সাক্ষাৎকার: ফরিদ আহমেদ, স্বত্বাধিকারী, সময় প্রকাশন

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই


  • শরীফ নূরজাহান   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ০০:২৪
পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই
ছবি: সময় প্রকাশন ওয়েবসাইট

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

ফরিদ আহমেদ। বাংলাদেশে সৃজনশীল প্রকাশনার অন্যতম প্রতিষ্ঠান সময় প্রকাশনের কর্ণধার। বাংলাবাজারে সময় প্রকাশন কার্যালয়ে বসে জীবনজয়ীর জন্য তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরীফ নূরজাহান। আজ পড়ুন সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় পর্ব। গত পহেলা জুন প্রথম পর্বটি প্রকাশিত হয়েছিল।

ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় সময় প্রকাশন থেকে কতগুলো নতুন বই বের করেন?

ফরিদ আহমেদ: প্রতিটি ফেব্রুয়ারি বইমেলায় প্রকাশনার জন্য আমি একটা বড় পরিকল্পনা নিতাম। কিন্তু করোনা-পরবর্তীতে সংখ্যাটা কমিয়ে এনেছি। প্রকাশনার সংখ্যাটিকে পঞ্চাশে নির্ধারণ করে ফেলেছি। পঞ্চাশের উপর উঠতে চাইনি। তারপরও হয়তো পাঁচ-দশটা বই বেশি হয়ে যায়।

বইয়ের বাজার ভালো না—এরকম একটা কথা আমরা শুনে থাকি। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?

ফরিদ আহমেদ: প্রকাশনা ব্যবসাটাকে শুধু ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করলে হবে না। প্রকাশনা ব্যবসা করতে গেলে সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি কিছু প্রেম বা দুর্বলতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, এ ব্যবসা চট করে গড়ে তোলা যায় না। একজন বই বিক্রেতা একশ জন প্রকাশকের কাছে দশটা করে বই নিয়ে আসলে এক হাজার শিরোনামের বই এনে দোকান সাজাতে পারছেন। কিন্তু একজন প্রকাশক প্রথম বছরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দশটার বেশি বই প্রকাশ করতে পারেন না। এভাবে বিশ-ত্রিশ করে এগোতে থাকে। দশ বছর মোটামুটি লাগে তাঁর পাঁচশ শিরোনামের বই প্রকাশ করতে। সুতরাং ভিতটা তৈরি হতেই দশ থেকে বারো বছর সময় লেগে যায়। একই রকমভাবে এটি গুটিয়ে আনতেও দশ বছর সময় লাগবে।

করোনা-পরবর্তী সময়ে একটা বড় ধরনের ধাক্কা প্রকাশনা সেক্টরে এসেছে। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা এটাকে হয়তো রিকভার করে নিতে পেরেছেন। কিন্তু প্রকাশনা সেক্টরে রিকভার করা যায়নি। কারণ, করোনার সময় অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে অনেক মানুষ ব্যয়সংকোচন শুরু করেছিলেন। এতে বড় ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বই বিক্রি। আপনি জানেন যে, আমাদের মানুষজনের বড় একটি অংশই বই কেনাকে বাড়তি খরচ মনে করে।

বইয়ের মূল পাঠকগণ হলেন মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তরা যখন আর্থিক সংকটে পড়ে, তখন বাস্তব ক্ষেত্রে তাদের ঘরটা আগে সামাল দিতে হয়। পরে অন্য কিছু। সেই হিসেবে প্রকাশনার মধ্যে বড় ধরনের সংকট চলছে। করোনার পরে প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু এই সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমরা আগে যে কোনো লেখকের বই এক হাজার কপি প্রিন্ট করতাম। এখন এটা তিনশ কপিতে নেমে এসেছে। যে লেখকের বই আগে পাঁচ হাজার কপি বিক্রি হতো, এখন তাঁর বই এক হাজার কপি বিক্রি করাটাও কঠিন হয়েছে। কিছু কিছু লেখকের বই বিক্রি বেড়েছে। কিন্তু গড় হিসেবে সংকটে আছে।

আমি আমার কথা বলতে পারি। এ ব্যবসাটাকে আমি ভালোবেসেছি। আমি এটাকে ছাড়তে পারব না। আমি অন্য কিছু শিখিনি। সুতরাং আমার জীবিকার জন্য এটাকে চালাতে হবে। আমি বলব, বাংলাদেশে যেসব প্রকাশক আছেন বা যারা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাদের প্রকাশনার সঙ্গেই থাকতে হবে। কারণ, প্রকাশনাকে পঙ্গু করে দেওয়া যাবে না।

আমরা শুনে থাকি যে তরুণ প্রজন্ম বইবিমুখ। মানুষকে বইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে কীভাবে?

ফরিদ আহমেদ: দোষারোপ করে লাভ নেই। তরুণ প্রজন্ম বা মানুষের জন্য এখন প্রচুর বিকল্প তৈরি হয়ে গেছে। এটাকে মেনে নিতে হবে। এটাই বাস্তবতা। বইয়ের পাঠক কমে গেলেও, পাঠপ্রবণতা কিন্তু কমেনি। তরুণ প্রজন্ম বা শিক্ষার প্রতি যাদের দুর্বলতা আছে, তাদের মধ্যে গতানুগতিক ধারার প্রকাশনার প্রতি আকর্ষণ কমেছে। একজন প্রকাশক হিসেবে এ পরিবর্তন ২০০০ সালের পর থেকে লক্ষ্য করছি। আমরা চেষ্টা করছি ই-বুক করার জন্য। অনলাইনে বই দেওয়ার জন্য। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়াতে মানুষের আকর্ষণ বেশি, সোশ্যাল মিডিয়ার যেসব লেখা, সেগুলোও বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। সেসব বইয়ের মান বিচার না করেও হচ্ছে। কী করা যাবে? একটা দশক গেলে হয়তো প্রকাশনা পদ্ধতিটাই আমূল পালটে ফেলতে হবে কি না, তা বোঝা যাবে। এখনই আমাদের কোনো তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় না।

আপনার জীবনের কোনো ঘটনা কি বলতে পারবেন, যা পাঠকদের বা নতুন প্রকাশকদের নতুনভাবে আনন্দ দেবে?

ফরিদ আহমেদ: আমার প্রকাশনা জীবনে এমন অনেক লেখকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে, যাঁদের প্রথম কিংবা প্রথম দিকের বইগুলো সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে তাঁদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এটা আমার জন্য আনন্দের।

আমার বড় আনন্দ কাজের মধ্যেই। আমি নিজেই অধিকাংশ পাণ্ডুলিপি পড়ি এবং বইয়ের মেকআপ, গেটআপ ও নান্দনিক দিকগুলো খুঁটিয়ে দেখি। ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই। কোথাও ঘাটতি থাকলে মনে করি, সেটি আমার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা। তবে আমার কাজ থেকে যদি কেউ ভালো কিছু গ্রহণ করে এবং অনুসরণ করে, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

ফরিদ আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।


ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

সংবেদনশীল মানুষরা সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন: ডা. ফওজিয়া মোসলেম

  • রিতু চক্রবর্ত্তী |
  •  ২৯-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.২

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

বাংলাদেশের ব্যাপারে আমার একটা নাড়ির টান রয়েছে: অনিরুদ্ধ মিত্র

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

৪.১

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি শক্তি থাকে: চয়ন কুমার সিংহ

  • মাসুমা হক প্রিয়াংকা|
  •  ১৭-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

পর্ব দুই: ভালো বই প্রকাশ করতে পারলে তৃপ্তি পাই

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ১০-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

পর্ব এক: প্রতিটা বই বের করার মধ্যে বিপুল আনন্দ আছে

  • শরীফ নূরজাহান |
  •  ০১-০৬-২০২৬
ক্যাটাগরি: সাক্ষাৎকার

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।