ক্যাম্পাস

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়


  • চিররঞ্জন সরকার  |
  • প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০৮
আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়
মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা। ২০২৩ সাল। ছবি: লেখক বি: লেখক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫। সময়টা এমন এক যুগ, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে আজকের মতো ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, ক্রেডিট, সিজিপিএ, মুডল, গুগল ক্লাসরুম, এসব শব্দের সঙ্গে প্রতিদিন কুস্তি করতে হতো না। আমাদের জীবনে সিজিপিএ ছিল না, ছিল স্রেফ পাস-ফেল। অ্যাসাইনমেন্ট ছিল না, ছিল আড্ডায় কে কী বলল, তার ওপর পরদিন আরেক দফা তর্ক। প্রেজেন্টেশন ছিল না, ছিল মধুর ক্যান্টিনে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে বক্তৃতা। আর ক্রেডিট? সেটি ছিল দোকানের খাতায় চায়ের বাকি!

সত্যি বলতে কী, ক্লাস-পাঠ্যবইয়ের খুব একটা ধার আমরা ধারতাম না। বই পড়তাম, তবে পরীক্ষার বই কতটা আর মার্কস-লেনিন, সাহিত্য-সিনেমা, রাজনীতি-দর্শন কতটা, তার হিসাব করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল নয়, আমাদের আড্ডার ফলাফলই বরং ভালো হতো। পরীক্ষার খাতায় কত নম্বর পেয়েছি, তা আজ আর মনে নেই; কিন্তু কে কোন তর্কে কাকে ধোলাই দিয়েছিল, তার স্মৃতি এখনো টাটকা।

প্রথম কয়েক বছর ব্যস্ত ছিলাম ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। তখন ক্ষমতায় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আমাদের প্রধান কাজ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল করা, সমাবেশ করা, স্লোগান দেওয়া এবং মাঝেমধ্যে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে এমন দৌড় দেওয়া, যেন অলিম্পিকের ১০০ মিটারের ফাইনাল চলছে। পার্থক্য একটাই, অলিম্পিকে জিতলে মেডেল পাওয়া যায়, পুলিশের হাত থেকে বাঁচলে পাওয়া যায় শুধু হাঁপানি!

(এখানে পড়ুন: গণরুমের রাত) 

১৯৯০ সালে ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হলো। আমরা ভাবলাম, এবার বুঝি দেশ বদলে যাবে। তখনও আমাদের বয়স কম, ফলে আশাবাদ বেশি। পরে বয়স বাড়ল, আশাবাদ কমল, শুধু আড্ডার অভ্যাসটাই আর গেল না!

এর মধ্যেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে আরেক মহাপতনের ঢেউ উঠেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল। পূর্ব ইউরোপের একের পর এক দেশে সমাজতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটল। আমরা তখন সোভিয়েত মডেলের সমাজতন্ত্রের প্রবল সমর্থক। বলা যায়, মস্কোয় বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরতাম। মস্কোর আবহাওয়া বদলালে আমাদের মন খারাপ, মস্কোয় বরফ পড়লে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসে ঠান্ডা লাগত। গর্বাচভ কী করলেন, ইয়েলৎসিন কী বললেন, পেরেস্ত্রেইকা কোথায় গেল, গ্লাসনস্ত কেন এলো, এসব নিয়ে এমন আলোচনা করতাম যেন ক্রেমলিনের চাবি আমাদের কাছেই রাখা আছে।

আমাদের মধ্যে কেউ মস্কো যায়নি, কিন্তু মস্কোর রাজনীতি সম্পর্কে এমন জ্ঞান ছিল যে, ক্রেমলিনের লোকজনও হয়তো আমাদের মতামত নিত। পার্থক্য শুধু, তারা নেয়নি। না নেওয়াটা তাদের বড় ভুল ছিল। তারপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল। কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙন, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিপর্যয়, সব মিলিয়ে আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিতও বেশ কেঁপে উঠল। কারও কারও মনে হলো, বিপ্লব একটু পরে হবে। পরে বোঝা গেল, সেই পরে আর আসছে না!

ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলাম। কিন্তু রাজনীতি আমাদের ছাড়ল না। মাঠ থেকে রাজনীতি সরে এসে ঢুকে পড়ল আড্ডায়। গর্বাচভ, ইয়েলৎসিন, মার্কস, লেনিন, বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, সবকিছু নিয়ে তর্ক। অর্থাৎ মিছিল বন্ধ, কিন্তু মুখের মিছিল চলল পুরোদমে। আসলে আমাদের রাজনীতিটাও অনেকখানি ছিল আড্ডাবাজি। আমরা বিপ্লব করতাম মূলত কথায়। রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলাতাম চায়ের কাপে। এক টাকা দামের চা দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছিল। দুই টাকা দিয়ে এক কাপ চা দিয়ে শেষ। এখন চায়ের কাপ ১০ টাকা। যাহোক, কয়েক চামচ চিনিওয়ালা বিস্বাদ চায়ের কাপ হাতে বিশ্বব্যবস্থার সংস্কার করতাম। প্রয়োজন হলে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে সোভিয়েত অর্থনীতি পর্যন্ত সবকিছুর সমাধান দিয়ে দিতাম। শুধু নিজের পরীক্ষার সিলেবাসটা শেষ করতে পারতাম না।

হলের রুম ছিল আমাদের প্রধান আড্ডাখানা। এক রুমে ১৫ জন থাকতাম। সেখানে লেখাপড়া আর ঘুম ছাড়া প্রায় সবই হতো। তবে নিজের রুমে আড্ডা দিয়ে শান্তি পেতাম না। তাই তো আড্ডার জন্য এক রুম থেকে আরেক রুমে ছুটতাম। কখনও জগন্নাথ হলের মাঠে ঘাসের ওপর শুয়ে। রাত বাড়ত, গল্প বাড়ত, কথায় আবেগও বাড়ত; শুধু ঘরে ফেরার তাড়া বাড়ত না।

(এখানে পড়ুন: শীতের এক চাঁদনী রাতে ক্যাম্পাস)

আমাদের ঘড়ির কাঁটা ছিল একটু আলাদা ধরনের। সকাল মানে কখন উঠেছি তা নয়, কখন আড্ডা শুরু করেছি। দুপুর মানে খাওয়ার সময় নয়, আড্ডার বিষয় বদলের সময়। সন্ধ্যা মানে অন্ধকার নামা নয়, টিএসসিতে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু। আর রাত মানে ঘুম নয়, আড্ডার মূল অনুষ্ঠান। আমাদের সময় ঘড়ি ছিল, কিন্তু ঘড়ির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা ছিল না।

সকালে নাস্তা করতে করতে এক দফা আড্ডা দিয়ে যেতাম মধুর ক্যান্টিনে। সেখানে দুপুর পর্যন্ত আড্ডা। দুপুরে দল বেঁধে হলে ফেরা। খেতে খেতে আড্ডা, খাওয়ার পর আবার আড্ডা। বিকেলে গন্তব্য টিএসসি। সেখানে রাত পর্যন্ত আড্ডা। কখনও ছাত্র ইউনিয়নের অফিসে। সেখানেও রাজনীতি, সাহিত্য, সিনেমা, গান, প্রেম, মার্কসবাদ, ক্রিকেট, নারী, দুনিয়ার এমন কোনো বিষয় ছিল না, যা নিয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞ মতামত ছিল না।

আজকের দিনে যে বিষয়ে মানুষ গুগলে সার্চ করে, আমরা সে বিষয়ে তখন মুখ খুলেই বিশেষজ্ঞ হয়ে যেতাম। জ্ঞানের পরিমাণ হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল মহাসাগরের মতো। যে বিষয়ে কিছুই জানতাম না, সে বিষয়েই সবচেয়ে দৃঢ় মতামত দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল আমাদের। আজকের ভাষায় বললে, আমরা ছিলাম প্রাক-ফেসবুক যুগের কমেন্ট সেকশন। পার্থক্য শুধু একটাই, তখন আমাদের মন্তব্যের নিচে কেউ লাইক, লাভ বা হাহা দিতে পারত না। সামনে বসে সরাসরি গালি দিত!

আড্ডায় কেউ যদি বলত, আমি একটা বই পড়েছি, সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলত, বইটা বাজে। তৃতীয়জন বলত, লেখকই বাজে। চতুর্থজন বলত, লেখকের দর্শন ভুল। পঞ্চমজন তখনও বইটা পড়েনি, কিন্তু সে-ই সবচেয়ে বেশি জানত।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হতো, বইটি পড়া দরকার। তারপর সবাই মিলে বইটি না পড়েই তার ওপর আরও তিন ঘণ্টা আলোচনা হতো। এভাবেই আমরা জ্ঞানচর্চা করতাম। বই পড়া ছিল ঐচ্ছিক, বই নিয়ে মতামত দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। 

আড্ডাবাজদের সঙ্গীও আড্ডাবাজ। ফলে আমাদের আড্ডার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না। রাতে কখনও জিয়া হল, কখনও মুহসিন হল, কখনও জহুরুল হক হল, সলিমুল্লাহ হল, শহীদুল্লাহ হল। বুয়েট, মেডিকেল, সবখানেই পরিচিতজন ছিল। রাত বারোটার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সির মোড়েও আমাদের আড্ডা বসত। কারণ সেখানকার চায়ের দোকানগুলো সারা রাত খোলা থাকত।

আর আড্ডা কি চা ছাড়া হয়?

চা ছিল আমাদের আড্ডার জ্বালানি। চা যত পাতলা, তর্ক তত ঘন। এক কাপ চা সামনে রেখে এমন সব আলোচনা হতো, যেন জাতিসংঘ আমাদের পরামর্শ ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। দোকানদার মাঝেমধ্যে বিল চাইলে আমরা এমন মুখ করতাম, যেন সে ব্যক্তিগতভাবে বিপ্লবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। চায়ের বিল ছিল আমাদের আড্ডার একমাত্র বাস্তবতা। কারণ মার্কসবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সবকিছু নিয়ে যতই তর্ক করি না কেন, শেষে দোকানদারের কাছে গিয়ে পকেট হাতড়াতে হতো।

আমাদের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক বিশাল আড্ডাখানা। ছোট-বড় নানা গ্রুপ গোল হয়ে বসে আড্ডা দিত। ক্যাম্পাসে একটা প্রাণচাঞ্চল্য ছিল। হাসি ছিল, চিৎকার ছিল, গান ছিল, তর্ক ছিল, প্রেম ছিল, রাজনীতি ছিল। ক্যাম্পাসের বাতাসেও যেন কথাবার্তার শব্দ মিশে থাকত।

(এখানে পড়ুন: আড়াই দশক পরে উচ্চশিক্ষায় ফেরা) 

কেউ একা একা হাঁটলেও মনে হতো, তার মাথার ভেতরেও বুঝি একটা আড্ডা চলছে। কেউ একা হেঁটে হঠাৎ হেসে ফেললে আমরা ভাবতাম, নিশ্চয়ই কোনো মজার কথা মনে পড়েছে। আজকের দিনে কেউ একা হেঁটে হাসলে আমরা আগে ভাবি, ফোনে রিল দেখছে কি না!

গোলাগুলিও ছিল। সেটি আমাদের সময়ের ক্যাম্পাসের আরেক বাস্তবতা। কখনও কখনও গোলাগুলিতে আড্ডায় সাময়িক বিরতি পড়ত। সবাই একটু নিরাপদ জায়গায় সরে যেত। পরিস্থিতি শান্ত হলে আবার আড্ডা। যেন গোলাগুলি নয়, বৃষ্টি। একটু থামলেই খেলা আবার শুরু।

এখন ভাবলে বিষয়টি অদ্ভুত লাগে। যে ক্যাম্পাসে গুলি চলত, সেখানেই আবার হাসি-আনন্দে আড্ডা বসত। ভয় ছিল, কিন্তু ভয়কে সারাক্ষণ মাথার ওপর বসিয়ে রাখার অভ্যাস ছিল না। জীবনেরও তখন একটা জেদ ছিল, তুই গুলি চালা, আমরা একটু পরে আবার কথা বলব।

বিপদের মধ্যেও আড্ডা, অস্থিরতার মধ্যেও হাসি, রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বন্ধুত্ব, এটাই ছিল সেই সময়ের ক্যাম্পাসের চরিত্র। তখন জীবন খুব স্বচ্ছল ছিল না। প্রযুক্তিও ছিল না। মোবাইল ফোন ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের গভীর।

কার কী প্রেম, কার কী রাজনৈতিক মত, কে কোন সিনেমা দেখেছে, কে কোন বই পড়েছে, কার বাড়ি থেকে টাকা আসেনি, কে পরীক্ষায় ফেল করেছে, সবই ছিল সবার জানা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ছিল কম, কিন্তু একাকিত্বও ছিল কম। এখনকার ছেলেমেয়েদের হাতে স্মার্টফোন আছে, কিন্তু পাশের মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। আমাদের হাতে ফোন ছিল না, কিন্তু পাশের পাঁচজনের জীবনের সর্বশেষ আপডেট না জানা পর্যন্ত শান্তি ছিল না।

তখন বন্ধু মানে ফেসবুকের ফ্রেন্ড নয়। বন্ধু মানে রাত দুইটায় দরজা ধাক্কা দিয়ে বলা, চল চা খাই। বন্ধু মানে পকেটে টাকা নেই, তবু পাঁচজন মিলে চা খাওয়া। বন্ধু মানে পরীক্ষায় ফেল করলে আগে হাসাহাসি, পরে সান্ত্বনা, তারপর আবার আড্ডা। বন্ধু মানে প্রেমে ব্যর্থ হলে এমন সান্ত্বনা দেওয়া, যা শুনলে ফ্রয়েডও হয়তো নোট নিতেন।

তখন বন্ধুত্বের কোনো অ্যাপ ছিল না। ছিল দরজা। ছিল চায়ের দোকান। ছিল হলের করিডর। ছিল টিএসসির সিঁড়ি। আর ছিল একে অন্যের জীবনে অনধিকার প্রবেশের প্রায় সাংবিধানিক অধিকার।

বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছি প্রায় ৩১ বছর। চাকরি হয়েছে, সংসার হয়েছে, বয়স হয়েছে, চুল কমেছে, পেট বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়েছে, কেউ অবসর নিয়েছে, কেউ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু আড্ডার রোগ সারেনি। বরং বয়সের সঙ্গে রোগটি ক্রনিক হয়েছে।

আগে আড্ডা দিতে বসতাম চার ঘণ্টা। এখন বসি আট ঘণ্টা। আগে উঠে হাঁটতে পারতাম। এখন আড্ডা শেষে উঠতে গিয়ে হাঁটু, কোমর আর মেরুদণ্ডের সঙ্গে আলাদা আলাদা পরামর্শ করতে হয়।

তবু আড্ডা ছাড়ি না।

পুরনো মুখের অনেকেই এখনো আড্ডার সঙ্গী। আবার অনেক নতুন মুখও যোগ হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, বন্ধুবান্ধবের সন্তানরাও এখন আমাদের আড্ডার নতুন সঙ্গী। প্রজন্মের ব্যবধান আছে ঠিকই। তারা আমাদের মতো কথা বলে না, আমাদের মতো গান শোনে না, আমাদের রাজনৈতিক তর্কের অনেক কিছুই তাদের কাছে জাদুঘরের সামগ্রী। কিন্তু আড্ডার ডাক এলে তারাও এসে বসে।

বংশপরম্পরা বলে কথা!

আমাদের সন্তানরা হয়তো আমাদের রাজনৈতিক মত মানে না, আমাদের গান শোনে না, আমাদের সিনেমা পছন্দ করে না, আমাদের রসিকতাও সব সময় বোঝে না। কিন্তু আড্ডার ডাক এলে তারা ঠিকই এসে বসে। তারপর আমরা পুরনো দিনের গল্প শুরু করি। তারা মোবাইল হাতে নেয়। আমরা গল্প চালিয়ে যাই। মাঝে মাঝে তারা মাথা তোলে। আমরা বুঝি, গল্প জমেছে।

শেষ পর্যন্ত আড্ডাই টিকে থাকে।

৩১ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আছি। কিন্তু মনে হয়, আসলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িনি। শুধু জায়গাটা বদলেছে। মধুর ক্যান্টিনের টেবিল বদলে গেছে ড্রয়িংরুমের সোফায়, টিএসসির চায়ের কাপ বদলে গেছে রেস্টুরেন্টের কাপে, হলের রাতজাগা আড্ডা বদলে গেছে ফোনের গ্রুপকলে। কিন্তু আড্ডার প্রাণটি একই রয়ে গেছে।

আমরা তখন সময় কাটাতাম আড্ডা দিয়ে। এখন বুঝি, আড্ডা দিয়ে আমরা আসলে সময় কাটাইনি, জীবনটাই কাটিয়েছি।

আমাদের হয়তো সিজিপিএ খুব উজ্জ্বল ছিল না। ক্যারিয়ারও সবাই নিজের নিজের মতো করে গড়েছি। কেউ বড় চাকরি করেছি, কেউ ছোট; কেউ দেশ বদলেছি, কেউ ঠিকানা; কেউ চুল হারিয়েছি, কেউ কোমরের মাপ। কিন্তু একটা বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহে গোল্ড মেডেল পেয়েছি, মানুষের সঙ্গে মানুষ হয়ে থাকার বিষয়ে।

কারণ আমাদের সময়ে বন্ধু হারিয়ে যেত না। মানুষ হারিয়ে গেলেও আড্ডায় তার চেয়ারটা খালি থাকত। আর সেই খালি চেয়ার দেখলেই কেউ না কেউ বলত, ও থাকলে এখন কী একটা কথা বলত!

তারপর সবাই হেসে উঠত। আবার আড্ডা শুরু হতো। এটাই ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়। এটাই ছিল আমাদের যৌবন। আর সত্যি বলতে কী, এখনো আমরা বুড়ো হইনি। শুধু আড্ডার সময় একটু বেড়েছে। আগে দুপুরে শুরু করলে সন্ধ্যায় শেষ হতো। এখন দুপুরে শুরু করলে রাত নামে, রাত পেরোয়, তারপর কেউ একজন বলে, চলি? আরেকজন বলে, আর এক কাপ চা খেয়ে যাই। তারপর আরও এক ঘণ্টা। চা অবশ্য এখন ছোট কাপেই খাই। কারণ ডাক্তার গ্যাসের ওষুধ দিয়েছেন। কিন্তু তর্কের কাপ এখনো বড়ই আছে।

আড্ডা?

সে আগের মতোই নন-স্টপ। কারণ বয়স বাড়ে, চুল পাকে, হাঁটুতে ব্যথা হয়, চশমার পাওয়ার বাড়ে, দাঁত কমে, পেট বাড়ে, কিন্তু বাঙালির আড্ডার কোনো অবসর নেই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের থেকে বেরোয়নি।

আমাদের ভেতরে এখনো সেই মধুর ক্যান্টিন আছে, সেই টিএসসি আছে, সেই হলের ঘর আছে, সেই রাতজাগা চায়ের কাপ আছে। আর আছে সেই ভয়ংকর ব্যাধি, আড্ডা।

আড্ডাবাজের মৃত্যু হতে পারে।

আড্ডার নয়!



ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

         

  রেটিং: ৪.৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সোনালী দিনগুলি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সোনালী দিনগুলি

  • আহসান হাবিব, অধ্যাপক, বরগুনা সরকারি কলেজ|
  •  ২৭-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৭

মামা, সস দেন

মামা, সস দেন

  • আলমগীর হোসেন|
  •  ০৯-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

০

ঢাবি লাইব্রেরি: আমার কাটানো বছরগুলো

ঢাবি লাইব্রেরি: আমার কাটানো বছরগুলো

  • পূজা রানী প্রামানিক |
  •  ৩০-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

০

বাইরে ঝুম বৃষ্টি, হাতে গরম কফির মগ, আর রুমমেটরা মিলে গল্প

বাইরে ঝুম বৃষ্টি, হাতে গরম কফির মগ, আর রুমমেটরা মিলে গল্প

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২২-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৫

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

ঢাবিতে সোনাঝরা দিনগুলি

  • ঐশী কর্মকার|
  •  ০৭-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৫

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের নন-স্টপ আড্ডার বিশ্ববিদ্যালয়

  • চিররঞ্জন সরকার|
  •  ২৪-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: ক্যাম্পাস

৪.৫