাবাজারে আমার কিছু বইপত্র কেনার ছিল। পুরান ঢাকার অলিগলি, পুরোনো স্থাপত্য আর মানুষের ব্যস্ত জীবন আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে।
জীবনজয়ী: ঢাকার বাইরে কোথাও যাওয়া হয়েছিল?
অনিরুদ্ধ মিত্র: পানাম নগর গিয়েছি। পানাম যাওয়ার ইচ্ছাটা আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। খুব ভালো লাগল সেখানে, প্রতিটা বাড়ির স্থাপত্যেই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর এবং বড় সর্দার বাড়ির স্থাপত্যও দারুণ লেগেছে। মনে হয়েছে, ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
জাদুঘর দেখতে দেখতে বেশ বেলা হয়ে যায়। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আমরা দুপুরের খাবারটা খাব নারায়ণগঞ্জের বোস কেবিনে। এই রেস্টুরেন্টের বয়স একশো পেরিয়েছে শুনে আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল।
গাড়িতে উঠে বুঝলাম সবার বেশ খিদে পেয়েছে (সেই কখন পানামের সামনে এক মিষ্টির দোকানে দুখানা পরোটা আর দুখানা মিষ্টি খেয়েছিলাম!)। অতএব গাড়ি ছুটল নারায়ণগঞ্জের দিকে। গাড়িতে বসে দুই ভ্রমণসঙ্গী, শান্তনু মজুমদার ও ফাহমিদুল হক, এদের সঙ্গে বাংলা গানে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান নিয়ে খুব ভালো একটা আলোচনা হলো।
বোস কেবিনে পৌঁছে দেখি সব সুনসান। ওনাদের খাবার প্রায় শেষ। পরে দুজনের খাবার তিনজনে ভাগ করে খেলাম। কোনো বাড়াবাড়ি ছাড়া সাধারণ পোলাও আর খাসির মাংস, তবে ভীষণ সুস্বাদু। বোস কেবিন এক সময় নারায়ণগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের লোকজনের প্রধান আড্ডার জায়গা ছিল। এখনো হয়তো আছে। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির অগ্রগণ্যদের অনেকেই এখানে এসেছেন। এমনকি এক সময় এই রেস্টুরেন্টটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের আড্ডার কেন্দ্র। এমন একটি জায়গায় বসে খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই স্মরণীয়। দেখতে নিতান্ত সাদামাটা হলেও বোস কেবিনের ইতিহাস বর্ণাঢ্য!
বোস কেবিনে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাইদুর। সে নারায়ণগঞ্জের ছেলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। খাওয়া শেষে সাইদুর আমাদের নিয়ে যায় লঞ্চঘাটের দিকে। ঘাটে বাঁধা এক লঞ্চে উঠে শীতলক্ষ্যা নদীর হাওয়া-বাতাস গায়ে লাগালাম কিছুক্ষণ। নদী তখন বেশ ব্যস্ত, শহর থেকে ইঞ্জিন নৌকা উল্টো পাড়ের শহরতলির দিকে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বালুটানা বার্জ, স্পিডবোট ও ছোট ছোট লঞ্চ দেখলাম অনেক।
লঞ্চঘাট থেকে বেরিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পথে সাইদুর নেমে গেল। ওর বাসায় যেতে অনুরোধ করেছিল, পরের বার যাব।
জীবনজয়ী: বাংলাদেশের লেখালেখি ও গানের জগতের সঙ্গে আপনার পরিচয় নিয়ে কিছু বলুন।
অনিরুদ্ধ মিত্র: দেশভাগের পর এখানে যেভাবে স্বতন্ত্র সাহিত্য গড়ে উঠেছে, তা আমার দারুণ লাগে। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় আমি বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি দেখি। সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদসহ অনেকের লেখাই আমার পড়া হয়।
সংগীতের কথা বলতে গেলে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার রবীন্দ্রসংগীত আমার খুব প্রিয়। ওনার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথকে আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করি। আবার মাইলস বা আর্কের মতো ব্যান্ডগুলোর গানও ভীষণ পছন্দ করি।
সমসাময়িক চলচ্চিত্রে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে, 'রেহানা মরিয়ম নূর'–এ তিনি দুর্দান্ত ছিলেন। জয়া আহসানও খুব ভালো অভিনয় করেন, পশ্চিমবঙ্গে তিনি খুবই পরিচিত।
জীবনজয়ী: বাংলাদেশে নতুন পরিচিতদের সঙ্গে কেমন সময় কাটল?
অনিরুদ্ধ মিত্র: এটাই আমার বাংলাদেশে আসার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সবাই খুবই আন্তরিক। সবার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে ও ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। এরা যেভাবে সময় দিয়েছেন, ঘুরিয়েছেন, খাইয়েছেন আর গল্প করেছেন, তা সহজে ভোলার নয়।
জীবনজয়ী: পরের বার বাংলাদেশে এলে কী করার ইচ্ছে আছে?
অনিরুদ্ধ মিত্র: অবশ্যই খুলনায় যেতে চাই। এবার হয়ে উঠল না, পরের বার নিশ্চিত যাব। ওই যে বলছিলাম, ওখানেই তো আমার বাবার দিকের পারিবারিক শেকড়। বাবার জন্মস্থান, ঠাকুরদার ভিটে, সবকিছুর সঙ্গে এক ধরনের আবেগ জড়িয়ে আছে।
জীবনজয়ী: এখানকার খাবারদাবার কেমন লাগল? বিশেষ ভালো লেগেছে এমন কিছু আছে?
অনিরুদ্ধ মিত্র: খাবারের কথা আর বলবেন না! কী খাইনি! কাচ্চি বিরিয়ানি, চাপ, পোলাও, তেহারি, সবই খেয়েছি কবজি ডুবিয়ে। শিখু দিদির বাসায় আমার কয়েকবার খাওয়া হয়েছে। তার বাড়ির রান্না তো একবারে অমৃত! কচুর লতির একটি পদ খাইয়েছিলেন, সেটাকে আমি সাধারণ খাবার বলব না, ওটা যেন দেবভোগ্য খাবার। আর সে বাড়িতে খাওয়া তেহারি, সাদা পোলাও আর রোস্টের স্বাদ তো এখনো ভুলতে পারছি না।
তা ছাড়া বিউটি বোর্ডিংয়ের লইট্টা শুঁটকি ভর্তার স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। আর পুরান ঢাকায় আমার দুই বন্ধু যে কাচ্চি খাওয়াল, সেই স্বাদটাও ভোলা যাচ্ছে না।
জীবনজয়ী: দুই বাংলার মানুষের সম্পর্ক নিয়ে কিছু মনে হয় আপনার?
অনিরুদ্ধ মিত্র: আমি খুবই আশাবাদী। দুই বাংলার মানুষের সম্পর্ক কখনোই বিচ্ছিন্ন হবে না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে, সীমান্ত থাকতে পারে, কিন্তু ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং আবেগের যে বন্ধন, তা ভাঙার নয়। আমি বিশ্বাস করি সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান আমাদের আরও কাছে নিয়ে আসবে। এই আত্মিক বন্ধনই দুই বাংলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
জীবনজয়ী: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
অনিরুদ্ধ মিত্র: ধন্যবাদ। ‘জীবনজয়ী’র জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল।