আধুনিক যুগে ডিজিটাল মাধ্যম হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে যোগাযোগ, জ্ঞান আহরণ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার আলোড়নকেন্দ্র। একটিমাত্র জায়গা থেকেই বিভিন্ন ধরনের তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান এখন তুড়ি বাজানোর মতো সহজ। এই সহজলভ্যতার সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো, ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। সাধারণভাবে ভুল তথ্য বলতে অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া ছড়ানো মিথ্যাকে বোঝায়। কিন্তু কখনো কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো হয় মিথ্যা কিংবা আংশিক সত্য তথ্য, যাকে আমরা বলতে পারি কুতথ্য। ইংরেজিতে বলা হয় ডিজ–ইনফরমেশন (Disinformation)। কুতথ্য ছড়ায় অতি দ্রুত ও ব্যাপক হারে। এই ব্যাপকতা বিশ্বজুড়ে গুরুতর সামাজিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম।
কুতথ্যের কারিগরেরা বসে নেই। এমন বাস্তবতায় যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন ইতিবাচক ও নির্ভুল তথা সুতথ্যের বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। সত্যের বিস্তৃতি কেবল কুতথ্যের ক্ষতিকর প্রভাবকেই ঠেকায় না, বরং একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক বৈশ্বিক পরিবেশ সুনিশ্চিতকরণের পথকে এগিয়ে নেয়।
কুতথ্য ও বিভ্রান্তির পরিণতি
কুতথ্য ও বিভ্রান্তি কোনো ছোটখাটো সমস্যা নয়। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং সব সময়ই ধ্বংসাত্মক। এ ধরনের তথ্য সহিংসতা উসকে দিতে পারে, প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং সমাজে মেরুকরণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোভিড মহামারির সময় ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা সম্পর্কে ভুল তথ্য জনস্বাস্থ্যের সংকটকে প্রকটতর করে তুলেছিল। একইভাবে দেশে দেশে বিভ্রান্তিমূলক রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার নজির রয়েছে। যার ফলে বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং পুরো শাসনব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে মানুষ।
ব্যক্তির ক্ষেত্রেও কুতথ্যের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সমানভাবে উদ্বেগজনক। মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান বলে, একই মানুষ বারবার কুতথ্যের ফাঁদে পড়তে পারে। বিষয়টিকে ‘অলীক সত্যতার প্রভাব’ নামে আখ্যায়িত করা যায়। একবার কারও মনে কুতথ্য ডালপালা ছড়ালে তা থেকে বের হওয়া কঠিন। এ ধরনের তথ্য ক্ষতিকর ধ্যানধারণাকে আরও প্ররোচিত করে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈষম্য ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মতো জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে জর্জরিত পৃথিবীতে কুতথ্যের বিস্তার বিদ্যমান সমস্যাকে ক্রমশ জটিলতর করে তোলে।
সুতথ্যের শক্তি
তবে কি কুতথ্য থেকে পরিত্রাণ নেই? সমাধান কোথায়? প্রতিকারের উপায়ই বা কী? এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে মনে রাখতে হবে, কুতথ্যের নেতিবাচকতা ও ক্ষতির সবচেয়ে বড় প্রতিকার হলো সুতথ্য। সুতথ্যই পারে ব্যক্তি ও সমাজকে আলোকিত করে অনুপ্রেরণা জোগাতে। সুতথ্যের সুবাতাস বইয়ে মৌমাছির মতো একচাকে নিয়ে আসতে হবে সমস্ত ইতিবাচক শক্তিকে। নির্ভুল তথ্যের রয়েছে জনগণকে দায়িত্বসচেতন করে তোলার অপূর্ব ক্ষমতা। এতে ব্যক্তি যেমন উপকৃত হয়, তেমনি পারস্পরিক বিশ্বাস ও সংহতি গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে আনে শান্তি।
চারপাশে খেয়াল করলে আমরা দেখব, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুন্দর গল্পগুলো আরও দশজনকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে। একইভাবে কারও ভালো কোনো আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশায় বুক বাঁধে মানুষ, উদ্বেলিত হয় নতুন অনুসন্ধিৎসু শক্তি।
প্রচারমাধ্যম ও প্রযুক্তির ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ তথা একটি বাস্তুতন্ত্র বিনির্মাণে প্রচারমাধ্যম ও প্রযুক্তির ভূমিকা মুখ্য। ইতিবাচক তথ্যের প্রসার ও কুতথ্যের বিস্তার রোধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের রয়েছে অপরিসীম ক্ষমতা। তবে সে জন্য প্রয়োজন সঠিক উপলব্ধি, ইতিবাচক চিন্তা ও নৈতিক মানদণ্ড ঠিক রাখার প্রচেষ্টা।
সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে অবশ্যই প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে হতে হবে নির্মম ও দায়িত্বশীল। ফ্যাক্ট চেকারদের উদ্ভব এ ক্ষেত্রে আশার আলো। তারা বিভিন্ন আঙ্গিকে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে কুতথ্যের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করে কোটি কোটি মানুষকে।
বর্তমানে যেকোনো ধরনের তথ্যের প্রসারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা সর্বাগ্রে। তাই তাদের দায়বদ্ধতাও অনেক। আরও বেশি মানুষকে সংযুক্ত করতে অর্থাৎ ‘রিচ বাড়াতে’ ডিজাইন করা এসব প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম প্রায়ই উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তুকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামনে নিয়ে আসে। অথচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এসব কনটেন্টে কুতথ্য থাকতে পারে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত এমনভাবে অ্যালগরিদম সাজানো যাতে বিশ্বাসযোগ্য ও ইতিবাচক তথ্যগুলোই সবার আগে মানুষের সামনে আসে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে তোলা ও যাচাইয়ের টুলস ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাও তাদের দায়িত্ব।
জনগণকে প্রচারমাধ্যম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে
প্রচারমাধ্যম ও প্রযুক্তিতে পদ্ধতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজের প্রত্যেক মানুষকে মানিয়ে চলার মতো করে দক্ষ করে তোলা সংশ্লিষ্ট মহলের দায়। সচেতন মানুষ যেকোনো বিষয় মূল্যায়নে দক্ষ। সে তথ্যের পক্ষপাতদুষ্টতা ও উৎস যাচাইয়ের সক্ষমতা থাকা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার উচিত কর্মশালা, পাঠ্যপুস্তক ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
উদাহরণস্বরূপ কুতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের লক্ষ্যে ফিনল্যান্ডের জাতীয় পাঠ্যক্রমে মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষালাভের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সংবাদ বিশ্লেষণ ও আকর্ষণের কৌশল শনাক্তকরণের পাশাপাশি তথ্য প্রচারের উদ্দেশ্য অনুধাবনে সক্ষমতা লাভ করে। সচেতন নাগরিক গড়ে তুলতে বিশ্বের সব দেশেই এটি রোল মডেল হতে পারে।
নৈতিক দায়বদ্ধতা
ইতিবাচক তথ্যের প্রচার কেবল বাস্তবতাই নয়, নৈতিক দায়বদ্ধতাও। সুতথ্যের প্রচারে আগ্রহী হওয়া সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমাজের মঙ্গলে আমাদের অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই নৈতিক অবস্থান সক্রিয়ভাবে কুতথ্যের লড়াইয়ের জন্য। সচেতন মানুষ সরব হলে কুতথ্য মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য।
সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কুতথ্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সুতথ্যের প্রচারে প্রয়োজন সম্মিলিত পদক্ষেপ। সরকার, সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত পদক্ষেপই পারে সেই পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে সত্য ও ইতিবাচকতা বিরাজ করে।
সঠিক বিষয়বস্তু প্রচারের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রকেও কঠোর হতে হবে। যাতে মিথ্যা প্রচারের আগে কেউ দশবার ভাবে। সচেতন নাগরিক সংগঠনগুলোর উচিত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের মধ্যে প্রচারমাধ্যম সম্পর্কে ধারণা এবং গঠনমূলক সমালোচনার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত হলে উপকৃত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এ ছাড়া কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ারের আগে যাচাই করে নেওয়া প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
উপসংহার
বর্তমান পথচলা মসৃণ করে সভ্যতাকে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করতে কুতথ্য কিংবা বিভ্রান্তি মোকাবিলায় সুতথ্যের প্রচার জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তিতে আন্তসংযুক্ত এই বিশ্বে আমাদের শেয়ার করা কনটেন্ট কেবল ব্যক্তিজীবনই নয়, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র ছাপিয়ে পুরো পৃথিবীকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম। সঠিক নীতির প্রশ্নে আপসহীন ও গঠনমূলক বর্ণনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরাই পারি সচেতন, ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল বিশ্ব সম্প্রদায় গড়ে তুলতে।
গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই দায়িত্ব আমাদের সবার। প্রতিটি টুইট, পোস্ট কিংবা নিবন্ধ মানবিক বিশ্বায়নে অবদান রাখার একেকটি সুযোগ। আসুন ছোট ছোট প্রয়াসে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে আমরা রূপ দিই ইতিবাচকতার চর্চাকেন্দ্রে।