অনেক বছর পর, যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “তোমার জীবনের সেরা সময় কোনটা?” আমি এক কথায় উত্তর দেব, “ঢাবি ক্যাম্পাসে আমার ফেলে আসা দিন, আমার বন্ধুরা, আমাদের সুখ-দুঃখ।” এই ক্যাম্পাসে কতশত স্মৃতি, কত সুন্দর সময় কাটিয়েছি... লিখতে গেলে ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারি না।
সুন্দর স্মৃতি বলতে প্রথমেই আমাদের সেন্টমার্টিন ট্যুরের কথা মনে হয়। ছোটবেলায় দারুচিনি দ্বীপ সিনেমা দেখে প্রথম স্বপ্ন দেখা শুরু, “একদিন আমিও বন্ধুবান্ধব নিয়ে একসাথে সমুদ্র দেখব।” সেটা যে এভাবে সত্যি হবে, কখনো আশা করিনি। ক্যাম্পাস জীবনের এটা বেস্ট মেমোরি।
আরেকটা স্মরণীয় দিন হলো প্রতিবছর সরস্বতী পুজো। ক্যাম্পাসে আসার আগে কখনো কল্পনাও করিনি, এত সাড়ম্বরে পুজোর আয়োজন করা যায়! সব মিলিয়ে দিনটা এত ভালো কাটে! ক্যাম্পাস ছেড়ে দিলে এই পুজোর দিনগুলো খুব মিস করব।
এছাড়া প্রতিবছর বইমেলা, ডিপার্টমেন্টের শাড়ি-পাঞ্জাবি ডে, সাংস্কৃতিক উৎসব, ব্যাচ ডে, নৌবিহার, র্যাগ ডে, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হুটহাট পাহাড়-সমুদ্রে ট্যুর, কালীপুজোয় বন্ধুদের নিয়ে পুরান ঢাকার আলো দেখতে বেরোনো, টিএসসিতে ফানুস ওড়ানো, দশ টাকার চা-চপ-সমুচা খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা, গান, হৈচৈ, বিভিন্ন প্রোগ্রামের রিহার্সাল, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের কনসার্ট—সব মিলিয়ে আলো ঝলমলে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এক কথায়, এই ক্যাম্পাসে উৎসব যেন লেগেই থাকে! একেক সময় মনে হয়, পড়াশোনাটাই যেন ‘অপশনাল’!
আমরা ক্যাম্পাসে এসেই পেয়েছি ঢাবির শতবর্ষ উদযাপন, ফুটবল বিশ্বকাপ। আলোতে রঙিন হয়ে ওঠা পুরো ক্যাম্পাস। কোথাও কোনো দুঃখের ছিটেফোঁটা নেই। রাত-বিরেতে হুটহাট ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো, বিশ্বকাপের সময় পুরো আলো ঝলমলে ক্যাম্পাসে একা হেঁটে বেড়ানো পথ, ‘ভাল্লাগছে না; চল বেরোই’—এই বলে রিকশায় চড়ে রাতের ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানো, পুরো ঢাকা শহর টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো, রাতবিরেতে চায়ের আড্ডা, রুমমেটদের নিয়ে আড্ডা, গল্প, হাসি, কান্না, মজা, কোনো এক পূর্ণিমা রাতে হলের মাঠে বসে গলা মিলিয়ে গান—সব ঝলমলে সুন্দর দিন! পৃথিবীটা সুন্দর!
ঢাবিতে পড়ার কোনো প্ল্যান ছিল না। মেডিক্যাল কোচিং করেছিলাম। শুরুতে কিছুটা আফসোস বা খারাপ লাগা থাকলেও, যত দিন যেতে লাগল, এই ক্যাম্পাস, ডিপার্টমেন্ট, হল—সবকিছু আপন হয়ে উঠতে লাগল। কতশত অচেনা মানুষ আপন হয়ে গেল! আমার মতো একটা ঘরকুনো, ‘আনসোশ্যা’ মেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ছটফটে, ঘুরে বেড়ানো, ‘সোশ্যাল’ মেয়ে হতে শিখে গেল। নিঃসন্দেহে এই ক্যাম্পাস, হল লাইফ আমাকে এই চার-পাঁচ বছরে যা কিছু দিয়েছে, ক্যাম্পাসে আসার আগে এসব হয়তো ভাবতেও পারিনি। কী করে স্বনির্ভর হতে হয় জীবনে সকল কাজে তা এই ক্যাম্পাস, হল আমায় শিখিয়েছে। কেমন করে পুরো বাংলাদেশ একটা পরিবার হয়ে এক ক্যাম্পাসে, এক হলে মিলেমিশে সুখ-দুঃখ ভাগ করে থাকতে পারে, ক্যাম্পাস জীবন সেই গল্প বলে!
এইসব রঙিন দিন কিছুদিন পর স্মৃতি হয়ে যাবে—এটা ভাবতেই কেমন যেন শূন্যতা অনুভূত হয়, অসহায় লাগে! তারপরই মনে হয়, এটাই তো জীবনের নিয়ম, প্রতি মুহূর্তে সামনে এগিয়ে যাওয়া। কতশত রঙিন মুহূর্ত ফেলে যাচ্ছি এই ক্যাম্পাসে! সব ‘হাসি-কান্না, হীরা-পান্না’। দিন কত রকমের গল্প যে বলে! কত রঙ-বেরঙের দিন মুহূর্তেই স্মৃতি হয়ে যায়, তাই না?