আর্জেন্টিনার রাজধানী শহর বুয়েনোস আইরেস। এই শহরের মূল কেন্দ্র বা সিটি স্কোয়ার ‘প্লাজা দে মায়ো’। চারপাশে গাছগাছালি, মানুষের ব্যস্ততা আর পুরোনো ভবন মিলিয়ে অন্য যেকোনো সিটি স্কোয়ারের মতোই একটি জায়গা এটি।
একসময় প্রতি বৃহস্পতিবার এই চত্বরের চেহারা অন্যরকম হয়ে যেত। মাথায় সাদা ওড়না আর হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে কিছু নারী এসে দাঁড়াতেন এই প্লাজায়। কারও হাতে মানুষের নাম, কারও হাতে মানুষের ছবি। আর মুহূর্তেই যেন চিরচেনা চেহারা বদলে যেত! তাঁরা আসতেন তাঁদের সন্তানদের জন্য, যাদের রাষ্ট্র গুম করেছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের শাখারভ পুরস্কারের তথ্যভাণ্ডার ও হিস্ট্রি ডট কম অবলম্বনে একদল মায়ের অসম্ভব সাহসের গল্প পড়ুন জীবনজয়ীতে।
১৯৭৬ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা নেয় সামরিক জান্তা। এই সরকারের আমলে শুরু হয় ‘গুয়েরা সুসিয়া’ (Guerra Sucia) বা ‘নোংরা যুদ্ধ’। এই যুদ্ধ কোনো বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না। যুদ্ধটা ছিল দেশের মানুষের বিরুদ্ধে।
সে সময় সরকার যাদের বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী, রাজনৈতিক বিরোধী কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষের লোক মনে করত, তাদের রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হতো। তারপর আটক, নির্যাতন, শেষে হত্যা। আটক হওয়া লোকেরা বাড়ি ফিরে আসতেন না। কোনো হদিশ পাওয়া যেত না। লাশ পাওয়া যেত না। হয়তো কোনো কবরও দেওয়া হতো না। সরকারি কাগজপত্রে তাঁদের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন রাখা হতো না।
সেই সব কাগজপত্র থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া হতভাগা মানুষগুলোকে বলা হয় ‘দেসাপারেসিদোস’ (Desaparecidos), যার অর্থ নিখোঁজ মানুষ।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দুঃস্বপ্নের মতো এই সময়ে আর্জেন্টিনায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। নির্যাতন, গুলি, এমনকি হেলিকপ্টার থেকে সমুদ্রে ফেলে মানুষ হত্যা করা হয়েছে এই পর্বে।
হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবার একসময় উঠে দাঁড়ায়।
জান্তা যখন বলল, ‘তারা নেই’, তখন পরিবারগুলো বলল, “তারা ছিল। আমরা তাদের খুঁজব।”
১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল কয়েকজন মা শহরের মূল কেন্দ্র প্লাজা দে মায়োতে এসে জড়ো হন। এরপর থেকে তাঁরা নিয়মিত সেখানে উপস্থিত হতে থাকেন। তাঁদের দাবি ছিল একটাই: আমাদের সন্তানদের কী হয়েছে, তা আমাদের জানাতে হবে।
তখন আর্জেন্টিনায় প্রকাশ্যে কথা বলা ছিল বিপজ্জনক। কিন্তু এই মায়েরা থামলেন না। ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করেই তাঁরা প্রতি বৃহস্পতিবার জড়ো হতে থাকলেন।
সরকার প্রথমে তাঁদের উন্মাদ হিসেবে প্রচার করে গুরুত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাঁদের বলতে লাগল ‘লাস লোকাস’, মানে উন্মাদ মহিলারা।
সরকার যতই এই মায়েদের উপেক্ষা করতে চাইল, ততই তাঁরা দৃশ্যমান হয়ে উঠলেন।
সত্য প্রতিষ্ঠায় এসব ‘উন্মাদ মহিলা’ তেমন "কিছুই করেননি", শুধু প্রতি সপ্তাহে একই জায়গায় এসে একই প্রশ্ন করেছেন, “আমার সন্তান কোথায়?”
১৯৭৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আজুসেনা ভিলাফ্লোরকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। এরপর আন্দোলনের আরও কয়েকজন প্রতিষ্ঠাতাকেও অপহরণ করা হয়। একইভাবে তাঁরাও আর ফিরে আসেননি।
তবুও প্লাজা দে মায়োর মায়েরা থামেননি। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। সারা বিশ্বের চোখ তখন আর্জেন্টিনার দিকে। সে সময়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগকে কাজে লাগিয়ে এই মায়েরা নিজেদের সন্তানদের গল্প বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে থাকেন।
রাষ্ট্রের হুমকি আর পুলিশের হামলা, কোনো কিছুই তাঁদের আন্দোলনকে থামাতে পারেনি।
বরং আস্তে আস্তে তাঁদের আওয়াজ দূর থেকে আরও দূরে পৌঁছে যেতে থাকে।
১৯৮১ সালের ৯ ডিসেম্বর মায়েরা আয়োজন করেন প্রথম মার্চা দে লা রেসিস্তেন্সিয়া (Marcha de la Resistencia), অর্থাৎ প্রতিরোধের পদযাত্রা। এটি ছিল টানা ২৪ ঘণ্টার প্রতিবাদ কর্মসূচি। পরে এটি বাৎসরিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পরিণত হয়।
এই কর্মসূচির ফলে বড় এক পরিবর্তন ঘটে যায় আর্জেন্টিনায়।
নিখোঁজ সন্তানের মায়েদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করতে করতে মানুষের মন থেকে ভয় কেটে যেতে থাকে। প্রবল হতে থাকে জান্তাবিরোধী জনমত।
একসময় যে প্রশ্নটি ছিল কয়েকজন মায়ের ব্যক্তিগত কষ্ট, সেটিই আর্জেন্টিনায় হয়ে উঠল একটি জাতীয় প্রশ্ন: রাষ্ট্রের হাতে নিখোঁজ হওয়া মানুষদের কী হয়েছিল?
আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রীয় গুমের আরেকটি মর্মান্তিক দিক ছিল।
নিখোঁজদের মধ্যে ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও। তাঁদের অনেককে সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত জীবিত রাখা হয়েছিল। সন্তান জন্মের পর ওইসব মায়েদের হত্যা করা হয়। আর সদ্যোজাত শিশুদের অন্য পরিবারে দিয়ে দেওয়া হয়।
প্রায় ৫০০ শিশুকে তাঁদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য পরিবারে দেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। অনেক শিশুর জন্মপরিচয় মুছে ফেলা হয়। কিছু শিশুকে পাঠানো হয় আশ্রয়কেন্দ্রে, আর কিছু শিশুকে কালোবাজারে পাচার করা হয়।
এসব খবর ফাঁস হতে থাকলে মায়েদের আন্দোলনের একটি অংশ হয়ে উঠল দাদিদের আন্দোলন। তাঁদের প্রশ্ন তখন আর শুধু “আমার সন্তান কোথায়?” নয়। নতুন প্রশ্ন যোগ হলো, “আমার নাতি-নাতনি কোথায়?”
এভাবেই গড়ে ওঠে ‘প্লাজা দে মায়োর দাদিদের আন্দোলন’।
১৯৮৩ সালে সামরিক শাসনের অবসান হয় আর্জেন্টিনায়। গণতন্ত্র ফিরে আসার পর হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু হয়। ১৯৮৪ সালে মার্কিন জেনেটিক বিজ্ঞানী মেরি-ক্লেয়ার কিং এই খোঁজাখুঁজির কাজে যোগ দেন। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ ব্যবহার করে তিনি দাদি ও হারিয়ে যাওয়া নাতি-নাতনিদের জেনেটিক সম্পর্ক শনাক্ত করার পদ্ধতি তৈরি করেন।
পরবর্তীতে আর্জেন্টিনার জাতীয় জেনেটিক ডেটাবেস গড়ে ওঠে। এই প্রচেষ্টায় বহু চুরি হয়ে যাওয়া শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
কুখ্যাত ‘নোংরা যুদ্ধ’-এর অপরাধীদের বিচার শুরু হয় সামরিক জান্তার পতনের পর। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১,১০০ ব্যক্তি বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
১৯৯২ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এই মায়েদের সংগ্রামকে ‘সাখারভ পুরস্কার’ দিয়ে স্বীকৃতি দেয়। আজও প্লাজা দে মায়োতে দেখা যায় আন্দোলনকারী মায়েদের সাদা ওড়না। জীবিত মায়েরা এখনো প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে আসেন। কারও হাতে থাকে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের নাম, কারও হাতে ছবি, কারও কাছে কয়েক দশক পুরোনো স্মৃতি।