ক্যাম্পাস

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা


  • শাহানা বেগম  ঝিনাইদহ |
  • প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৯
আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

২০২২ সালের কথা। জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে আবারও ছাত্রজীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। ছাব্বিশ বছর পর আবার বই-খাতা হাতে নেওয়া, আবার ক্লাসরুমে বসা। সে এক মহাশুভারম্ভ আমার জন্য। সবকিছুই আমার কাছে নতুন শুরুর মতো ছিল।

আমি জন্মেছি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে। আমাদের সময়ের মেয়েদের জীবনটা ছিল একটু ভিন্ন। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল, স্বপ্নও ছিল। কিন্তু একটা সময় এসে সংসার আর পরিবারের দায়িত্বই আগে স্থান করে নিল।

১৯৯৬ সালে আমি পাস কোর্সে বিএসএস ডিগ্রী সম্পন্ন করি। ১৯৯৭ সালে বিয়ে। অতঃপর সংসারসমুদ্র। কত যে চেনা-অচেনা দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে এসে পড়ল। সবকিছু মিলিয়ে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যেতে হয়। ২০০১ সালে আমার সন্তান জন্ম নেয়। একজন মা হিসেবে সন্তানের যত্ন আর পরিবারের দায়িত্বই হয়ে উঠেছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটা ঠিক, পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসাটা কখনো হারিয়ে যায়নি।

২০২২ সালে আবার সেই সুযোগ এল। ভর্তি হলাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগে মাস্টার্সে। প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার সান্ধ্যকালীন ক্লাস হতো। একটানা চারটি ক্লাস। খুব সুন্দর একটি আয়োজন। সব বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ার দারুণ এক সুযোগ ছিল এটি।

প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী যে ভালো লেগেছিল! এত বছর পর আবার ক্যাম্পাসে হাঁটা, ক্লাসে বসা, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হওয়া—সবকিছুতেই ছিল অন্যরকম আনন্দ। অনেকে অবাক হয়ে বলত, ‘আপনাকে দেখে তো মনে হয় না আপনার বয়স এত!’

আমি প্রতি সপ্তাহে শুক্রবার ঝিনাইদহ সদর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। আমার স্বামী নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে যেতেন এবং আবার নিয়ে আসতেন। বলতে কী, আমার নতুন পথচলার সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিলেন আমার স্বামী ও মেয়ে। আমি যখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেয়ে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

সংসার আর পড়াশোনা একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না। তবে পরিবারের সহযোগিতার কারণে সবকিছু সম্ভব হয়েছে। আমার স্বামী অনেক সময় রান্না করেছেন, ঘরের কাজ করেছেন, যাতে আমি পড়াশোনার জন্য সময় দিতে পারি।

পড়াশোনা আমার কাছে কঠিন মনে হয়নি। ছোটবেলায় যেভাবে আন্তরিকতা নিয়ে পড়তাম, এবারও ঠিক সেভাবেই পড়েছি। পুরো সেমিস্টারজুড়ে নিয়মিত পড়াশোনা করেছি। সেই পরিশ্রমের ফল হিসেবে আমি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হলো আমার সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানো। বয়সের পার্থক্য থাকলেও তারা আমাকে কখনো আলাদা করে দেখেনি। ক্লাস করা, গল্প করা, চায়ের আড্ডা দেওয়া, নিজেদের জীবনের গল্প ভাগ করে নেওয়া—এসব মুহূর্ত আজও মনে পড়ে।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন ছিল সাহেরা। সে শুধু আমার সহপাঠী ছিল না, ছিল আমার জীবনের একটি বিশেষ মানুষ। সাহেরা আমার জন্য আল্লাহর দেওয়া একটি উপহার ছিল। তার সঙ্গে কত গল্প, কত স্মৃতি জমে আছে। আমার এই পড়াশোনার যাত্রায় তাকে পাশে পাওয়া ছিল বড় প্রাপ্তি। কয়েক মাস আগে সাহেরা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। মাত্র ৪০ বছর বয়সে তার চলে যাওয়া খুব কষ্টের। আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তি দান করুন।

আমার সহপাঠীদের মধ্যে কমরেড অশোক পালও আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর। বাড়ি যশোরে। সময়ের টানাপোড়েনে তিনি নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি, কিন্তু শেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছে।

সেমিস্টার ফাইনালের পর আমরা পিকনিক করতাম, চড়ুইভাতি করতাম। সময় খুব বেশি ছিল না, কারণ এটি ছিল সাপ্তাহিক আয়োজন। কিন্তু যতটুকু সময় পেয়েছি, মন ভরে উপভোগ করেছি।

আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল শেষ সেমিস্টারের শেষ দিন। সেদিন সবার সামনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। এই সুযোগ আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান মনজুর স্যারের উৎসাহও আমাকে অনেক সাহস দিয়েছিল।

দুই বছর কখন যে শেষ হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। শেষ দিনে যখন সবাইকে একই জায়গায় শেষবারের মতো দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন শুরু করেছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন আমাকে শিখিয়েছে, শেখার কোনো বয়স নেই। ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করার ইচ্ছা আছে। সুযোগ হলে পিএইচডিও করতে চাই। আজকের শিক্ষার্থীদের জন্য আমার একটাই কথা—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো, নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করো। কারণ, স্বপ্ন পূরণের জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না।

অনুলিখন: জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা


ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

  • শাহানা বেগম|
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

গণরুমের রাত

গণরুমের রাত

  • আলমগীর হোসেন|
  •  ০২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৫

স্কুলদিনের রঙিন স্মৃতি

স্কুলদিনের রঙিন স্মৃতি

  • সামিয়া ইফফাত |
  •  ২৪-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

২.৬

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টুকরো স্মৃতি

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের টুকরো স্মৃতি

  • ফারিয়া আক্তার জুঁহি|
  •  ১৯-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

ক্যাম্পাসে এসে বই ও বইয়ের বাইরে থেকে শিখছি

ক্যাম্পাসে এসে বই ও বইয়ের বাইরে থেকে শিখছি

  • অপু কুমার সরকার|
  •  ০৮-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

রোকেয়া হল: পকেটের হিসেব কষা দরকার

রোকেয়া হল: পকেটের হিসেব কষা দরকার

  • শারমিন আকতার জেনি|
  •  ০৬-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৩.৪

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।