সাক্ষাৎকার

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ


  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা  |
  • প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০৩
প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ
ছবি: জীবনজয়ী

মৌলভীবাজারের মনিপুরী তরুণ চয়ন কুমার সিংহ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কয়েক বছর আগে গ্রামে ফিরে যান। পরিবার তা মেনে নেয়নি। এলাকার লোকজন, বন্ধু-বান্ধবরাও সাড়া দেয়নি এই সিদ্ধান্তে। কিছু সময়ের পরিক্রমায় এই চয়ন কুমার এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। জীবনজয়ী থেকে মাসুমা হক প্রিয়াংকা  কথা বলেছেন এই অনুপ্রেরণাদায়ী দৃঢ়চেতা তরুণের সঙ্গে।

জীবনজয়ী: আদাব দাদা। আশা করি ভালো আছেন।

চয়ন কুমার সিংহ: আদাব। ভালো আছি। আশা করি আপনিও ভালো আছেন।

জীবনজয়ী: আমিও ভালো আছি। কথোপকথনের শুরুতেই জানতে চাই আপনার শিক্ষাজীবনের গল্প। উচ্চশিক্ষার পথচলাটা কোথা থেকে শুরু হয়েছিল?

চয়ন কুমার সিংহ: আমি গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছি। এরপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপই আমাকে নতুনভাবে ভাবতে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করেছে।

জীবনজয়ী: আপনার স্নাতক ব্যাচটি কোন শিক্ষাবর্ষের ছিল?

চয়ন কুমার সিংহ: ২০০৯–১০ শিক্ষাবর্ষ।

জীবনজয়ী: স্নাতকোত্তর শেষ করার পর কর্মজীবনের সূচনা কীভাবে হয়েছিল?

চয়ন কুমার সিংহ: পড়াশোনা শেষ করার পর কক্সবাজারের একটি কাঁকড়া প্রকল্পে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করি। সেখান থেকেই আমার পেশাজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা।

জীবনজয়ী: নিশ্চয়ই সেটি ছিল একটি সম্ভাবনাময় ও সম্মানজনক চাকরি। এমন একটি স্থিতিশীল ক্যারিয়ার ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস ও প্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?

চয়ন কুমার সিংহ: সত্যি বলতে, শুরুতেই আমার বেতন ছিল ৪৫ হাজার টাকা, যা সে সময়ের জন্য বেশ সন্তোষজনক ছিল। তবুও আমার মনে সবসময় নিজের কিছু করার আকাঙ্ক্ষা ছিল।

সত্যজিৎ রায়ের জন অরণ্য, বেন্ট হামেরের দ্য মিডল ম্যান ছবি দুটি আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণাই আমাকে বুঝতে শেখায় চাকরির নিরাপত্তার বাইরে বেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্যেও অন্যরকম তৃপ্তি রয়েছে।

জীবনজয়ী: উচ্চশিক্ষা শেষ করে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত আপনার পরিবার কীভাবে নিয়েছিল? আশেপাশের লোকেরা?

চয়ন কুমার সিংহ: সবাই খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবার রাজি ছিল না। তবে আমি বরাবরই ঘাড়ত্যাড়া। মানুষের মন থেকে আম—যা কিছু হোক না কেন, যুক্তিহীন সেন্টিমেন্টের খুব একটা কেয়ার আমি করি না। আমার অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিল না তখন। বিয়ের জন্য মেয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না আমার জন্য। 

জীবনজয়ী: বর্তমানে কোন কোন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন?

চয়ন কুমার সিংহ: বর্তমানে মনিপুরী শাড়ির ব্যবসা পরিচালনা করছি। পাশাপাশি আমার এক দিদিকে সঙ্গে নিয়ে একটি হোমস্টে ব্যবসাও পরিচালনা করছি। এই দুটি উদ্যোগ নিয়েই আপাতত আমার পথচলা।

জীবনজয়ী: আপনার মনিপুরী শাড়ির ব্যবসার কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ফেসবুক পেজ রয়েছে?

চয়ন কুমার সিংহ: জি। 'চিত্রাঙ্গদা মনিপুরী শাড়ি' নামে আমাদের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। আমরা প্রিমিয়াম মানের মনিপুরী শাড়ি নিয়ে কাজ করি এবং প্রতিটি শাড়িতে নকশা ও গুণগত মানের বৈচিত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করি।

জীবনজয়ী: একটি নিরাপদ ও ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন করে ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। সেই সময় অনিশ্চয়তা কিংবা পরিবারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

চয়ন কুমার সিংহ: শুরুতে পরিবারের কেউ আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, এত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত শাড়ির ব্যবসা করা ঠিক হবে না। আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুদের কাছেও আমি বিষয়টি খুব বেশি প্রকাশ করিনি। কারণ আমি জানতাম, অধিকাংশ মানুষ নিরুৎসাহিত করবেন। তাই নিজের স্বপ্নটাকে আঁকড়ে ধরে কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে গেছি। হয়তো সেই একাগ্রতা ও পরিশ্রম আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

জীবনজয়ী: আজ যখন আপনার সাফল্য সবার সামনে দৃশ্যমান, তখন সেই মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে কী পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন?

চয়ন কুমার সিংহ: ব্যবসা শুরু করার পর যখন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার কাছ থেকে শাড়ি কিনতে আসতেন, তখন পরিবারের মানুষ ধীরে ধীরে আমার কাজের মূল্য বুঝতে শুরু করেন। পরে ডিসি অফিস ও মনিপুরী ললিতকলা একাডেমি থেকে যৌথভাবে সেরা উদ্যোক্তার সম্মাননা পাওয়ার পর তাঁদের সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, আমাদের মনিপুরী সমাজে শিক্ষিত তরুণদের ব্যবসাকে ছোট করে দেখার যে প্রবণতা ছিল, সেটিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আচ্ছা, আরেকটা কথা। আমি বিয়ে করেছি। বিয়ে করে সুখে আছি। 

জীবনজয়ী: বর্তমানে আপনার এই উদ্যোগের সঙ্গে কতজন তাঁতী যুক্ত আছেন? আর্থিকভাবে এই উদ্যোগ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?

চয়ন কুমার সিংহ: বর্তমানে ২০০-এরও বেশি তাঁতী আমাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার সঙ্গেও আমাদের এই উদ্যোগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সব ধরনের ব্যয় বাদ দিয়ে মাস শেষে প্রায় এক লাখ টাকার মতো লাভ থাকে। তবে অর্থের চেয়েও বড় আনন্দ পাই তখন, যখন দেখি আমার ডিজাইন অন্য উদ্যোক্তারাও অনুসরণ করছেন। তখন মনে হয়, আমি নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পেরেছি।

জীবনজয়ী: ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?

চয়ন কুমার সিংহ: অবশ্যই ব্যবসার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে চাই। খুব শিগগিরই গামছা নিয়ে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এমন একটি বড় শোরুম গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শুধু মনিপুরী শাড়ি নয়, মনিপুরী ঐতিহ্যের সব ধরনের পণ্য এক ছাদের নিচে পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে মনিপুরী খাদ্যসংস্কৃতিকে পরিচিত করে তুলতেও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।

জীবনজয়ী: এই দীর্ঘ পথচলায় বিশেষভাবে কারও অবদান স্মরণ করতে চান?

চয়ন কুমার সিংহ: অবশ্যই। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা জিনিয়া রহমান ম্যাম আমাকে পণ্যের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ফারজানা সিদ্দিকা ম্যাম আমার ব্যবসার প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

জীবনজয়ী: নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার কী বার্তা থাকবে?

চয়ন কুমার সিংহ: আমি কখনোই নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করিনি। বরং প্রতিদিন চেষ্টা করেছি আগের দিনের চেয়ে নিজেকে আরও উন্নত করতে। আমরা অনেক সময় অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ হয়ে পড়ি। কিন্তু প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে। সেই শক্তিকে চিনে কাজে লাগাতে পারলে সফল হওয়া সম্ভব। যেমন কেউ যদি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারেন, সেটিও একটি দক্ষতা। সেই দক্ষতাকেও কাজে লাগিয়ে আজকের ডিজিটাল যুগে নিজের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা যায়।

জীবনজয়ী: আপনার মূল্যবান সময় এবং অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। 

চয়ন কুমার সিংহ: আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল। আপনার জন্যও রইল অনেক অনেক শুভকামনা।



ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

  • রিতু চক্রবর্ত্তী |
  •  ২৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.২

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.১

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা|
  •  ১৭-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ১০-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ০১-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।