১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাস। ছোট্ট গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে যাওয়ার সেই আমার শুরু। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার সুবাদে আমার প্রথম ঘর ছাড়া। সকালে কুষ্টিয়া শহরে এসে রাজশাহীগামী ট্রেনে উঠি। তিন ঘণ্টার পথ। মনের মধ্যে কত চিন্তা, কত স্বপ্ন খেলা করছিল, তা বোঝানো যাবে না। বারবার মনে হচ্ছিল, কেমন হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়? না জানি কেমন হবে সেখানকার মানুষগুলো?
দুপুর একটার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে নামলাম। পেটে ভীষণ ক্ষুধা। মাছ-মাংস বা অন্য কিছু একটা কিনলে ডাল-ভাত ফ্রি। অবাক কাণ্ড!
খাবারের দাম দিতে দিতে ক্যাশিয়ারের কাছে শহীদ হবিবুর রহমান হল কত দূরে জানতে চাইলাম। লোকটি সোজা গিয়ে বামে, তার পর আবার বামে ইত্যাদির মাধ্যমে আমাকে হলের অবস্থান বুঝিয়ে দিলেন। এটাও জানালেন যে রিকশায় গেলে দুই মিনিট! এটুকুর জন্য আবার রিকশা কে নেবে? আমি হাঁটা দিলাম। ওই তো হল।
চারতলা লাল ইটের বিশাল হল। দেখেই ভালো লেগে যায়। ভেতরে গিয়ে অফিসের কাজ সারি। আমার জন্য একটি সিটও বরাদ্দ দেওয়া হয় সঙ্গে সঙ্গে। আমার ঠাঁই হয় একতলার ১১২ নম্বর রুমে। রুমমেট তিনজন, সবাই সিনিয়র। র্যাগ দেওয়া দূরে থাক, উনাদের জন্যই হল লাইফ এখনো সবচেয়ে ভালো স্মৃতির খাতায় রয়ে গেছে।
পরদিন ডিপার্টমেন্টের অফিসে কিছু কাজ শেষে ক্লাসে যাই। আমার প্রথম ক্লাস ছিল ড. জেহাদুল করিম স্যারের। যেমন মিষ্টভাষী, ঠিক সে রকম পণ্ডিত একজন শিক্ষক। আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক জেহাদুল স্যারই ছিলেন। ক্লাসে গিয়ে নতুন বন্ধুবান্ধব জোটে। তাদের মধ্যে ওদুদ আর আসিফ এখনো আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
সেশনজট, ১৯৯০-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। সবকিছু মিলিয়ে আমার পড়াশোনা শেষ হয় ১৯৯৪ সালে। এর মধ্যে হাজারো মনে রাখার মতো ঘটনা আছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সময়টা কাটাতে হয়েছে। তথাপি মনের ফ্রেমে ভালো সময়গুলোই সুন্দর বাঁধানো হয়ে আছে।
পরীক্ষার আগে প্রতিবারই আমাদের সবার একই কাণ্ড হতো। সারা বছর না পড়ার ধাক্কা সামলাতে সারারাত জেগে পড়তাম, এর মাঝে চলত চা-বিস্কুটের আড্ডা। সকালের পরীক্ষা দিয়ে এসেই আমাদের আর খোঁজ পাওয়া যেত না পরের পরীক্ষা অবধি।
আরেকবার মনে আছে, আমাদের বন্ধু মনির একজনের সঙ্গে মনোমালিন্য করে তাকে ঘুষি মেরে দেয়। আমরা সবাই গিয়ে সে ঝামেলা মীমাংসা করে দিই। বলা ভালো, এই ঘটনা আর বেশি দূর গড়ায়নি। তারা দুজনই তাদের ভুল বুঝে দায়িত্বশীল মানুষের মতো ঝামেলা মিটিয়ে নেয়।
[আরো পড়ুন: আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা]
তখনকার রাজশাহী শহর ছিল খুব নিরিবিলি। এখনকার মতো এত যানবাহনও ছিল না। বিকেলে মোটরসাইকেল নিয়ে টি-বাঁধ, পদ্মার পাড়ে বেরিয়ে পড়তাম। সময় পেলেই ফুটবলের মাঠে দাপিয়ে বেড়াতাম। একটা সময়ে এসে নতুন নতুন টিভি আসে হলে, সঙ্গে ডিশ লাইন। সুযোগ পেলেই অডিটোরিয়ামে চলে যেতাম। এখনকার মতো এত প্রোগ্রাম ছিল না তখন। হিন্দি সিনেমার গান, খেলা আর খবর দেখাত। ভাগ্য ভালো থাকলে মাঝে মাঝে দেখা যেত বাংলা সিনেমা। কিন্তু নতুনত্বের আমেজে আমরা এতটুকু নিয়েই ব্যাপক খুশি থাকতাম।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই প্রথম বাড়ি থেকে দূরে থাকা, প্রথম নিজের মতো জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়া, প্রথম রান্না শেখা, প্রথমবারের মতো অপরিচিত মানুষদের মধ্যে পরিবারকে খুঁজে পাওয়া। এখনো যখন নিজের পরিবারের জন্য রান্না করি, আমার ক্যাম্পাসের পরিবারের কথা মনে পড়ে যায়।
চল্লিশ বছর পেরিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, চার-চারটি দশক কীভাবে পেরিয়ে গেল! এই তো সেদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলাম। এতগুলো বছর কীভাবে চলে গেল! গত বছর পুনর্মিলনীতে গিয়ে বহু পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আরও দেখা হয়েছে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তারা যখনই পরামর্শ চেয়েছে, তখনই বলেছি, “ভালো করে পড়াশোনা করো, আর হল লাইফটাকে এনজয় করো। দেখতে দেখতে এই সময়টা পেরিয়ে যাবে। এনজয় দিস লাইফ।”
অনুলিখন: জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা