আমি যদি অ্যাডাম স্মিথের কাছাকাছি পর্যায়ের কোনো মানুষ হতাম, তাহলে বাজারে তাঁর ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’ বিষয়টির মতো আমিও হয়তো মানুষের মনে ‘ইনভিজিবল স্পিড’ নামক নতুন একটা ধারণার উদ্ভাবন করতাম। আজকের কথাই ভাবুন না, আমি দুপুরের খাবার খাচ্ছি। খাওয়ার পর আমার বিশেষ কোনো কাজ বা ব্যস্ততা ছিল বলে আমার মনে পড়ে না। কিন্তু আমি যেভাবে গোগ্রাসে খাবারটা খেলাম, মনে হলো এই বুঝি আমার ট্রেন ছুটে গেল! শুধু খাবার খাওয়ার সময়ই না, ঘুম ভাঙার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা যত কাজ করি, সবকিছুই যেন কোনো এক ‘অদৃশ্য’ গতিতে করতে থাকি।
এমনকি আমরা অনেক সময় বুঝতেই পারি না যে আমরা কেন এত দ্রুত ছুটে চলেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তড়িঘড়ি করে মোবাইল দেখা, অসম্ভব দ্রুতগতিতে আঙুল চালিয়ে নিউজফিড স্ক্রোল করা, দ্রুত নাশতা করা, খেতে খেতেই মোবাইল দেখা, রাস্তায় অকারণে সর্বোচ্চ দ্রুতগতি প্রয়োগ করে হাঁটা, পড়াশোনা করতে গিয়ে দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা, কিছু সময় মোবাইল কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ার বাইরে থাকলে মনে হওয়া যে এই বুঝি কিছু মিস হয়ে গেল, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া; সবকিছু যেন একটা অদৃশ্য দৌড়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দৌড়টা কি সত্যিই আমার প্রয়োজন, নাকি আমি শুধু অভ্যাসের কারণে দৌড়াচ্ছি? আর এই অভ্যাসের সমাধান কী? ধীরগতিতে জীবনযাপন? সম্ভবত, না।
সেই ২০১০ সালে হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত ‘মুভিং এট দ্য স্পিড অব শীর্ষক এক লেখায় ডেবোরা শোবারলিন ডেভিড বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলছেন, আমরা মাঝেমধ্যে যেমন খুব দ্রুত চলি, ঠিক একইভাবে ধীরেও চলি। অতিরিক্ত দ্রুতগতি কিংবা ধীরগতি কোনোটিই জীবনের জন্য সঠিক গতি নয় বলে মনে করেন এই লেখক। তাঁর মতে, জীবনে সঠিক গতিতে চলার জন্য আমাদের ‘রিদম অর ডিরেকশন’ বুঝতে হবে। শুধু ‘স্লো ডাউন’ কোনো সমাধান নয়।
অর্থাৎ আমাদের জীবন কোনো ‘রেস’ বা দৌড় প্রতিযোগিতা নয় যে সবার আগে পৌঁছাতেই হবে। আবার জীবন এমন কোনো ধীরগতির যাত্রাও নয়, যেখানে সবকিছু থেমে থেমে চলবে। বরং জীবনের আসল দক্ষতা হলো, কখন গতি বাড়াতে হবে এবং কখন ব্রেক কষতে হবে, সেটা বুঝতে পারা।
অন্যদিকে ড. ক্রেগ ম্যাকমহান তাঁর ‘হোয়েন লাইফ মুভস টু ফাস্ট, হিয়ারস দ্য সিক্রেট টু স্লোয়িং ডাউন’ লেখায় জীবনের দ্রুতগতিকে কিছুটা দায়ী করে বলছেন, জীবন দ্রুতগতির হয়ে যাচ্ছে এমনটা নয়; বরং আমরাই জীবনের মধ্য দিয়ে আরও দ্রুত ছুটে চলেছি। এমনকি কাজ এবং দায়িত্বের চাপে আমরা এতটাই আবদ্ধ যে জীবনের যে ফাঁকা সময়গুলোতে আমরা একটু নিজের মতো বাঁচতে পারি, প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি, সেই সময়গুলোও ফুরিয়ে আসছে। আর এভাবেই আমাদের শরীর, মন, আত্মা সবকিছু ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।
এর সমাধানও ম্যাকমহান দেখিয়েছেন। আর এই সমাধান তিনি পেয়েছিলেন এক বিকেলে তার সাত বছর বয়সী নাতির সঙ্গে হাঁটতে বের হয়ে। তিনি বুঝেছিলেন, আমাদের ধীরে চলতে হবে এবং বর্তমান মুহূর্তে উপস্থিত থাকতে হবে; অর্থাৎ কোনো কাজের সময় ‘জোন আউট’ তথা মনোযোগ হারিয়ে ফেলা যাবে না। আর জীবনে ধীরে চলা মানেই কাজ কমিয়ে দেওয়া কিংবা অলস হয়ে যাওয়া নয়; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বেঁচে থাকা ও উপভোগ করা।
পরিশেষে, এই হাইস্পিড জীবনে সুন্দরভাবে বাঁচতে হলে আমাদের দক্ষ একজন চালক হতে হবে, যে বুঝবে কখন জীবনগাড়ির স্পিড হাই হবে, কখন লো হবে এবং কখন ব্রেক কষতে হবে। আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় ‘বিলাসিতা’ হলো, নিজের জীবনের গতি সম্পর্কে বুঝতে পারা, নিজের গতি নিজে নির্ধারণ করা, মানুষের গতি দেখে বিচলিত না হওয়া এবং তাকে সেই অনুযায়ী বিচার না করা।