বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে উত্তর আমেরিকায় যখন ফিফা বিশ্বকাপের বাঁশি বাজে, তখন সেই সুরের আবেগময় প্রতিধ্বনি শোনা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসে ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়; এটি একটি মহোৎসব, এক পরম আবেগ আর চিরন্তন বন্ধুত্বের মেলবন্ধন। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ যেন রূপ নিয়েছে এক মিনি ফুটবল স্বর্গে।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর রাতগুলোতে পুরো ঢাবি ক্যাম্পাস মেতে ওঠে এক উৎসবের আমেজে। হাজী মুহম্মদ মুহসিন হলের মাঠ কিংবা টিএসসির সবুজ চত্বর—সবখানেই যেন শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড় আর আনন্দের ঢল। বিশাল বড় পর্দার সামনে খেলা দেখতে সন্ধ্যার পর থেকেই জড়ো হতে থাকে হাজার হাজার প্রাণোচ্ছল তরুণ-তরুণী। এই গ্রীষ্মের পড়ন্ত গরমে কিংবা মাঝে মাঝে বর্ষার রিনিঝিনি শব্দে, চারদিকের চায়ের কাপের ধোঁয়া, টং দোকানের সিঙাড়া আর বন্ধুদের আড্ডায় ক্যাম্পাস পরিণত হয় এক জীবন্ত গ্যালারিতে। আকাশী-সাদা কিংবা সবুজ-হলুদ জার্সিতে পুরো ক্যাম্পাস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়লেও, ম্যাচ শেষে সেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপ নেয় সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে।
ক্যাম্পাসের এই উন্মাদনাকে আরও সুসংগঠিত রূপ দিয়েছে বিভিন্ন সমর্থক গোষ্ঠী। এর মধ্যে অন্যতম 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্জেন্টিনা ঐক্য পরিষদ'। সম্প্রতি ৭৭৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশাল কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিয়েছে তারা। বিশ্বকাপ ঘিরে ইতোমধ্যে তারা ক্যাম্পাসে পতাকা টাঙানো, আনন্দ র্যালি এবং ফ্ল্যাশমবের মতো বর্ণাঢ্য আয়োজন সম্পন্ন করেছে।
সংগঠনটির লক্ষ্য ও কার্যক্রম সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্জেন্টিনা ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র হাসান জুবায়ের বলেন, "আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাবি ক্যাম্পাসে আর্জেন্টাইন ফুটবলের যে ক্রেজ, তা বিশ্ব দরবারে ফুটিয়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। ২০২২ থেকে ২০২৬ অবধি ঢাবিতে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সমস্ত উন্মাদনার প্রামাণ্য নথি আমরা আমাদের অফিশিয়াল পেজ 'ঢাবি আর্জেন্টিনা ঐক্য পরিষদ'-এ প্রকাশ করেছি। আমরা মূলত টিএসসি থেকে বুয়েন্স আয়ার্স পর্যন্ত আমাদের এই ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।"
ক্যাম্পাসে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ উদযাপনের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, "এবারের বিশ্বকাপ দারুণ উপভোগ করছি। ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা, তাই আগে থেকেই অনুমান করা যাবে না আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতবে কি না। তবে আর্জেন্টিনাকে আপাতত ফাইনাল অবধি দেখছি, বাকিটা সময় বলবে। একজন নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক হিসেবে আমাদের হাতে চতুর্থ বিশ্বকাপের ট্রফি ওঠার প্রত্যাশা তো থাকবেই।"
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আপনারা শান্তির পথে থাকুন, টক্সিসিটি ছাড়াই বাস্তবতা মেনে নিন। পূর্বের আভিজাত্য নিয়ে গর্বের কিছুই নেই, যা সত্য, তা মেনে নিন।"
আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এমন উন্মাদনা ও কড়া বার্তার পর চুপ করে নেই লাতিন আমেরিকার আরেক পরাশক্তি ব্রাজিলের সমর্থকরাও। ক্যাম্পাসে সেলেসাওদের প্রতিনিধিত্ব করছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রাজিল ঐক্য পরিষদ, মিশন হেক্সা’। হল সংসদ, টিএসসি ইত্যাদি জায়গায় নানান কমিটির মাধ্যমে ব্রাজিল সমর্থকদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে এই সংগঠনটি। বিজয় মিছিল, জমকালো বাইক শোডাউন, বিশাল পতাকা উত্তোলন ও ব্যানার টাঙানোর মতো নানা কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নিজেদের সরব উপস্থিতি জানান দিচ্ছে তারা।
ব্রাজিলের এই ভক্তকূল মনে করে, ফুটবল একটি 'আর্ট' এবং সেই শিল্পের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হলো ব্রাজিল—ক্যাম্পাসে এই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই মূলত কাজ করে যাচ্ছে তারা। এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে নিজেদের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্রাজিল ঐক্য পরিষদ, মিশন হেক্সা-এর মুখপাত্র ফারিয়া মতিন ইলা বলেন, "ইতিহাস বলছে, এবার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতার সমূহ সম্ভাবনা বিরাজমান। কোচ আনচেলোত্তির ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং সেলেসাওদের ওপর বিশ্বাস রেখে আমরা আশাবাদী—এবার হেক্সা আসবেই।"
আর্জেন্টিনা ঐক্য পরিষদের মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে তিনি আরও বলেন, "আর্জেন্টিনা ঐক্য পরিষদের প্রতি আমাদের আহ্বান—তারা যেন উগ্র ন্যারেটিভ বিল্ড করা থেকে নিজেদের শুধরে নেয়। ফিফাকে কিনে বিশ্বকাপ সাজানোর যে নাটক তারা রচনা করছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা তাদের প্রিয় দলকে সততার সঙ্গে ফুটবল খেলার আহ্বান জানাচ্ছি।"
এই উৎসব, পাল্টাপাল্টি যুক্তি আর আকাশচুম্বী আনন্দের মাঝেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিবেশ, পড়াশোনা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাবি প্রশাসন এবার নিয়েছে এক যথাযথ উদ্যোগ। ক্যাম্পাসজুড়ে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বকাপ চলাকালীন বহিরাগতদের প্রবেশ ও যান চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। শাহবাগ, নীলক্ষেত, দোয়েল চত্বর কিংবা ফুলার রোডের মতো প্রধান প্রধান প্রবেশপথগুলোতে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্টিকারযুক্ত গাড়ি এবং জরুরি সেবার বাহনগুলোকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এই সুশৃঙ্খল ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো রকমের বহিরাগত বিশৃঙ্খলা ছাড়াই অত্যন্ত নিরাপদ পরিবেশে গভীর রাত পর্যন্ত প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করতে পারছে। যদিও বিস্তৃত এই ক্যাম্পাস সব সময় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মত অনেকের।
ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট, ইনকোর্স পরীক্ষার চাপ আর ক্যারিয়ারের হাজারো চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে ঢাবিতে শিক্ষার্থীরা মেতে ওঠে ফুটবলের সেরা উৎসবে। এখানে সিনিয়র-জুনিয়র ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে বসে গলা ফাটানো চিৎকার কিংবা প্রিয় দলের হারের বেদনায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার এই চিত্র তরুণদের জীবনকে করে তোলে আরও রঙিন। চার বছর পর পর আসা এই ফুটবল মহোৎসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে আজীবন এক সোনালি ও মধুর স্মৃতি হয়ে জমে থাকে।