ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। শীতের কুয়াশা তখনো কাটেনি। একবুক স্বপ্ন এবং আশার উষ্ণতা নিয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে এসেছি এই চত্বরে, যে চত্বর হাজারো স্বপ্ন পূরণের পাথেয় হয়ে আছে শতবর্ষব্যাপী।
"তুই তো অনাবাসিক ছাত্র, গণরুমেই থাকতে হবে প্রথমে," বড় ভাই বললেন সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময়।
অপরিচিত শব্দ। কিছু বুঝলাম না। মনে মনে ভাবলাম, রুম তো রুমই হবে, গণরুম আবার কী! একটু বেশি ছাত্র থাকার বন্দোবস্ত হবে বড়জোর।
আমার ভুল ভাঙল, যখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বুঝলাম।
একটা ঘরে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন ছাত্র। এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রে সবাই শরণার্থী। মেঝেতে বিছানা পাতা, আবার কারো বিছানা নেই। প্রায় খাটের নিচে, আলমারির পাশে, এমনকি দরজার ফাঁকা জায়গাতেও কেউ কেউ শুয়ে আছে। কারো নির্দিষ্ট বিছানা নেই, নির্দিষ্ট সময়ও নেই ঘুমানোর। কেউ পড়ছে, কেউ গল্প করছে, কেউ গিটার বাজাচ্ছে, রাত বারোটাতেও ঘরের বাতি নেভে না।
আমি হতভম্ব হয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় যে ছেলেটা সবসময় নিজের একটা টেবিল, একটা বিছানা, একটা নির্দিষ্ট রুটিনে অভ্যস্ত ছিল, তার জন্য এই দৃশ্য রীতিমতো ভূমিকম্পের মতো। অথচ এই ঘরের প্রতিটি ছেলেই তো কোনো না কোনো স্কুল-কলেজের সেরাদের একজন, নয়তো এখানে আসতই না।
প্রথম রাতে ঘুম হলো না। দ্বিতীয় রাতেও না। তৃতীয় রাতে বুঝলাম, এখানে টিকে থাকতে হলে নিয়মটাই বদলে ফেলতে হবে, নিজের নিয়মমতো নয়, বরং এখানের নিয়মই মানার অভ্যাস করাই শ্রেয়।
কোনো একদিন বিজ্ঞানের এক বন্ধুর থেকে শোনা ডারউইনের সেই সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট কথাটা মনে পড়ে গেল। এখানে প্রকৃতির নিয়মটাই যেন কিছুটা কার্যকর। যে যেভাবে পারে, খাপ খাইয়ে নেয়। বিছানা নেই তো কী হয়েছে, মেঝেতেই আধশোয়া হয়ে চোখ বুজে নেওয়া যায়। বাতি নেভে না তো কী, চোখের ওপর একটা হাত রেখে কিংবা গামছা দিয়ে ঢেকে রেখে ঘুমিয়ে পড়া যায়। আড্ডা-হইচইয়ের মাঝেও যদি মন স্থির রাখা যায়, তবে বইয়ের পাতাও চোখে পড়বে।
[এখানে পড়ুন: স্কুলদিনের রঙিন স্মৃতি]
আস্তে আস্তে আমিও অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। যখন যেখানে জায়গা পাই, সেখানেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ি। কখনো বন্ধুর পায়ের কাছে, কখনো দরজার কোণে, কখনো বা টেবিলের নিচে। প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত, অস্বস্তি হতো। পরে বুঝলাম, এই অস্বস্তিটাই আসলে একটা পরীক্ষা। যে এই পরীক্ষায় ভেঙে পড়ে, সে হারিয়ে যায়। আর যে টিকে থাকে, তার সামনে খুলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল দুয়ার।
রাতের গণরুমে শুয়ে শুয়ে আমি প্রায়ই ভাবতাম, এই অনিয়মের মধ্যেও একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। এখানে কেউ কাউকে ঠেলে ফেলে দেয় না, বরং জায়গা করে দেয়। এমনকি রাতভর জেগে থাকা বড় ভাইয়েরা টেবিল-চেয়ার ছেড়ে দিতেন, যখন কারো পরীক্ষা থাকত। কেউ নিজের বিছানার এক কোণ ছেড়ে দিত নতুন কাউকে। এই বিশৃঙ্খলার ভেতরেই একধরনের সহমর্মিতা, একধরনের ভ্রাতৃত্ব বেঁচে ছিল।
[ক্যাম্পাসে এসে বই ও বইয়ের বাইরে থেকে শিখছি]
মাসের পর মাস এভাবেই কাটতে লাগল। বন্ধুত্বের গভীরতা বাড়তে থাকল। সবাই মিলে স্বপ্ন দেখতে থাকলাম, বড় হওয়ার স্বপ্ন। গণরুমের সেই রাতগুলো একদিন শেষ হলো, কিন্তু তার আগে এই রাতগুলোই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে প্রতিকূলতার ভেতর নিজের পথ খুঁজে নিতে হয়।
আজ এত বছর পর যখন সূর্যসেন হলের সেই গণরুমের কথা মনে পড়ে, তখন আর কষ্ট লাগে না। বরং মনে হয়, ওই রাতগুলোই আমাকে প্রথম শিখিয়েছিল, জীবনে নির্দিষ্ট বিছানা সবসময় থাকে না, কিন্তু নিজের জন্য জায়গা করে নেওয়ার সাহসটা যদি থাকে, তবে যেকোনো মেঝেতেই একদিন ঘুম আসে, আর সেই ঘুমের ভেতরেই বেড়ে ওঠে একটা গোটা স্বপ্ন, বড় হওয়ার স্বপ্ন।