অসাধারণ সাধারণেরা

সান্তিয়াগো: এক একাকী যোদ্ধার লড়াই


  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা  |
  • প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৬, ০০:২৮
সান্তিয়াগো: এক একাকী যোদ্ধার লড়াই
ছবি: এআই

রোজকার জীবনের সবচেয়ে সহজ অথচ কঠিন সত্যটি কী? প্রতিদিন নিরলসভাবে নিজের কাজ করে যাওয়া। ফল না পেলেও হাল না ছাড়া। ভেঙে গেলেও মচকে না যাওয়া। এই সত্যের প্রতিমূর্তি যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস 'দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি'-এর সান্তিয়াগো। এক বৃদ্ধ জেলে, যার গল্প আমাদের শেখায় কীভাবে আত্মবিশ্বাস আর ধৈর্য হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিউবার এক ছোট্ট জেলেপল্লীতে বসবাস সান্তিয়াগোর। বয়স মধ্য আশি। শরীর ক্লান্ত। সঙ্গে ভাগ্যও যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। টানা চুরাশি দিন তার টোপে কোনো মাছ ধরা পড়েনি। গ্রামের লোকেরা তাকে অপয়া বলে। এমনকি তার মাছ ধরার একমাত্র সঙ্গী মানোলিনকেও তার বাবা-মা সান্তিয়াগোর সঙ্গে যেতে নিষেধ করে। তবু পঁচাশিতম দিনে সান্তিয়াগো প্রতিজ্ঞা করে। আজ সে মাছ ধরবেই। তাই সে একা যায় গভীর সমুদ্রে। প্রথমেই ধরা পড়ে একটি মাঝারি মাছ, যেটিকে সে টোপ হিসেবে রেখে দেয়। সমুদ্রের গভীরে যেতে থাকে সান্তিয়াগো। ডাঙা ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে একসময় হারিয়ে যায়। তার অনুভূতি বলে, আশেপাশে ঘুরছে এক বিশাল মাছ। সেই মাছটির অপেক্ষায় সে করতে থাকে। নিঃশব্দে। অসীম ধৈর্য ধরে। ঘণ্টা কয়েক পর, আরাধ্য সেই বিশাল মাছ অবশেষে টোপ গিলে মাথা তোলে। এক বিশাল মারলিন! দেড় হাজার পাউন্ডের দানব। সান্তিয়াগো জানে, এই মাছকে জয় করা মানে তার হারানো সম্মান ফিরে পাওয়া। তবু সে মাছটিকে শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। বলে, “তুমি আমার ভাই। কিন্তু আমি একজন জেলে। তোমাকে আমার মারতেই হবে।” একাকী বৃদ্ধ শক্তিতে মারলিনের সমকক্ষ নয়। মারলিন তাকে টেনে নিয়ে চলে তিন দিন তিন রাত। সান্তিয়াগো বড়শির সুতো হাতে, গভীর প্রতিজ্ঞা আর প্রতীক্ষায় অলক্ষে ভেসে চলতে থাকে। এরই মধ্যে তার ভেতরে জন্ম নেয় এক গভীর শ্রদ্ধা—মারলিনের অদম্য প্রাণশক্তির প্রতি, নিজেকে বাঁচাতে তার মরিয়া লড়াইয়ের প্রতি। অবশেষে ৮৭তম দিনে, ক্লান্ত মারলিনকে সে হারপুন দিয়ে বিদ্ধ করে। ব্যর্থতার নাগপাশ ছিঁড়ে জয় হয় সান্তিয়াগোর, তার হৃত আত্মগৌরব পুনরায় উদ্ধার হয়। জয়ের পরেও সান্তিয়াগোর লড়াই শেষ হয় না। ফেরার পথে, মারলিনের রক্তের গন্ধে হাঙ্গরের দল তেড়ে আসে। প্রথমদিকে সান্তিয়াগো প্রতিরোধ করে, হারপুন দিয়ে একেকটি হাঙ্গরকে বিদ্ধ করে সে। কিন্তু একসময় তার বৃদ্ধ শরীর হাল ছেড়ে দেয়, হারিয়ে ফেলে প্রতিরোধের অস্ত্র। এবার অসংখ্য হাঙ্গরের সামনে সে একা! তবুও হাল ছেড়ে দেবার পাত্র সে নয়। বৈঠার মাথায় ছুরি বেঁধে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। যতটা পারে লড়াই করে যায়! তবু শেষ পর্যন্ত ক্ষুধার্ত হাঙ্গরের ঝাঁকের মুখ থেকে মারলিনের শুধু কঙ্কালটাই বাঁচাতে সক্ষম হয় সে। সেটা সঙ্গে নিয়েই সান্তিয়াগো রাতে গ্রামে ফিরে আসে। ডিঙি নৌকায় পড়ে থাকে মারলিনের কঙ্কাল। নৌকাটি বেঁধে রেখে নিঃসঙ্গ বিজয়ীর বেশে সে ফিরে যায় নিজের কুটিরে। পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা দেখতে পায় সেই বিশাল কঙ্কাল—হাঙ্গরের নয়, মারলিনের। তারা বিস্মিত হয়! সান্তিয়াগোর বীরত্বে গ্রামবাসী এবার মুগ্ধ, প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু বৃদ্ধ সেসব কথা কিছুই জানে না, দীর্ঘ এক মরণপণ যাত্রা শেষে সে তখন বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। অনাগত দিনের জন্য নব-অপেক্ষা ও আশা নিয়ে সে স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমায় ঘুমের রাজ্যে। আর স্বপ্নে দেখতে থাকে আফ্রিকার সমুদ্রপাড়ের খেলে বেড়ানো সিংহদের। প্রকৃতপক্ষে হেমিংওয়ে এই গল্পে তুলে ধরেছেন মানুষের একাকী সংগ্রাম, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই, আর আত্মসম্মান রক্ষার অদম্য ইচ্ছাকে। মারলিন মাছটি শুধু একটি মাছ নয়—এটি জীবনের प्रतीक (প্রতীক)। যে জীবন বারবার ভাঙে, কিন্তু কখনো হার মানে না। এই গল্পের মূল শিক্ষা হলো, “একজন মানুষকে ধ্বংস করা যায়, কিন্তু তাকে হারানো যায় না।” যেটার প্রতিফলনই বারবার উঠে আসে বিশাল সমুদ্রের বুকে জীবনসায়াহ্নে থাকা বৃদ্ধ সান্তিয়াগোর প্রতিকূল পরিবেশে এক হার না মানা মানবের প্রতিমূর্তিতে। যে পদে পদে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, জয়ী হবার অদম্য এক ইচ্ছাশক্তি থেকে। গল্পে সান্তিয়াগোর মারলিন মাছটি শুধু একটি মাছ নয়, এটি জীবনের প্রতীক। শেষ পর্যন্ত হাঙ্গররা মাছটিকে খেয়ে ফেললেও, সান্তিয়াগো কিন্তু ব্যর্থ নয়। বরং, সে প্রমাণ করেছে যে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি এবং ধৈর্য যেকোনো বাধাকে অতিক্রম করতে পারে। সান্তিয়াগো আস্ত মাছটি নিয়ে ফিরতে পারেনি, কিন্তু সে ফিরেছে জীবনের কাছে জয়ী হয়ে। তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মগৌরবের জয়গানের সাথে সাথে গ্রামবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মানও সে আদায় করেছে। 


ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ৪.৭

এই বিভাগের আরও পোস্ট

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

 আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

  • নওসিন সাদিয়া|
  •  ১৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

  • স্বর্ণেন্দু দত্ত |
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

জীবনজয়ী জেন গুডঅল: প্রকৃতি, প্রাণী আর মানুষের সেতুবন্ধন

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ২৫-০৭-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।