নাৎসিরা তাঁর নাম দিয়েছিল ‘মৃত্যুদেবী’। ওরা তাঁকে দলে ভেড়ানোর জন্য নানা রকম প্রলোভন দিয়েছিল। তাতে ব্যর্থ হয়ে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হয়েছিল। নাৎসিরা বলেছিল, ‘যদি তোমাকে ধরতে পারি, ৩০৯ টুকরো করব। তারপরে টুকরোগুলো বাতাসে ছুড়ে দেব।’
কার প্রতি নাৎসিদের এত ক্ষোভ? ইনি হচ্ছেন লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো। জার্মান নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়তে নামা দুই হাজারের অধিক রুশ নারী স্নাইপারের একজন। সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিতজন। পাভলিচেঙ্কোর অব্যর্থ বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিল ৩০৯ জন নাৎসি। এ কারণে তাঁকে ধরতে পারলে ৩০৯ টুকরো করার হুমকি দিয়েছিল জার্মানরা।
লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো। জন্ম তাঁর ১৯১৬ সালে ইউক্রেনের বেলায়া চের্কভ শহরে। ইউক্রেন তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ। ছেলেবেলা থেকে একটু ডাকাবুকো, একটু টমবয়। নিজেই জানিয়েছেন এ কথা। পাভলিচেঙ্কো ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পছন্দ করতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, মেয়েরা কোনোভাবেই কোনো দিক থেকে কম নয়।
বয়স ১৫ ছাড়ানোর আগে পাভলিচেঙ্কো পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন কিয়েভ শহরে। এখানে এসে ভর্তি হলেন দক্ষ শুটার হওয়ার ক্লাসে। অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে পেয়ে গেলেন সম্মানসূচক সার্টিফিকেট। ১৯৩৭ সালে কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে পড়তে শুরু করেন। ইচ্ছে ছিল শিক্ষক হবেন।
১৯৪১ সালের জুনে হিটলারের অপারেশন বারবারোসা শুরু হলে পাল্টে যায় পাভলিচেঙ্কোর জীবন। অপারেশন বারবারোসা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলার লক্ষ্যে নাৎসি বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতিসম্পন্ন ঝটিকা সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম। নাৎসি আগ্রাসনের খবর পেয়ে মনস্থির করে ফেলেন পাভলিচেঙ্কো। নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। সেখানে তাঁকে নেওয়া হয় নার্স হিসেবে। তিনি নার্স নয়, সমরে যোগ দিতে চেয়েছিলেন।
নাৎসি বাহিনীর দুই রুমানিয়ান দালালকে খতম করার দক্ষতা দেখিয়ে পাভলিচেঙ্কো রুশ লাল ফৌজের ২৫তম রাইফেল ডিভিশনে স্থান করে নেন। এবার মনমতো কাজ পেলেন তিনি। পাভলিচেঙ্কো লাল ফৌজের স্নাইপার হলেন। তখন তাঁর মতো দুই হাজারের অধিক নারী স্নাইপার ছিলেন লাল ফৌজে। এরা নাৎসিদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিলেন। এই নারীদের মধ্যে পাঁচশ জন যুদ্ধ শেষে জীবিত ছিলেন।
স্নাইপার হিসেবে পাভলিচেঙ্কো প্রথম পরিচিত পান ওডেসা নগরীকে নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচানোর লড়াইয়ের সময়। আড়াই মাসের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে তাঁর নিখুঁত নিশানার শিকার হয় ১৮৭ জন নাৎসি।
১৯৪১-এর অক্টোবরে লাল ফৌজ ওডেসার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে পাভলিচেঙ্কো তাঁর স্নাইপার সঙ্গীদের নিয়ে চলে যান সেভাস্তোপোলে। সেখানে পরের আট মাসে শিকার করেন ২৫৭ জন নাৎসি।
পাভলিচেঙ্কোর নিশানা যত নিখুঁত হতে থাকে, ততই তাঁকে দেওয়া হতে থাকে আরও বিপজ্জনক সব দায়িত্ব। প্রতিতি দায়িত্ব সাফল্যের সাথে পালন করে তিনি।
১৯৪২ সালের জুনে সেভাস্তোপোলে স্নাইপিং মিশনে থাকা অবস্থায় মর্টার গোলার আঘাতে গুরুতর আহত হন পাভলিচেঙ্কো। এরপর আর স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধের মাঠে নামা হয়নি তাঁর।
১৯৪২ সালের শেষ দিকে পাভলিচেঙ্কোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র যাতে জার্মানির বিরুদ্ধে দ্রুত আরও সেনা অভিযান শুরু করে, সে ব্যাপারে কাজ করতেই তিনি সেখানে যান। ফার্স্ট লেডি ইলিনর রুজভেল্টের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সফরে বের হন লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো।
যেকোনো কারণেই হোক, মার্কিন মিডিয়া তখন পাভলিচেঙ্কোর যথার্থ মূল্যায়নে ব্যর্থ হয়। তাঁর পরনের স্কার্টের লম্বা ঝুল, সাজগোজহীনতা, এসব নিয়ে অনেক পত্রিকা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক সাংবাদিক একবার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, যুদ্ধে ময়দানে নারীরা সাজগোজ করতে পারে কি না। পাভলিচেঙ্কো উত্তরে বলেন, ‘একটা লড়াইয়ের মধ্যে থাকার সময় নিজের নাকের চকচকানি নিয়ে মাথা ঘামায় এমন নারী কে আছে?’
অর্থহীন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে বিরক্ত পাভলিচেঙ্কো শিকাগোতে এক বক্তব্যে বলেন, ‘ভদ্রলোকেরা, আমার বয়স ২৫ বছর এবং আমি ৩০৯ জন দখলদারকে খতম করেছি। ভদ্রলোকেরা, আপনাদের কি মনে হচ্ছে না যে আপনারা আমার পেছনে খুব লম্বা সময় ধরে লুকিয়ে আছেন?’ শ্রোতারা বিপুল করতালির মাধ্যমে এই বক্তব্য গ্রহণ করেন।
যুদ্ধ শেষে আবার পড়ালেখায় ফিরে যান পাভলিচেঙ্কো। যুদ্ধকালীন বীরত্বের জন্য তিনি দুইবার সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘অর্ডার অব লেনিন’ লাভ করেন। এ ছাড়া তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ প্রদান করা হয়।
১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর মস্কোতে এই বীরের মৃত্যু হয়।