ক্যাম্পাস

রোকেয়া হল: পকেটের হিসেব কষা দরকার


  • শারমিন আকতার জেনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |
  • প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০০:৫০
রোকেয়া হল: পকেটের হিসেব কষা দরকার
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

২০২৩ সালের ৫ জুলাই। চারপাশে অন্ধকার। এক দীর্ঘ টানেল, যার শেষ দেখা যাচ্ছে না। মুখে আলো নেই, চোখে নেই কোনো ঝলকানি।

আমি কি মরে যাচ্ছি?

না।

আমি ঘুমাচ্ছি। চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছি।

তাহলে কথা বলছি কার সঙ্গে?

কারো সঙ্গেই না।

আমি কথা বলছি না।

তবে?

মস্তিষ্কের ডান সেরিব্রাম আমাকে কল্পনার গভীরে টেনে নিতে চাইছে। বাম সেরিব্রাম কিছুতেই তা মানতে চাইছে না। মুখ বুজে মেনে নেওয়া তার স্বভাব নয়। শেখানোর চেষ্টা করা হয়নি, তার আগেই—টুং টাং, কুট কুট, খট খট—সব রকম শব্দ কানের পাশে সারি ধরে দাঁড়িয়ে। গায়েবি ভাষায় বলছে, “তোমার পাকস্থলীতে কী?” সেটা আমি দেখার চেষ্টা করছি।

পাকস্থলীতে কী আছে?

পাকস্থলীতে কিছু নেই।

কিছু নেই?

না।

একটু ক্ষুধা আছে।

একটু?

না, অনেকটা।

ডান সেরিব্রাম খাবারের ছবি নিয়ে হাজির হতে চায়, এমন সময়—ধুম! না চাইলেও কাজ হলো না। এর আগেই লাফিয়ে উঠলাম। পরের দশ সেকেন্ডে চোখে শুধু ঝাপসা আলো। কানে গুড়মুড় করে সব পড়ে যাওয়ার শব্দ। ফ্লোরে কমলা-সাদা রঙ, আর পায়ের কাছে একটু কালো রঙের বিড়ালটা—‘গুলার’। আগে ওকে ফুলার রোডে দেখা যেত, তাই নামটা ফুলারের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা। এখন ওকে করিডোরেই বেশি দেখা যায়। ওর ডান সেরিব্রাম নিশ্চয়ই কাজ করছে না, তাই গত রাতের বেঁচে যাওয়া ডাল খেতে চলে এসেছে। হলের সাত তলায় ও ওঠে কীভাবে? লিফটের বোতাম চেপে দেয় কে?

বাম পাশ কিছু একটা বলতে চাইছে—“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন....” সেই জন?

এরপর আর কিছু শুনতে পাচ্ছি না। কানেকশন এরর—৪০৪। রুমের বাকিরা অঘোর ঘুমে, শব্দও করা যাবে না।

আগের রাতের রেখে দেওয়া মাছের কাঁটার বাটিটা এগিয়ে দিয়ে নিচে নামলাম। বেলা ৮টা বেজে ২৩ মিনিট। আকাশ দেখে বোঝার উপায় নেই, সকাল আটটা না সন্ধ্যা আটটা। বৃষ্টি এলো বলে!

কী খাব ভাবছি। ভাবনার তালিকা বিশাল। কিন্তু পকেটের হিসেব কষা দরকার। দেখি দুটো দুই টাকার নোট, একটা পাঁচ টাকার কয়েন, তিনটা এক টাকার কয়েন—মোট ১২ টাকা। তালিকা অনুযায়ী আরও কিছু টাকা দরকার।

কার্ডে আছে। রোকেয়া হল থেকে টিএসসির ডাচ-বাংলা বুথ—পাঁচ মিনিটের রাস্তা। এখন সেটা সহস্র বর্ষের পথ। পাড়িও দিলাম।

মেশিনে কার্ড দিলাম, পিন চাইল। পিন দিতে যাব....

“মামার কি মন খারাপ?”

আরেহ্! এ কণ্ঠ তো এতক্ষণ ছিল না। এতটুকু এক মাথা মিমিক্রি শিখে ফেলেছে নাকি! প্রতিভা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

পিন দিলাম।

আবার—“মামার কি মন খারাপ?”

নাহ্, ডান-বাম কোনো পাশ থেকে নয়, শব্দটা পেছন থেকে আসছে।

ঘুরে দাঁড়ালাম।

পরিচিত মুখ।

প্রতি সপ্তাহে টাকা তুলতে এলে দেখা হয়।

হাসি বিনিময় হয়, কখনো “কী অবস্থা মামা” পর্যন্ত কথাও গড়ায়।

এর মাঝে যান্ত্রিক ক্যাচ ক্যাচ শব্দে—“Do you want any other transaction?”

“No.”

আজও হয়তো হাসি বিনিময় হয়েছে।

অভ্যাসবশত “কী অবস্থা মামা” বলেও ফেলেছি।

তবু লোকটা সন্তুষ্ট নন।

চোখ বলছে, তাঁর ধারণা—কিছু একটা ঘটেছে।

“না, মামা।”

“মুখ এমন কেন? শরীরে জ্বর নাকি? চারদিকে সবার জ্বর, সর্দি। আপনার অবস্থা তো ভালো দেখা যায় না…”

আরও কিছু বলছিলেন।

“মামা? মামা?”

ঘোর ভাঙল।

কপালে হাত দিলাম। সত্যিই জ্বর। এতক্ষণ তো ছিল না। ছিল না তো?

“যাইতে পারবেন হল পর্যন্ত? আগায়া দিমু?” হাসলাম।

এই হাসি হয়তো প্রথমটার চেয়ে চওড়া ছিল। লোকটা স্বস্তি পেলেন মনে হলো।

বললাম, “পারব। নাস্তা হয়েছে?”

“হ্যাঁ। আপনি শরীরের যত্ন নিয়েন। আদা আছে? চা বানায়া খাইতে পারবেন না? ভালো লাগবে কিন্তু। গরম পানি নিবেন মামা, একটু লবণ মিশায়া গলায় ধইরা রাখবেন।”

আমি হাসলাম। আরও একবার হাসলাম। চাইনি, কিন্তু না চাইতেও হাসলাম।

বুথের দরজাটা শক্ত কাচের। খুলতে একটু কষ্ট হয়। এবার হাতলে হাত দেওয়ার আগেই দরজা খুলে গেল। আমি বাইরে পা দিলাম।

পৃথিবীর উজ্জ্বলতা আরও বেড়ে গেল নাকি হঠাৎ? মেঘ না ছিল একটু আগে? সূর্য উঠে গেছে নাকি?

সবকিছু একটু বেশি চকচকে, ঝকঝকে লাগছে!

ডান অংশ বলল—“সূর্য ডুবে যায় সূর্য ওঠার জন্য।” আরেক পাশ থেকে চিৎকার—“জলদি হাঁটো, নাস্তা পাবা না কিন্তু!”

আমি হাঁটছি। পাঁচ মিনিটের পথ। ৮টা বেজে এখন ৫৭ মিনিট। ওই তো সূর্য। একটাও কালো মেঘ নেই। আমি দ্রুত হাঁটছি।


পরোটা খাব। ডাল দিয়ে। একটা চা নেব। আদা চা।


ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

         

  রেটিং: ৩.৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

  • ঐশী কর্মকার|
  •  ০৭-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

  • চিররঞ্জন সরকার|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৫

ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ফিরে দেখা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

  • মো. মিজানুর রহমান |
  •  ১৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

এইসব রঙিন দিন কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে

এইসব রঙিন দিন কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে

  • সুপ্তি রায় |
  •  ১৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৭

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা

  • শাহানা বেগম|
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

গণরুমের রাত

গণরুমের রাত

  • আলমগীর হোসেন|
  •  ০২-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৫

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।