কাব্যে, শাস্ত্রে, লোকাচারে চাঁদকে যুগে যুগে যারা প্রকৃতি, প্রেয়সী কিংবা দেবতা হিসেবে দেখিয়েছেন, তাঁদের শিল্পভাবনা কিংবা বিশ্বাস নিয়ে লিখতে যতটা জানতে হয়, ততটা বিদ্যে আমার নেই। আমার কাছে চাঁদ প্রকৃতির সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য। তাই তাকে তথ্য আর তত্ত্বে জর্জরিত করে লিখতে আমার মন চাইছে না।
কত রকম চাঁদের কথাই না শুনেছি এ জীবনে। খুব ছোটবেলায় কপালে কাজলের টিপ দিয়ে তার ওপর বেশ করে পাউডার ঘষে মা বলতেন, "চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা..."
আর একটু বড় হতে শুনলাম, চাঁদ নাকি আমার মামা হয়। কিন্তু আমার সত্যিকারের মামা যেদিন বিদেশ থেকে আমাদের বাড়িতে এলেন, খুব হতাশ হয়ে খেয়াল করলাম, তিনি মোটেই আকাশের চাঁদের মতো গোলগাল কেউ নন। রীতিমতো বাবা-কাকাদের মতো দেখতে, রাগী রাগী অন্য একজন। আমার সেদিন প্রায় কান্নাই পেয়ে যেত, যদি না আমার কল্পনার সেই চাঁদমামা তাঁর বিরাট ব্যাগটা খুলে এতগুলো বিদেশি চকলেট আমাকে দিতেন।
তারপর একসময় আমি বুঝে গেছি, চাঁদ আর যা-ই হোক, উনি মোটেই আমার মামা নন এবং আমার চেনাজানা কারও সঙ্গেই তাঁর কোনো আত্মীয়তা নেই। মোটের ওপর, দিনের বেলা যেমন সূর্য ওঠে, তারই অবর্তমানে কাজ চালানোর মতো একটা প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। কেবল মা আমাকে বোকা বানাতে এতকাল রাজ্যের যত গল্প ফেঁদেছেন।
তারপর আর একটু উঁচু ক্লাসে উঠতেই মোটামুটি বুঝে গেছি, চাঁদ পৃথিবীর উপগ্রহ এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে এটি ঘোরে আর ঘোরে। আরও জানলাম, এর নিজের কোনো আলো-টালো নেই, এ ধার করা আলো নিয়ে চলে, তাই এর তেজ কম।
তারপর চাঁদ নিয়ে আরও পড়েছি। চন্দ্রগ্রহণ, জোয়ার-ভাটা, অমাবস্যা, পূর্ণিমা এগুলো বুঝতে কঠিন হলেও মানতে অসুবিধা কোনোকালেই হয়নি।
তারপর হঠাৎ একদিন মনে হলো, এ জিনিস সুন্দর। খুবই সুন্দর। পূর্ণিমায় ভরাট থালার মতো চাঁদ, তৃতীয়া তিথির কাস্তের মতো চাঁদ, সব রূপেই এর আলাদা একটা মহিমা আছে।
কৈশোরে একজনকে দেখে মনে হয়েছিল, চাঁদেরই মতো সুন্দর। অথবা চাঁদ বুঝি হেরে গেছে তার কাছে। আমার মনে পড়ল ভারতচন্দ্রের বিদ্যার কথা,
"কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা।
পদনখে পড়ে আছে তার কতোগুলা।"
সেই আমার প্রথম প্রেম।
আর আজ যখন লিখতে বসেছি, আকাশে ভাদ্রের পূর্ণিমা। চন্দনচর্চিত চাঁদ চেয়ে আছে জানালা দিয়ে। দুধসাদা জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে মাটির পৃথিবী। মনে হলো, গ্রামের চাষির ঘরের খিড়কি দিয়ে ঢুকে আসা চাঁদ, শহরের উঁচু ইমারতের পর্দা একটুখানি সরিয়ে মুখ বের করা চাঁদ, আর আমার মনের মধ্যে একবার উঁকি দিয়ে হারিয়ে যাওয়া কাজলচোখের চাঁদ, কে বেশি সুন্দর?
হু হু করে উঠল মনের সবচেয়ে দুর্বল কুঠুরি। মনে পড়ে গেল বিদ্যাপতির সেই বিচ্ছেদ,
"এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।"
মনে হলো, বড় সুন্দর এই রাত। তার চেয়েও সুন্দর এই শারদ শশী। এখন যদি কেউ এসরাজ শোনাত, বাকি জীবনটা আমি তার কেনা হয়ে থাকতাম।