সাক্ষাৎকার: ফরিদ আহমেদ, স্বত্বাধিকারী, সময় প্রকাশন

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে


  • শরীফ নূরজাহান   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ০০:৪৫
পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে
ছবি: জীবনজয়ী

ফরিদ আহমেদ। বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনার অন্যতম প্রতিষ্ঠান সময় প্রকাশনের কর্ণধার। বাংলাবাজারে সময় প্রকাশন কার্যালয়ে বসে জীবনজয়ীর জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরীফ নূরজাহান। আজ পড়ুন সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব।

আপনি অনেকগুলো বছর ধরে প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত। একজন প্রকাশক হিসেবে আপনার আত্মতৃপ্তির জায়গাটা আসলে কোথায়?

ফরিদ আহমেদ: আমার প্রকাশনার শুরুটা এখন থেকে সাঁইত্রিশ বছর আগে। ১৯৮৯ সালে সময় প্রকাশন প্রথম পেশাদারিভাবে বই প্রকাশ শুরু করে। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রথম অংশগ্রহণ করি। যখন শুরু করেছিলাম, তখনকার পরিবেশটা সৃজনশীল বই প্রকাশের জন্য উপযোগী ছিল না। তখন বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনার জন্য আলাদা প্রকাশকও ছিল না তেমন একটা। যারা টেক্সটবই করতেন এবং বিভিন্ন ধরনের গাইডবই করতেন, তারাই কেউ কেউ অল্পবিস্তর সৃজনশীল প্রকাশনা করতেন।

সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা ছিল তা হচ্ছে, অনেকটা বংশানুক্রমিকভাবে বাংলাবাজারের প্রকাশনীর ব্যবসাটা পরিচালিত হয়ে আসছিল। আগে থেকে কেউ প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা ১৯৪৭ সালের আগে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রকাশনা করতেন। তাঁরা হয়তো ৪৭-এ দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় চলে এসেছেন। তাঁরা এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন অথবা তাঁদের ছেলেরা চালিয়ে গেছেন। কিংবা তাঁদের আত্মীয় নতুন প্রকাশনীর ব্যবসা শুরু করেছেন। এ রকম করে একটা ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা চলে আসছিল।

যখন কাজ শুরু করেছি তখন থেকে, আমার দেখামতে, প্রকাশনা পরিবারের বাইরে হয়েও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত প্রথম ব্যক্তি আমি। আমার জন্য প্রকাশনা ব্যবসা প্রতিকূল ছিল তিন দিক থেকে। প্রথমত, বাংলাবাজারে যাঁরা প্রকাশক বা ব্যবসায়ী ছিলেন, তারা আমাকে খুব ভালো চোখে দেখতেন না। কারণ আমি তাঁদের পরিবার বা গোষ্ঠীর কেউ নই। দ্বিতীয়ত, বাংলাবাজারে মোটামুটি দুটি জেলার লোকজনের প্রাধান্য ছিল। অন্যরা খুব একটা ছিলেন না। সে জায়গা থেকেও আমি একটু বিচ্ছিন্ন ছিলাম। তৃতীয়ত, আমি আসলে খুব কম বয়সে এসেছিলাম। লেখাপড়া পুরোপুরি শেষ না করেই চলে আসার ফলে আমার চিন্তাধারা ছিল গতানুগতিক ভাবনাচিন্তা থেকে ভিন্ন ধরনের। হুমায়ূন আহমেদ তখন মাত্র জনপ্রিয় হতে শুরু করেছেন। আমার চিন্তাধারা ওনার খুব পছন্দ হতো। উনি আমাকে বেছে নিলেন; যেটা অন্য প্রকাশকেরা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। এসব প্রতিকূলতা ছিল।

বলতেই হবে যে, এসব প্রতিকূলতা আমাকে সাহায্য করেছে। আমার ব্রত ছিল এই গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসা। এ জন্যই আমি প্রকাশনার ব্যবসাটি খুব মনোযোগ দিয়ে করতে পেরেছি। কারণ আমি মনে করতাম, আমি যে নতুন পথের সৃষ্টি করব, সে পথ অন্য অনেকে হয়তো পরবর্তীকালে অনুসরণ করবেন। আমি আসার পরও প্রায় এক দশক অবধি লেখাপড়া শেষ করে নতুন তরুণ প্রকাশক খুব একটা ছিলেন না। পরবর্তীকালে এটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোন ধরনের বা কোন বিষয়ের বইগুলোর অভাব রয়েছে আমি শুরুর বছরগুলোতে খুব মনযোগ দিয়ে তা খুঁজে বের করতাম। আমি একজন পাঠকও ছিলাম। সুতরাং অভাবটা আমি বুঝতে পারতাম।  সেই ধরনের বইগুলো প্রকাশ করতাম। এভাবে আমি সময় প্রকাশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।

বইমেলা নিয়ে আপনার কী পরিকল্পনা থাকে? সেগুলো নিয়ে যদি কিছু বলতেন—

ফরিদ আহমেদ: বইমেলা আমার জন্য খুবই পরিচিত একটা বিষয়। প্রতি বইমেলায় আমরা নতুন উদ্দীপনায় নিজেদের সাজাই। আমাদের কিছু কিছু পর্ব আছে, উৎসব আছে—যেমন ঈদ বলেন বা নববর্ষ, এ ধরনের উৎসব প্রতিবছরই আসে। এগুলো কারও কাছে নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবছর প্রস্তুতিটা নতুন। আমাদের বইমেলার প্রস্তুতি সব সময় আমাদের কাছে এ রকম। প্রত্যেক প্রকাশকের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করে।

আমাদের বইমেলাটা হচ্ছে সম্পূর্ণ মাঠভিত্তিক। একটা জনসমাগমের মধ্যে একটা মাস থাকতে হয়। সেখানে শুধু আমরাই থাকি না, আমাদের বই থাকে, আমাদের প্রচুর স্টাফ থাকে। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক আসে। তাঁদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। ব্যাপারটি কিন্তু এত সহজ নয়। বিভিন্ন ধরনের মন-মানসিকতার লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে হচ্ছে, ভাববিনিময় করতে হচ্ছে। এটিকে সহজভাবে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

আপনার এই যে দীর্ঘ যাত্রা, এমন কোনো আনন্দের ঘটনা আছে যেটা শেয়ার করা যায়?

ফরিদ আহমেদ: মাছ যেমন পানিতে সাঁতার কাটা আর অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির আনন্দ ও বেদনাকে আলাদা করে অনুভব করতে পারে না, প্রকাশক হিসেবে এত দীর্ঘ সময় প্রকাশনার সঙ্গে থাকার ফলে আমারও এসব বিষয় আলাদা করা কঠিন। কেননা, আমাদের প্রতিদিনই একটা না একটা নতুন আনন্দদায়ক বা বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে। অনেক আনন্দ আছে, অনেক বেদনাও আছে। এগুলো আলাদা করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। না করাটাই ভালো বলে আমি মনে করি। তবে এটা ঠিক যে প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে। সেই আনন্দ উপলব্ধি করি। প্রতিটি বই যখন বের করি, তখন নতুন করে আনন্দ উপলব্ধি করি। বছরে সময় প্রকাশন থেকে ষাট থেকে সত্তরটা বই বের হয়। এক বছরে বায়ান্ন সপ্তাহ। তাই সপ্তাহে গড়ে একটা নতুন আনন্দ আমার আছে।

ফেব্রুয়ারি বইমেলাকে খুব উপভোগ করি। এত এত লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের সঙ্গে কথা বলা; বইমেলায় প্রতিদিন আমাদের প্যাভিলিয়নে লেখকেরা আসেন। নিয়মিত লেখকেরা আসেন, দেশ-বিদেশ থেকে লেখক, অতিথি, বন্ধুরা আসেন। যেসব লেখকের বই আমি বের করতে পারি না, তারাও এসে তাদের কথাগুলো শেয়ার করেন; এগুলো আনন্দের।

কিন্তু কী জানেন, আমাদের লোকজনের সমস্যা হচ্ছে, অনেকে কোন একটা বিষয়ের পুরোটা না জেনে বা জ্ঞান না রেখে কড়া সমালোচনা করেন। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও এটা প্রকট। আমরা যখন সমালোচনা করি, তখন খুব সাধারণীকৃত সমালোচনা করি। একটা পুরো গোষ্ঠীকে আমরা সমালোচনার মধ্যে ফেলে দিই। প্রকাশনা সেক্টর যে একটা দেশের জন্য কতই না গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে সৃজনশীল প্রকাশনা। পাঠ্যবইয়ের ব্যাপারটা আলাদা। কারণ, সরকার একটা নির্দিষ্ট পাঠক্রম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সেই সিলেবাসে বই ছাপা হচ্ছে এবং ছাত্রছাত্রীরা পড়ছে। কিন্তু সৃজনশীল প্রকাশনা মানুষের মনন তৈরি করে। তার মেধাকে আরও একটু বিকশিত করার জন্য, মনের ভেতরে একটি ভালো মন তৈরি করার জন্য যেসব উপকরণের দরকার হয়, সেসব উপকরণ কিন্তু সৃজনশীল প্রকাশনা থেকে আসে। এটা কিন্তু লেখক ও প্রকাশকের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়। একটি দেশে যদি সৃজনশীল প্রকাশনা না থাকে, সে দেশ কিন্তু মেধার দিক থেকে পঙ্গু হয়ে যায়। তো এ রকম একটি প্রকাশনাকে নিয়ে যখন সাধারণভাবে সবাইকে এককাতারে ফেলে সমালোচনা করা হয়, তখন তো খারাপ লাগেই।

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই


ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

  • রিতু চক্রবর্ত্তী |
  •  ২৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.২

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.১

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা|
  •  ১৭-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ১০-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ০১-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।