সাক্ষাৎকার: রুকুনউদ্দৌলাহ। বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাংবাদিক

সাংবাদিকতার কারণে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অম্ল-মধুর: বীর মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ


  • মিলন রহমান  যশোর |
  • প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ০০:০৯
সাংবাদিকতার কারণে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অম্ল-মধুর:  বীর মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ
ছবি: হাজী হাসান

রুকুনউদ্দৌলাহ। বীর মুক্তিযোদ্ধা। পাঁচ দশকের সাংবাদিক জীবন। যশোরে বসে সাংবাদিকতা করে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়েছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সুধী সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমে অবিরাম সক্রিয় ছিলেন। এসব ঘিরে তাঁর অজস্র স্মৃতি রয়েছে। কিছু স্মৃতি আনন্দের, কিছু বেদনার। রুকুনউদ্দৌলাহ প্রয়াত হয়েছেন ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি জীবনজয়ীর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলেছিলেন। জীবনজয়ীর জন্য রুকুনউদ্দৌলাহর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মিলন রহমান।

আপনি সারা জীবন মানুষের পক্ষে। আপনার লড়াই-সংগ্রাম-প্রতিবাদের কথা শুনতে চাই।

রুকুনউদ্দৌলাহ: আমার গোটা জীবন লড়াই-সংগ্রামের। স্কুলজীবনে বাড়ি ছেড়েছি। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছি। এরপর সত্তরের নির্বাচনে কুঁড়েঘর মার্কার পক্ষে অবস্থান নিই। একাত্তরের উত্তাল মার্চে মিছিল-মিটিং-অবরোধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। এরপর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই। পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের একপর্যায়ে নওগাঁ শহর ছেড়ে চাকরাইল গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নিই। সেখানেও পাকিস্তানিদের আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে গেলে পায়ে হেঁটে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের বালুরঘাটে চলে যাই।

সেখানে ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে দুই সপ্তাহ ছিলাম। এখানে বর্ষীয়ান রাজনীতিক গোলাম আরিফ টিপু, টিইউসি নেতা ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম, নওগাঁর প্রবীণ নেতা এম. এ. রকিব প্রমুখ রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন।

অতঃপর একদিন বাড়িতে চিরকুট লিখে গোপনে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাই। চিরকুটে লিখেছিলাম, “শ্রদ্ধেয় দাদু, আমরা সাত ভাই, সাত বোন। আমি মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলাম। মারা গেলে তোমরা গর্ব করতে পারবে, তোমাদেরই পরিবারের একজন মা, মাটি, মানুষের জন্য জীবন দিয়েছে। আর যদি বেঁচে যাই, স্বাধীন ভূমিতে দেখা হবে।”

এরপর শিলিগুড়ির পানিঘাটায় একুশ দিন সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি।

আপনার জীবনযাপন আর দশজনের মতো নয়। আপনি কী বলেন?

রুকুনউদ্দৌলাহ: আমি হলাম জীবনবাদী স্টাইলের মানুষ। শৃঙ্খলহীন, বোহেমিয়ান। ছাত্রজীবন থেকেই। পরবর্তী জীবনে খ্যাতির শিখরে উঠেছেন, এমন অনেক মানুষের সঙ্গেই আমার উড়নচণ্ডী জীবন কেটেছে একসময়। তবে একটা কথা বলি, আমি কখনোই কোনো অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত হইনি। সব সময়ই আমিত্বকে বর্জন করেছি। নিজেকে গুটিয়ে রেখেছি। নেশা বই পড়া। এখনো প্রচুর পড়ার চেষ্টা করি। বাড়িতে এখনো নয় হাজারের বেশি বই রয়েছে।

আপনার পরিবারে তো অনেক সাংবাদিক!

রুকুনউদ্দৌলাহ: ঠিক। বাবা, বড় ভাইসহ পরিবারের অনেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমি ছোটবেলা থেকেই ছড়া-কবিতা লিখতাম। লেখালেখি করতে করতেই সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুলাভাই কবি নাসির উদ্দিন সম্পাদিত সাপ্তাহিক (পরে দৈনিক) ‘গণদাবী’ পত্রিকায় হাতেখড়ি। এরপর অগ্রজ একরাম উদ্দৌলা ‘সংবাদ’ ছেড়ে ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দিলে আমি ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। এই যুক্ততা এখনো অব্যাহত।

দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সঙ্গে আপনার বহু আগে থেকে যুক্ত। এই যুক্ততা নিয়ে কিছু বলুন।

রুকুনউদ্দৌলাহ: ১৯৭৪ সালে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ যোগদান করি। তখন প্রতি বাক্য লেখার জন্য পেতাম ছয় পয়সা, ছবি ১০ টাকা ও ভাতা ৩০ টাকা। প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পারিশ্রমিক পেয়ে যেতাম। কোনো সংবাদ সংগ্রহে গেলে তার জন্য টিএ বিল দেওয়া হতো। এখন আয়কর দিলেও বেতন ঠিক সময়ে পাই না।

শুরুতে খোলা ডাকের প্রতিনিধি হিসেবে যশোর থেকে নিউজ পাঠাতাম। জরুরি হলে টেলিগ্রামে সংবাদ পাঠাতাম। এরপর ফ্যাক্সে সংবাদ পাঠিয়েছি। এখন ই-মেইলে সংবাদ পাঠাই।

‘সংবাদ’-এর সাবেক সম্পাদক আহমদুল কবীরের সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি। সব বলতে গেলে বই হয়ে যাবে। একবার আমাকে ঢাকায় ডেকে নেওয়া হলো দুই সপ্তাহের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণের জন্য। তিন-চার দিন প্রশিক্ষণের পর আহমদুল কবীর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এখানে কেন?” বললাম, বজলু ভাই (বজলুর রহমান) আমাকে প্রশিক্ষণের জন্য ডেকে এনেছেন।

এরপর আহমদুল কবীর আমাকে ও বজলু ভাইকে তার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন। বজলু ভাইকে বললেন, “ওকে প্রশিক্ষণ দিয়ে শহুরে সাংবাদিক বানানোর দরকার নেই। ওকে যশোরে পাঠিয়ে দাও। ও মানুষের সাংবাদিক হোক!”—এটাই আমার জীবনের সেরা পুরস্কার।

একবার ‘সংবাদ’-এ ১৫ টাকা টিএ বিল পাঠালাম ‘হেলিকপ্টার’ ভাড়া বাবদ। সে সময় দক্ষিণাঞ্চলে বাইসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করা হতো, যার চলতি নাম ছিল ‘হেলিকপ্টার’। বিল দেখে আমাকে শোকজ করা হলো। শোকজের জবাব না দিয়ে আমি দক্ষিণের জনপদের হেলিকপ্টারের ছবি দিয়ে ফিচার পাঠালাম। সেটি প্রকাশিত হওয়ার পর অফিসে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। আমার শোকজ উইথড্র করা হলো।

২০০০ সাল থেকে ‘সংবাদ’-এ নিয়মিত ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’ কলাম লিখতাম। কলামটি জনপ্রিয়তা পায়। প্রতি বুধবার ছাপা হতো। সেদিন যশোর শহরে ১৫০ থেকে ২০০ কপি বেশি পত্রিকা বিক্রি হতো। আহমদুল কবীর ছিলেন আমার কলামের একনিষ্ঠ পাঠক। প্রতিবার ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’ পড়েই তিনি ফোন করতেন, পরামর্শ ও নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন।

একবার ছাত্রী উপবৃত্তি নিয়ে একটি কলাম লিখি। সেদিন ঢাকায় ছিলাম। অফিসে স্যারের সঙ্গে দেখা হলে তিনি চেম্বারে ডেকে লেখার প্রশংসা করেন এবং কবি সোহরাব হাসানকে দিয়ে আমাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন।

আরেকবার একটি লেখায় অভিভূত হয়ে আমাকে ঢাকা ক্লাবে নিয়ে যান। আমার পায়ে ছিল স্যান্ডেল। সেখানে স্যান্ডেল পরে যাওয়া যায় না। আহমদুল কবীর এলিফ্যান্ট রোডে নিয়ে গিয়ে জুতো কিনে দেন; এরপর ঢাকা ক্লাবে নিয়ে মোরগ-পোলাও খাওয়ান।

ছোটবেলার প্রসঙ্গে আসি। ছোটবেলায় আপনি বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছিলেন?

রুকুনউদ্দৌলাহ: স্কুলজীবন থেকেই ছিলাম বোহেমিয়ান। দাদুর পকেট থেকে ২০ টাকা নিয়ে একদিন মাঘ মাসের রাতে যশোর থেকে খুলনা–পাবর্তীপুর রুটের ট্রেনে উঠে পড়ি। ঘুম ভাঙলে দেখি সান্তাহার রেলস্টেশন। স্টেশনের পাশে ঘোড়ার গাড়ি দেখে ট্রেন থেকে নেমে পড়ি। ছয় আনা ভাড়া দিয়ে নওগাঁ শহরে চলে যাই। ‘পরিবারে কেউ নেই’ বলে একটি রেস্টুরেন্টে টি-বয়ের কাজ নিই।

কিছুদিন পর এক ভদ্রলোক আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যান এবং স্কুলে ভর্তি করান। এরপর নওগাঁর এক আইনজীবীর বাড়িতে থাকি—ফাইফরমাশ খাটতাম, আবার স্কুলেও যেতাম।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে এক ভদ্রলোক আমাকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, “এই তো পাওয়া গেছে।” তিনি আমার সেজ ভাই। তিনি তখন নওগাঁর অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংকের (বর্তমান রূপালী ব্যাংক) ম্যানেজার ছিলেন। তিনি আমাকে নিয়ে সেই আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন, “এ আমার ছোট ভাই।” এরপর আমাকে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে কয়েক দফা সেই বাড়িও ছেড়েছি, তবে যশোরের বাড়িতে আর ফেরা হয়নি।

প্রেম, বিয়ে, বন্ধুবান্ধব, আড্ডা নিয়ে কিছু বলুন।

রুকুনউদ্দৌলাহ: আমি প্রচণ্ড বন্ধুবৎসল এবং আড্ডাবাজ মানুষ। বন্ধুদের কেউ সিনিয়র, কেউ জুনিয়র। আমি আবেগপ্রবণ, জেদি ও একরোখা। মানুষকে যুক্তি দিয়ে চলতে বললেও আমি নিজে আবেগ দিয়ে চলি। যথাসাধ্য পরোপকারের চেষ্টা করি। তবে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আপসহীন। তাই প্রেম হয়েছে খবরের সঙ্গে, সংবাদের সঙ্গে। জীবনের একপর্যায়ে বিয়ে হয়েছে, একজন সঙ্গী আছে।

সাংবাদিকতার কারণেই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অম্ল-মধুর। পেশাগত কারণে বেশিদিন সদ্ভাব থাকেনি। অনেক রক্তচক্ষু দেখতে হয়েছে, রোষানলে পড়তে হয়েছে। জীবনে কাফনের কাপড় পেয়েছি এগারোবার।

একবার সেনাবাহিনী চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। অপরাধ রিপোর্ট করেছিলাম—ঝিকরগাছার বাঁকড়া অঞ্চলের অনেক মানুষের ভারতে যাওয়া নিয়ে। সারাদিন ক্যান্টনমেন্টে বসিয়ে রেখে সন্ধ্যায় বাড়িতে দিয়ে যায়। দুবার ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেছে ‘সংবাদ’-এর কারণে। মূলত মানসিক নির্যাতন করতেই এসব করা হয়।

আপনার জীবনের চাওয়া-পাওয়া মিলেছে?

রুকুনউদ্দৌলাহ: যে স্বপ্ন নিয়ে কিশোর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম, দেশ এখন সে স্বপ্নের আশপাশেও নেই। রাতে ঘুম হয় না। এখনো স্বপ্ন দেখি—দেশটা হবে সাম্যের, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার। আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।

আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
রুকুনউদ্দৌলাহ: ধন্যবাদ। 

 


ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

  • রিতু চক্রবর্ত্তী |
  •  ২৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.২

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.২

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা|
  •  ১৭-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৫

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ১০-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৫

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ০১-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৫