অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন


  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা  |
  • প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ২৩:৩১
জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন
ছবি: জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট

মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে নতুনভাবে চিনতে শেখানো মানুষের নাম জেন গুডঅল। তিনি প্রথম বিজ্ঞানীদের সামনে প্রমাণ করেন, শিম্পাঞ্জিরাও হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহার করতে পারে, তাদেরও রয়েছে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, আবেগ ও জটিল সামাজিক সম্পর্ক। তাঁর গবেষণা শুধু প্রাণীবিজ্ঞান নয়, মানুষের বিবর্তন, আচরণ ও সহমর্মিতা সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিয়েছে। গবেষক, লেখক, পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী হিসেবে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বিজ্ঞান ও মানবিকতা একে অপরের পরিপূরক। 

আপনি জীবনে কোন পথে হাঁটতে চান? অন্য কারও তৈরি পিচঢালা পথে, নাকি নিজের কৌতূহলকে সঙ্গী করে নতুন পথ তৈরি করতে চান? নিজের জীবন নিজে গড়ে তোলা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও। চেনা রাজপথ ছেড়ে অজানা পথে হাঁটার সাহস সবার থাকে না। জেন গুডঅল সেই ব্যতিক্রমী মানুষদের একজন, যাঁর জীবন প্রমাণ করে, ইতিহাসের বড় অবদানগুলো প্রায়ই তৈরি হয় প্রচলিত পথের বাইরে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, সিএনবিসি, ব্রিটানিকা ও জেন গুডঅল ইনস্টিটিউটের তথ্য অবলম্বনে তাঁর জীবনকাহিনি।

শৈশবেই জন্ম নিয়েছিল স্বপ্ন

১৯৩৪ সালের ৩ এপ্রিল লন্ডনের হ্যাম্পস্টেডে ভ্যালেরি জেন মরিস-গুডঅল হিসেবে তাঁর জন্ম। বাবা মর্টিমার গুডঅল ছিলেন ব্যবসায়ী ও রেসিং কারচালক, আর মা মার্গারেট মাইফানওয়ে জোসেফ (ভ্যান নামে পরিচিত) ছিলেন ঔপন্যাসিক।

শৈশবেই জেনের জীবনে আসে একটি ব্যতিক্রমী উপহার। প্রচলিত টেডি বিয়ারের বদলে বাবা তাঁকে দেন ‘জুবিলি’ নামের একটি শিম্পাঞ্জি খেলনা। সেটিই যেন ভবিষ্যতের এক ইঙ্গিত হয়ে ছিল। বড় হতে হতে তিনি টারজান ও ডক্টর ডুলিটলের বই পড়ে আফ্রিকার বন্য প্রাণীদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একদিন আফ্রিকায় গিয়ে বন্য প্রাণীদের কাছ থেকে তাদের জীবন শেখা এবং সেই গল্প বিশ্বকে জানানো।

টাইপিংয়ের কাজ থেকে আফ্রিকার পথে 

পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু জেন থেমে থাকেননি। তিনি টাইপিং ও হিসাবরক্ষণ শেখেন, রেস্তোরাঁয় ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেন এবং নিজের উপার্জনের অর্থ জমিয়ে ২৩ বছর বয়সে কেনিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। 

নাইরোবিতে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত জীবাশ্ম নৃবিজ্ঞানী ড. লুই লিকির সঙ্গে। লিকি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণার বাইরে থাকার কারণেই জেন প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখতে পারবেন। তিনি তাঁকে সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন এবং পরে তানজানিয়ার গোমবে স্ট্রিমের বনে বন্য শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব দেন।

(এখানে পড়ুন: সান্তিয়াগো: এক একাকী যোদ্ধার লড়াই)

যে আবিষ্কার বদলে দিল বিজ্ঞানের ধারণা

১৯৬০ সালের ১৪ জুলাই জেন গোমবে স্ট্রিমে গবেষণা শুরু করেন। সে সময় নিরাপত্তার কারণে তাঁর মা-ও সঙ্গে ছিলেন। প্রথম কয়েক মাস ছিল অত্যন্ত কঠিন। শিম্পাঞ্জিরা তাঁকে দেখলেই পালিয়ে যেত, ম্যালেরিয়াসহ নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

অবশেষে তিনি ‘ডেভিড গ্রেবিয়ার্ড’ নামে পরিচিত এক শিম্পাঞ্জির আস্থা অর্জন করেন। একদিন তিনি দেখলেন, ডেভিড একটি ডাল থেকে পাতা ছিঁড়ে সেটিকে উইপোকা ধরার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই পর্যবেক্ষণ তৎকালীন বৈজ্ঞানিক ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়। খবর পেয়ে লুই লিকি লিখেছিলেন,

‘এখন আমাদের হয় হাতিয়ারের সংজ্ঞা বদলাতে হবে, না হয় মানুষের সংজ্ঞা বদলাতে হবে।’

জেন আরও দেখান, শিম্পাঞ্জিরা শুধু ফলমূল খায় না, দলবদ্ধভাবে শিকারও করে। সংখ্যার পরিবর্তে তিনি তাদের ফ্লো, ফিফি ও গোলাইয়াথের মতো নাম দেন। পরে চার বছরব্যাপী শিম্পাঞ্জিদের এক সহিংস সংঘাত নথিবদ্ধ করে তিনি দেখান, ভালোবাসা ও সহিংসতা—দুটিরই শিকড় মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসে নিহিত।


Image
ছবি: এআই

প্রচলিত বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান

১৯৬২ সালে স্নাতক ডিগ্রি ছাড়াই বিশেষ ব্যবস্থায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইথোলজি বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পান জেন। সেখানে অনেক গবেষক তাঁর সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, তিনি প্রাণীদের মধ্যে মানুষের আবেগ ও ব্যক্তিত্ব আরোপ করছেন।

কিন্তু জেন বিশ্বাস করতেন, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণই তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পরবর্তীকালে আধুনিক প্রাণী আচরণবিজ্ঞান তাঁর অনেক পর্যবেক্ষণকেই সত্য বলে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৬৬ সালে তিনি ডক্টরেট সম্পন্ন করেন।

গবেষণার পাশাপাশি তিনি ছিলেন অসাধারণ লেখক। তাঁর ৩২টি বইয়ের মধ্যে ইন দ্য শ্যাডো অব ম্যান  বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। শিশুদের জন্যও তিনি বহু বই লিখেছেন। জীবনের শেষদিকে প্রকাশিত দ্য বুক অব হোপ  কঠিন সময়ে আশাবাদ ধরে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।

গবেষক থেকে সমাজকর্মী

১৯৬৪ সালে তিনি বন্য প্রাণী আলোকচিত্রী ব্যারন হুগো ভ্যান লউইককে বিয়ে করেন। তাঁদের একটি ছেলে ছিল, যার ডাকনাম ছিল ‘গ্রাব’। পরে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হলেও পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। এরপর তিনি তানজানিয়ার জাতীয় উদ্যানের পরিচালক ডেরেক ব্রাইসসনকে বিয়ে করেন।

১৯৮৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বন উজাড় এবং গবেষণাগারে শিম্পাঞ্জিদের ওপর নির্যাতনের চিত্র দেখে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। পরে তিনি বলেছিলেন,

‘আমি সম্মেলনে গিয়েছিলাম বিজ্ঞানী হিসেবে, আর ফিরে এসেছিলাম একজন সমাজকর্মী হয়ে।’

১৯৭৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট। এরপর ১৯৯১ সালে মাত্র ১২ জন তরুণকে নিয়ে শুরু করেন ‘রুটস অ্যান্ড শুটস’ কর্মসূচি। বর্তমানে এটি বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশে তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাণীকল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করছে।

সহমর্মিতার বিস্তৃত পরিসর

জেন গুডঅলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর গভীর সহমর্মিতা। প্রাণীদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি নিরামিষভোজী হন এবং পরে ভেগান জীবনধারা গ্রহণ করেন। তিনি শিল্পভিত্তিক পশুপালন ও প্রাণীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বিরোধিতা করেছেন।

তবে তাঁর মানবিকতা শুধু প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তানজানিয়ায় ‘টাকারে’ (TACARE) কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, স্থানীয় মানুষের দারিদ্র্য দূর না করে প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্ভব নয়। নব্বই পেরিয়েও তিনি বছরে প্রায় ৩০০ দিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে মানুষকে পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিয়েছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি—

‘আমাদের প্রত্যেকেই প্রতিদিন কোনো না কোনো পরিবর্তন আনছি। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেমন পরিবর্তন আনতে চাই।’

(এখানে পড়ুন: সুলভ মূল্যে ওষুধের অধিকার আন্দোলন)

সম্মাননা ও উত্তরাধিকার 

জেন গুডঅল জাতিসংঘের Messenger of Peace হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে Dame Commander of the Order of the British Empire (DBE) উপাধিতে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, কিয়োটো প্রাইজ ও টেম্পলটন প্রাইজসহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন।

২০২৫ সালের ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে সফররত অবস্থায় ৯১ বছর বয়সে তিনি ঘুমের মধ্যেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। 

তাঁর চিন্তা ও কাজ আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।

জেন গুডঅল বলতেন,

‘মানবজাতি এখন এক দীর্ঘ, অন্ধকার সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে জ্বলছে একটি মাত্র তারা। সেই তারাটিই আশা।’

জেন গুডঅলের জীবন আমাদের শেখায়, পৃথিবী বদলানোর জন্য সব সময় বড় কোনো ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন কৌতূহল, ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং প্রচলিত পথের বাইরে হাঁটার সাহস। সেই সাহসই তাঁকে বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে অনন্য করে তুলেছে। তাঁর জীবন আজও নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষও পৃথিবীতে স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন।  


ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

 আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

  • নওসিন সাদিয়া|
  •  ১৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

  • স্বর্ণেন্দু দত্ত |
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২৫-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।