অযোধ্যার কোতোয়াল পড়লেন পরমা সুন্দরী রহমতুল্লা বিবির প্রেমে। তিনি বিয়ে করতে চান রহমতুল্লা বিবিকে। চতুর্দশ শতাব্দীর দিল্লির বিখ্যাত সুফি সাধক খাজা নিজামুদ্দিন অওলিয়ার শিষ্য শেখ নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই-দিল্লির জন্ম হয়েছিল অযোধ্যায়। চিস্তি সম্প্রদায়ের অন্যতম সুফি সাধক তিনি। তাঁরই বোন এই রহমতুল্লা বিবি, যিনি বড়ি বুয়া নামেই পরিচিত। সুফি সাধনার আউলিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষেত্র হিসেবে অযোধ্যা পরিচিত ছিল। তাই অযোধ্যাকে ‘শহর-ই-আউলিয়া’ বা সুফিদের শহরও বলা হয়।
স্বাভাবিক ভাবেই বড়ি বুয়াকে বিয়ে করার বহু প্রস্তাব এসেছিল। তবে তিনি নিজেকে স্রষ্টার সাধনায় যুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোতোয়াল নাছোড়বান্দা। তাঁর প্রস্তাব ফেরানো অসম্ভব হয়ে উঠল। বড়ি বুয়া তখন কোতোয়ালের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। আহ্লাদিত কোতোয়াল দেখা করতে এলেন বড়ি বুয়ার সঙ্গে। বড়ি বুয়া তাঁকে প্রশ্ন করেন, আমাকেই কেন বিয়ে করতে চান? কোতোয়াল বললেন, বড়ি বুয়ার চোখ দুটির প্রেমে পড়েছেন তিনি। জবাব শুনে বড়ি বুয়া ঘরের ভেতরে চলে যান, নিজের চোখ দুটি উপড়ে কোতোয়ালের কাছে পাঠিয়ে দেন। বাকরুদ্ধ কোতোয়াল তাঁর পায়ে পড়ে ক্ষমা চান। সেই সময়ে বড়ি বুয়া অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইহাঁ না আলিম রহেগা, না জালিম রহেগা।’ অর্থাৎ অযোধ্যায় কোনো বিদ্বানও থাকবে না, কোনো অত্যাচারীও থাকবে না। অযোধ্যায় লোকমুখে বড়ি বুয়ার যে সব কাহিনী শোনা যায়, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে চমকপ্রদ।
বড়ি বুয়ার দরগা রয়েছে অযোধ্যা-ফৈজাবাদ সীমান্তের বেনীগঞ্জে। সাধারণত মহিলা সুফি সাধকদের দরগা খুবই কম। তার একটি অযোধ্যার এই বড়ি বুয়ার। আশপাশের আরও অবহেলিত কবরের মাঝে বড়ি বুয়ার দরগাটি চকচকে। মার্বেল, গ্রিলে সাজানো।
অযোধ্যার ব্যবসায়ী সতীশ সিং ঠাকুর আর প্যাটেল ডাক্তার মার্বেল লাগিয়ে দিয়েছেন। পাশের সুলতানপুরের বাক্সাওয়ালা গ্রিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন দরগা। বড়ি বুয়ার দরগায় এসে মনোকামনা পূর্ণ হওয়াতেই নাকি এই বন্দোবস্ত।
হ্যাঁ, অযোধ্যার সুফি দরগাগুলোতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ভিড় করেন। সেই কথায় যাওয়ার আগে বলে দেওয়া দরকার সাধু রামমঙ্গল দাসের কথা। সত্তরের দশকে অযোধ্যার বশিষ্ঠ কুণ্ডের গোকুল ভবন মঠের মহন্ত সাধু রামমঙ্গল দাস প্রথম বড়ি বুয়ার এই দরগা সংস্কার করে মেরামত করে দিয়েছিলেন। দরগার যে পাকা কাঠামো এখন দেখা যায়, সেটা বানিয়ে দিয়েছিলেন রামমঙ্গল দাসই।
একজন রামানন্দী সাধু কেন একটি দরগা বানাতে গেলেন? মন্দিরের বর্তমান প্রধানের জবাব, বড়ি বুয়ার সঙ্গে রামমঙ্গল দাসের ভালো সম্পর্ক ছিল! বড়ি বুয়া আর রামমঙ্গল দাস দুজনের অস্তিত্বের মধ্যে কয়েক শতকের ব্যবধান ছিল। রামমঙ্গল দাস তাঁর বইতে বড়ি বুয়ার দরগায় যাওয়ার কথা লিখে গেছেন। তিনি নাকি স্বপ্নে বড়ি বুয়ার দর্শন পেতেন! সাধু রামমঙ্গলের বই থেকে আসলে ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ হয়।
এই সমন্বয়ী সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন অযোধ্যার মানুষ। বড়ি বুয়ার দরগা শুধু নয়, অযোধ্যার প্রতিটি দরগাতেই এভাবেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে মানুষ যাতায়াত করেন। যেমন অযোধ্যার প্রাণকেন্দ্রে হনুমানগড়ি মন্দির থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে থানার পিছনে ন’গজী মাজার। সেখানে গেলে যে কোনো সময় হিজাব-বোরখা পরিহিতদের সঙ্গেই দেখা মিলবে সিঁদুর-শাখার নারীদেরও। সকলেই তাঁদের জীবনের নানা সমস্যার সমাধান চান। দরগার খাদিম তাঁদের নানা পরামর্শ দেন। তাঁরা মন শান্ত করে সেখান থেকে ফেরেন। বারবার ফিরে আসেন।
এই মাজারের দেখভাল করেন স্থানীয় বাসিন্দা ললিত যাদব। তাঁর সঙ্গে কিছু দিন আগে পর্যন্ত কাজ করতেন সন্তোষ সিং। এখন পাশের জেলার একটি ব্যাংকের চুক্তিভিত্তিক কর্মী। সপ্তাহে ছুটির দিন চলে আসেন। দরগায় আসা সকলের জন্য চা-পানি বা দুপুরের খাবারের আয়োজন সবই করেন ললিত-সন্তোষরাই।
তুলনায় বেশি পরিচিত ইব্রাহিম সাহিবের দরগা। শহরের সবচেয়ে অভিজাত ও বৃহৎ এই দরগা রয়েছে নাগেশ্বরনাথ মন্দিরের কাছে স্বর্গদ্বারে। প্রাচীন দরগাটি হজরত সৈয়দ শাহ মহম্মদ ইব্রাহিম সাহিবের সমাধি, যা অড়গড়া মাজার নামেই পরিচিত। অড়গড়া দরগা-সংলগ্ন এলাকায় বাস হিন্দুদের। প্রতিদিন এখানের হিন্দু-মুসলিম দোকানদারেরা দোকানের চাবি মাজারে রেখে সেজদা করেন, তারপর দোকান খোলেন। তাঁদের বিশ্বাস, এতে বেচাকেনা ভালো হবে। দরগার জমি নাকি হনুমানগড়ি মন্দির ট্রাস্টের। রজবের উরসের সময়ে হনুমানগড়ির ‘গদ্দিনশীন’ সাধু অন্যান্য সাধুদের নিয়ে যান ইব্রাহিম সাহিবের দরগায় চাদর চড়াতে।
শহরের অন্য অংশে শীষের মাজারের কাহিনীও এর থেকে ভিন্ন নয়। মণি পর্বতের পিছনে জঙ্গলঘেরা এলাকায় গণেশ কুণ্ডের কাছে এই মাজার। হিন্দুদের দাবি, লঙ্কা জয়ের পরে হনুমান এই মণি পর্বতেই নেমেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বলেন, এটা আদতে বৌদ্ধ স্তুপ। সম্ভবত সম্রাট অশোকের সময়ে তৈরি। এর পিছন দিকেই রয়েছে শীষ পীরের দরগা। রজবের সময়ে এখানে বিরাট উরসের উৎসব হয়। মেলা বসে। শুধু অযোধ্যা নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে তখন এখানে মানুষ ভিড় করেন। চব্বিশ ঘণ্টা লঙ্গর চলে। হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে খান।
পশ্চিমে যেমন মক্কা-মদিনা, তেমনই নানা পীরের জায়গা অযোধ্যাকেও একই রকম পবিত্র ধরা হয়। অযোধ্যাকে বলা হয় ‘খুর্দ মক্কা’। অর্থাৎ ছোট বা অর্ধেক মক্কা। সেই কারণে একসময়ে বহু মানুষ তাঁদের প্রিয়জনকে সমাধিস্থ করতেন অযোধ্যায়। এখনও অযোধ্যার চারদিকে এমনই বহু নাম-না-জানা মানুষের কবর মেলে।
ন’গজী মাজারের সাবেক খাদিম মহম্মদ আক্রম একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘উদার মুসলিমরা শ্রীরামকে অবতার মনে করেন।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, অযোধ্যাকে শুধু মন্দির-মসজিদের সংঘাত হিসেবেই দেখানো হলো। মানুষের ভালোবাসা, মেলামেশাটা বলা হলো না।