বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি এর একটি অন্ধকার দিকও উন্মোচন করেছে। সেটি হলো ‘কুতথ্য’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল বা অস্পষ্ট তথ্যের (Disinformation) ভয়াবহ বিস্তার। সাধারণ কোনো ভুল ধারণা বা ‘মিসইনফরমেশন’ থেকে কুত্তথ্য আলাদা; কারণ এটি তৈরি ও ছড়ানো হয় সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে—কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রের ক্ষতি করার কিংবা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কানাডা সরকারের একাধিক প্রতিবেদন অবলম্বনে পড়ুন জীবনজয়ী প্রতিবেদন।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) (AI) দ্রুত উন্নতির কারণে কুতথ্যের বিস্তার মহামারি আকার ধারণ করেছে। একটি সত্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগে, বা সমানতালে, সে-সম্পর্কিত কুতথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর ভয়াবহতা সুদূরপ্রসারী। এটি সমাজে মেরুকরণ সৃষ্টি করে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কলুষিত করে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে (যেমন: মহামারির সময়ে ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার)। কুতথ্যের দৌরাত্ম্যে সব ধরনের সংখ্যালঘু ও নারীর মান-মর্যাদা এবং নিরাপত্তা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
কুতথ্য প্রতিরোধে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় স্তরে কী করা যেতে পারে?
ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ
• নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত (Confirmation Bias) চেনা: আমরা সাধারণত আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় এমন তথ্য যাচাই ছাড়াই বিশ্বাস করি। কুতথ্যকারীরা মানুষের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। তাই কোনো তথ্য পড়ার সময় নিজের আবেগ বা পক্ষপাত দূরে সরিয়ে রেখে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করতে হবে।
• আবেগতাড়িত ও চাঞ্চল্যকর শিরোনাম এড়িয়ে চলা: কুতথ্য মানুষের রাগ, ভয় বা অতিরিক্ত উদ্দীপনাকে লক্ষ্য করে। কোনো খবরের শিরোনাম যদি অতিরিক্ত চাঞ্চল্যকর বা নাটকীয় হয়, তবে তা শেয়ার করার আগে সতর্ক হতে হবে।
• উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই এবং ডিপফেক চেনা: তথ্যের মূল উৎস কী, তা নিশ্চিত হতে হবে। অনেক সময় সত্য ঘটনাকেও প্রেক্ষাপট (Context) থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। বর্তমান সময়ে ডিপফেক বা এআই দ্বারা কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি ও ভিডিও চেনার জন্য তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা জরুরি।
কুতথ্য সম্পর্কে আগাম সচেতনতা তৈরি (Prebunking)
কুতথ্য ছড়িয়ে পড়ার আগেই সঠিক তথ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে সহজে ও দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে। কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে আগে থেকেই সঠিক তথ্যের প্রচার চালানো হলে কুতথ্যের প্রভাব অনেক কমে যায়।
• স্বচ্ছতা ও মুক্ত যোগাযোগ: ভুল স্বীকার করার মানসিকতা এবং জনগণের সঙ্গে নিয়মিত সুসম্পর্ক বজায় রাখলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে, যা কুতথ্য প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
• ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য সাক্ষরতা: সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়মিত ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং তথ্য যাচাইয়ের (Fact-checking) প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।
কুতথ্য মোকাবিলা করতে গিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না
• বাক্স্বাধীনতা রক্ষা: কুতথ্য প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমের বহুত্ববাদ বন্ধ করা যাবে না। রাষ্ট্রকে ইন্টারনেট শাটডাউন বা অস্পষ্ট আইন প্রণয়ন থেকে বিরত থাকতে হবে।
এ ছাড়া কুতথ্য মোকাবিলায় সুশীল সমাজ, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।