সেই ২০১৩ সালের কথা। জানুয়ারির কনকনে এক শীতের সকালে বটলগ্রীন কামিজ, সাদা সালোয়ার, সাদা ওড়না, লাল সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে বাবার সাইকেলে চড়ে রওয়ানা দিলাম নতুন গন্তব্যে।
এবারের গন্তব্য আগের চেয়ে বড়। হঠাৎ করে নিজেকে কেমন বড় ভাবতে শুরু করেছি। কেউ এমন-তেমন কিছু বললে আমার উত্তরটার মানে দাঁড়াত, ‘এখন আমি হাইস্কুলে পড়ি, আমি কিন্তু আর ছোট নেই।’ সদ্য প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে হাইস্কুলে পা দিয়েছি, তাতেই যেন মহাপণ্ডিত হয়ে পড়েছি, ভাবখানা আমার এমন। বই তখন ছয় খানা থেকে বারো খানা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো এক ভর্তিযুদ্ধ জয় করে সেরা পাঁচের মধ্যে স্থান করেছি, আর কী লাগে! কী এক অদ্ভুত আনন্দ-উত্তেজনা নিয়ে শুরু হলো সেই মাধ্যমিক জীবন।
[এখানে পড়ুন: শীতের এক চাঁদনী রাতে ক্যাম্পাস]
প্রাইমারির পুরোনো বিচ্ছু বান্ধবীগুলো আছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন মুখেরা। সব মিলিয়ে হৈহৈরৈরৈ। পড়াশোনা আমাদের খুব একটা কাবু করতে পারেনি। কিন্তু স্কুলের কঠোর নিয়ম আমাদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিয়েছিল। ব্যাগভর্তি বইয়ের বোঝা নিয়ে সকাল নয়টায় ঢুকতাম। বিকেল চারটায় মুক্ত হয়ে বাড়ি যেতে যেতে উড়তে থাকতাম। কিছুদিন পরে সেই জেলখানা আমাদের স্বর্গে পরিণত হলো। সেখানে একদিন না যেতে পারলে মন ছটফট করত।
সদ্য শৈশব শেষ করে কৈশোরে পদার্পণ করেছি। জীবনের গূঢ় কোনো অর্থ তখনও বুঝি না। চারপাশে আমার দুনিয়া রঙিন। আমরা, একঝাঁক কিশোরী, যেন লাল ঘুঙুর পায়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি পুরো স্কুল।
আমাদের স্কুল শুরু হতো সমাবেশের মাধ্যমে। শুরুতে উচ্চস্বরে কুরআন ও গীতা পাঠ। শপথপাঠ। জাতীয় সঙ্গীত। তারপর ক্লাস শুরু। প্রিয় বান্ধবীরা ক্লাসে পাশাপাশি বসার জন্য কত কারসাজি করেছি। কতবার যে শাস্তি পেয়েছি শিক্ষকের কাছে। হাসিমুখে মেনে নিয়েছি। সে কী মিল আমাদের! মনে হতো এই বন্ধন জীবনে কেউ ছিঁড়তে পারবে না। সকলে আমরা ভিন্ন শরীরে একাত্মা। আমরা পাঁচ-সাতজনের একটা গ্রুপ ছিল বেশ। ক্লাসে সবার মধ্যেও প্রিয় কিছু বান্ধবী, তার মধ্যে আবার একজন বা দুজন ছিল তথাকথিত ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’।
বড্ড ধৈর্য নিয়ে টিফিন পিরিয়ডের আগ পর্যন্ত চারখানা ক্লাস করতাম। চতুর্থ ক্লাসের সময়টা যেন পার হতে চাইত না। অপেক্ষা কখন ঘণ্টা পড়বে ঢং ঢং আর ছুটে যাব মাঠে। সবাই সবার টিফিন নিয়ে চলে যেতাম বড় আমগাছটার নিচে। ভাগাভাগি করে টিফিন খাওয়া আর গল্পের আসর। সেসময় আমাদের ফোন, ফেসবুক, রিলস কিছু ছিল না। আমাদের গল্পের বিষয় ছিল টিভি চ্যানেল, সিনেমা, গান, সাহিত্য, সদ্য রিলিজ করা কোনো হিন্দি সিনেমা, গতরাতে মিস হওয়া কোনো ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের শেষ এপিসোড। কোন তারকার জীবনে কী চলছে, সেটাও ছিল আমাদের চর্চার বিষয়। কখনও কখনও অবশ্য আধা মাইল দূরে বয়েজ স্কুলের ছেলেদের নতুন কোনো কাণ্ড নিয়ে হাসাহাসি করতেও ভুলতাম না। গল্প-হাসি-আড্ডা-তর্ক-বিতর্ক-গান নিয়ে ছিল আমাদের সোনালি দিনগুলি।
[এখানে পড়ুন: ক্যাম্পাসের বুকে এক টুকরো ফুটবল স্বর্গ]
কোনো কোনো দিন আমরা দলবেঁধে খেলতে নামতাম মাঠে। বউ তোলা-তুলি বা বউচি, গোল্লাছুট, বরফপানি, এলন্টি লন্ডন, আরও কত খেলা। সেসবের নাম এখন ভুলতে বসেছি। মনে মনে কঠিন প্রার্থনা করতাম এই টিফিন পিরিয়ডটা শেষ না হোক। পিওন দাদু ঘণ্টা বাজাতে ভুলে যাক। কিন্তু কখনও তা হতো না।
ঘণ্টা বেজে উঠত ঠিকঠাক। বুড়ো দাদুর দোকান থেকে এক প্যাকেট চানামুড়ি না হয় বাদাম কিনে বেজার মুখে, হাঁপিয়ে, ক্লান্ত শরীরে ক্লাসে ফিরতে হতো। আরও দুটো পিরিয়ড, তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত ছুটির ঘণ্টা।
স্কুল ছুটির পর আমরা দলবেঁধে বাড়ির পথ ধরতাম। রাস্তার লোক কতশত অভিযোগ দিয়েছে আমাদের নামে, সে-সবের কোনো তোয়াক্কা করিনি কখনও। কেন অভিযোগ, তাও ভালো করে বুঝিনি কখনো।
আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মাস ছিল জানুয়ারি। একটা ক্লাস শেষ করে নতুন ক্লাসে উঠতাম। আরেক বোঝা নতুন বই। জানুয়ারি মাসজুড়ে মনে হতো নতুন বইয়ের গন্ধে ক্লাসরুম ম ম করছে। জানুয়ারিতে তেমন আহামরি পড়াশোনা হতো না। এ মাস কাটত বনভোজন, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, বার্ষিক ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এসব কিছু নিয়ে। সারাটা বছর আমরা ওই কটা দিনের অপেক্ষা করতাম।
সেসময় স্কুল কিছুটা শিথিল হতো। স্যার-ম্যাডামদের রাগী রাগী মুখ দেখতে হতো না। সবাই হাসিখুশি উৎসবের আমেজে মেতে থাকত। গান, কবিতা, নাটক, যেমন খুশি তেমন সাজো—এসব নিয়ে চলত আমাদের মহা গবেষণা। কে কী করবে, কীভাবে সাজবে, কী কী হবে। উত্তেজনায় রাতে ঘুম আসত না, মনে হতো কখন সকাল হবে আর স্কুলে যাব।
সারাবছর অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজনও থাকত। তখন জীবনকে উপভোগ করতাম। জীবনের ‘র্যাট রেস’ কী, তখনও বুঝতাম না। পাঠ্যবই জীবনের একমাত্র বিষয় ছিল না। বিভিন্নভাবে জীবনের আনন্দকে উপভোগ করতাম। সারা সপ্তাহ মঙ্গলবারের অপেক্ষা করতাম। সেদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি আসত। আমরা নতুন বই নিতাম। সপ্তাহজুড়ে আমরা সেই বই নিয়ে গল্প করতাম। কার বইয়ের গল্প কেমন, এসব নিয়ে আলোচনা হতো।
এভাবে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়।
দেখতে দেখতে আমাদের ছুটির ঘণ্টা বেজে গেল। মাধ্যমিকের পাঁচটা বছর অতিক্রম করে ফেললাম। স্মৃতিগুলো এখন উজ্জ্বল। স্কুলের বিদায় অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে, দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো বান্ধবীরা সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে কী কান্না। এইটুকুন জীবনে প্রথম এত বড় বিচ্ছেদের দুঃখ পেলাম!
তারপর... তারপর কত বছর কেটে গেল! কত গন্তব্যে হেঁটেছি আমরা। সেই বিচ্ছুদল ছড়িয়ে গেল দেশের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। নতুন কত বন্ধু পেলাম, কত বন্ধু হারালাম। কলেজ-ইউনিভার্সিটির বৃহৎ ক্যাম্পাসে কত দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। তবুও কোনো এক অবসরে মনে পড়ে সেই প্রাচীরঘেরা চারতলা স্কুল আঙিনা, ছোট্ট শান বাঁধানো পুকুরঘাট। সেই আমগাছ। আমাদের তৈরি করা ফুলবাগান। অনুপম রায়ের গানের ‘রামধনু, ঝালমুড়ি, হাফ টিকিট, আব্বুলিশ, বিটনুন আর চুরমুর’-এর মতো মনে পড়ে আমার স্কুলের সবকিছু।
এখনও যেন শুনি টিফিনের ঘণ্টা।
আর মনে পড়ে আমার সেই প্রাণের সখাদের। সবার একটি বেলা কাটানোর জন্য আমার মনটা হু হু করতে থাকে সময়ে সময়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান আমার কানে বাজে—
“আয় আর একটি বার
আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়
মোরা সুখের দুখের কথা কব
প্রাণ জুড়াবে তায়”