মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের মন্টগোমারি শহর। সারাদিন দর্জির কাজ শেষে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন ৪২ বছর বয়সী এক নারী। তাঁর নাম রোজা পার্কস। দিনটি ছিল ১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর। সেদিন রোজা পার্কসের একটি সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল অনেকখানি। সিভিক্স ফর লাইফ, কিং ইনস্টিটিউট ও ব্রিটানিকা অবলম্বনে রোজা পার্কসকে নিয়ে পড়ুন জীবনজয়ীর প্রতিবেদন।
তৎকালীন
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, বাসের
সামনের আসনগুলো শ্বেতাঙ্গ এবং পেছনের আসনগুলো
কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত ছিল।
শ্বেতাঙ্গদের আসন পূর্ণ হয়ে
গেলে কৃষ্ণাঙ্গ যাত্রীদের আসন ছেড়ে দিতে
হতো। সেদিনও একপর্যায়ে বাসের শ্বেতাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত আসনগুলো
পূর্ণ হয়ে যায়। চালক
চারজন কৃষ্ণাঙ্গ যাত্রীকে আসন ছেড়ে দিতে
বলেন। তিনজন আসন ছেড়ে দেন।
কিন্তু রোজা পার্কস আসন
ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
কোনো
উচ্চবাচ্য না করে শান্ত
কিন্তু দৃঢ়ভাবে তিনি ‘না’ বলেন। রোজা
জানতেন, এর ফলে তাঁকে
গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়।
কিন্তু তিনি দমে যাননি
বা নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
রোজা
পার্কসের গ্রেপ্তারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে
পড়ে শহরজুড়ে। স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচক
ধারণা ছিল। ১৯৩২ সালে
বর্ণবাদবিরোধী কর্মী রেমন্ড পার্কসের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রোজা। এরপর
তিনি সামাজিক ও নাগরিক অধিকার
আন্দোলনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত
হন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৬
সাল পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন
ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব
কালার্ড পিপল (NAACP)-এর মন্টগোমারি শাখার
সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন।
রোজা
পার্কসের গ্রেপ্তারের খবরে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা
ফুঁসে ওঠে। দ্রুতই তারা
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু
করেন। এই মর্মে সিদ্ধান্ত
হয় যে, বৈষম্যমূলক আইন
রদ না হলে, কৃষ্ণাঙ্গরা
আর বাসে চড়বেন না।
৫ ডিসেম্বর ১৯৫৫ থেকে শুরু
হয় মন্টগোমারি বাস বর্জন আন্দোলন।
আন্দোলন পরিচালনার জন্য গঠিত হয়
মন্টগোমারি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। এর সভাপতি নির্বাচিত
হন তখনকার তরুণ ধর্মযাজক মার্টিন
লুথার কিং জুনিয়র।
আন্দোলনকারীদের
আহবানে সাড়া দিয়ে, অনেক
ভোগান্তি সহ্য করেও অসংখ্য
নারী-পুরুষ দীর্ঘ পথ হেঁটে যাতায়াত
শুরু করেন। অনেকে বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করেন। আন্দোলনকারীদের জন্য অন্য ধরণের
গাড়িতে যাতায়াতের একটি সংগঠিত ব্যবস্থাও
গড়ে ওঠে। প্রায় ৩৮১
দিন ধরে চলে এই
বাস বর্জন।
রোজা
পার্কসের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া
আন্দোলনটি প্রথমে ছিল স্থানীয়। তবে
ক্রমে এর রাজনৈতিক প্রভাব
জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। মন্টগোমারির বাসযাত্রীদের
বড় একটি অংশ ছিলেন
কৃষ্ণাঙ্গ। তাঁদের ব্যাপক বাস বর্জনের ফলে
বাস কোম্পানি বড় ধরনের অর্থনৈতিক
চাপের মুখে পড়ে।
অবশেষে
১৯৫৬ সালের ১৩ নভেম্বর মার্কিন
সুপ্রিম কোর্ট Browder v. Gayle মামলায় আলাবামা ও মন্টগোমারির বাসে
বর্ণভিত্তিক আসনবিন্যাসের আইনকে অসাংবিধানিক বলে রায় বহাল
রাখে। রায়টি সরাসরি মন্টগোমারি ও আলাবামার বাসব্যবস্থার
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। তবে এর
প্রভাব ছিল আরও বিস্তৃত;
এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য এলাকায় গণপরিবহনে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইকে উৎসাহিত
করে। ২০ ডিসেম্বর ১৯৫৬
থেকে বর্জন শেষ হয় এবং
মন্টগোমারির বাসে বর্ণভিত্তিক আসনব্যবস্থা
কার্যত শেষ হয়।
আন্দোলনের
সফলতার পর রোজা পার্কসকে
‘নাগরিক অধিকার আন্দোলনের জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তবে
আন্দোলনের পর রোজা পার্কস
ও তাঁর স্বামী অনেক
প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। তাঁরা দুজনই
চাকরি হারান এবং হুমকি ও
হয়রানির শিকার হন। মন্টগোমারিতে তাঁদের
কাজ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। তাঁদের
অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট
এতটাই গভীর হয় যে
১৯৫৭ সালে তাঁরা শহর
ছেড়ে ডেট্রয়েটে চলে যান।
নতুন
জায়গায় গিয়েও রোজা পার্কস নাগরিক
অধিকার ও সমাজসেবামূলক কাজে
যুক্ত থাকেন। ১৯৬৫ সালে তিনি
কংগ্রেস সদস্য জন কনিয়ার্সের দপ্তরে
কাজ শুরু করেন এবং
১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সেখানে
কর্মরত ছিলেন।
সমাজসেবামূলক
কাজের পাশাপাশি তরুণদের উন্নয়নের লক্ষ্যে রোজা পার্কস প্রতিষ্ঠা
করেন ‘রোজা অ্যান্ড রেমন্ড
পার্কস ইনস্টিটিউট ফর সেল্ফ-ডেভেলপমেন্ট’। প্রতিষ্ঠানটি কৃষ্ণাঙ্গ
তরুণদের কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের বিকাশে
কাজ করে।
সুদীর্ঘকালীন
অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রোজা পার্কস ১৯৯৬
সালে ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ এবং
১৯৯৯ সালে ‘কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডেল’ লাভ করেন।
২০০৫
সালের ২৪ অক্টোবর ৯২
বছর বয়সে এই অসাধারণ
মানুষটি মৃত্যুবরণ করেন।
রোজা
পার্কসের জীবনের এই গল্প আমাদের
মনে করিয়ে দেয়, সমাজে পরিবর্তনের
অংশীদার হওয়ার জন্য বিশাল কোনো
কর্মযজ্ঞে যুক্ত হতে হবে, এমন
কোনো কথা নেই। বরং
সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে
মিথ্যা বা ভুল বলার
দৃঢ়তাটুকুই যথেষ্ট। রোজা পার্কসের দৃপ্ত
‘না’ উচ্চারণ নিজের অধিকার ও আত্মমর্যাদার পক্ষে
এক ঐতিহাসিক অবস্থান।