অসাধারণ সাধারণেরা

ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী


  • জীবনজয়ী ডেস্ক   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৫
ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী
ফটো: ওসিওলা ম্যাককার্টি হাউস

ওসিওলা ম্যাককার্টির জন্ম ১৯০৮ সালে। আমেরিকার মিসিসিপিতে। তাঁর মা কাজ থেকে ফেরার পথে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছিলেন। ম্যাককার্টি এভাবেই পৃথিবীতে আসেন। জীবিকার প্রয়োজনে মা লুসি জিমারম্যান নানা শহরে কাজে থাকতেন। ম্যাককার্টিকে লালনপালন করতেন তাঁর নানী জুলিয়া স্মিথ ও আন্টি ইভালিন ম্যাককার্টি। প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মধ্যে এই তিন কৃষ্ণাঙ্গ নারী জীবন চালাতেন। এরা অন্যের ঘরবাড়ি পরিষ্কার, রান্নাবান্না ও কাপড়চোপড় ধোয়ার কাজ করতেন।

একবার কাজ করতে গিয়ে ইভালিন আহত হয়ে হাসপাতালে যান। কিছুদিন পরে বাড়িও ফেরেন। কিন্তু তিনি আর ঘরের বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করার মতো শারীরিক অবস্থা ফিরে পাননি। এমতাবস্থায় ওসিওলার শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যায়। তিনি তখন মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। এখান থেকে শুরু হয় ওসিওলার কর্মজীবন, যা চলে তাঁর ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত। ১৯৯৫ সালে ওসিওলা তাঁর কর্মজীবন শেষ করেন।

(এখানে পড়ুন: স্ট্যানলি অ্যান ডানহাম: কেবল ওবামার মা নন)

সুদীর্ঘ কর্মজীবনে একটি পেশাকেই ধরে রেখেছিলেন ওসিওলা। তিনি মূলত মানুষের কাপড় ধোয়ার কাজ করতেন। বাড়ি বাড়ি থেকে মানুষের অপরিষ্কার কাপড় সংগ্রহ করে, সেগুলো নিজস্ব উপায়ে যত্নের সাথে পরিষ্কার ও ইস্ত্রি করে দিতেন। স্বাভাবিক ভাবেই জীবনে কখনো বিলাসিতার মুখ দেখেননি ওসিওলা। ১৯৬০-এর দশকের মধ্যে মা-নানীরা সবাই মারা যাবার পর থেকে তিনি একাই জীবন কাটাতেন।

ওসিওলার জীবনের গল্প এভাবে শেষ হলে, এর মধ্যে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কিছু হয়তো থাকত না। বিশ শতকে নিম্নআয়ের আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলোতে এমন একটি চরিত্র খুব ব্যতিক্রমী কিছু ছিল না। কিন্তু ওসিওলা ম্যাককার্টি আর দশজনের মতো করে নিজের জীবনটাকে গড়ে তোলেননি।

শিশুকাল থেকে ওসিওলা বুঝেছিলেন যে জীবন তাঁর জন্য দু’হাত বাড়িয়ে রাখেনি। তিনি বুঝেছিলেন যে বাঁচতে হলে তাঁকে লড়তে হবে। এই ভাবনা থেকে সম্ভবত শিশু ওসিওলা কর্মসংস্কৃতির মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন যে এক সময় তিনি একটানা তিন দিন পর্যন্ত কাজ করতেন। সে আমলে কাপড় ধোয়ার কাজে কী-ই বা এমন পয়সা পাওয়া যেত! একটা পর্যায়ে এসে কাপড় ধোয়ার নানা যন্ত্র বাজারে চলে এলে ম্যাককার্টির আয় স্বভাবতই কমতে থাকে।

এই প্রতিকূলতার মধ্যেও একাগ্র মনে কাজ করে যান ম্যাককার্টি।

কাজের সাথে সাথে আরেকটি কাজ তিনি করতেন। সামান্য আয় থেকে যত সামান্য সম্ভব জীবন চালিয়ে, বাকি টাকা তিনি ব্যাংকে জমা করতেন। সঞ্চয়ের এই অভ্যাস ওসিওলা গড়ে তুলেছিলেন শৈশবেই। প্রথমবার হাতে কিছু টাকা জমা হলে, বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ব্যাংকে গিয়ে টাকাটা জমা করেছিলেন। সেই শুরু। এই সঞ্চয় আর কখনো থামাননি তিনি।

(এখানে পড়ুন: ছাড়া পেয়ে পাখি শূন্যে উড়াল দেয়) 

১৯৯৫ সালে অবসর নেয়ার পরে ব্যাংক ওসিওলা ম্যাককার্টিকে তাঁর জমা টাকার পুরো হিসাব দেয়। দেখা যায়, সারা জীবন কয়েকটি ডলার ও কয়েন জমা করতে করতে, দুই লাখ ৮০ হাজার ডলারের এক সঞ্চয় গড়ে তুলেছেন তিনি!

ওসিওলা ম্যাককার্টির কাহিনি এখানে শেষ হলেও পারতো। লোকে তাঁর জীবন থেকে এই শিক্ষা নিতে পারতো যে সঞ্চয়ের সু-অভ্যাস থাকলে একাকী একজন মানুষকে শেষ জীবন নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করতে হয় না।

কিন্তু ওসিওলা তাঁর জীবনের গল্প এখানে শেষ করেননি। তিনি আজীবনের কষ্টে জমানো সঞ্চয়ের বড় অংশ জনহিতৈষী কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। খুব দূরে কোথাও যাননি ওসিওলা। তিনি সঞ্চয়ের বেশির ভাগ অর্থ, অর্থাৎ এক লাখ ৫০ হাজার ডলার, ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন মিসিসিপির অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি হিসাবে দান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সাউদার্ন মিসিসিপি ক্যাম্পাস হ্যাটিসবার্গ শহরে ওসিওলার বাসস্থান থেকে মাত্র কয়েকটি ব্লক দূরে অবস্থিত। জীবনে কোনো দিন সেখানে যাবার সুযোগ হয়নি তাঁর। কিন্তু কষ্টের সঞ্চয় কোথায় গেলে ঠিকঠাক কাজে লাগবে, তা তিনি ঠিক বুঝেছিলেন।

ওসিওলা ম্যাককার্টির এই দানশীলতার খবর বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানতে পেরে ছয়শ জনের বেশি মানুষ নিজেদের এই উদ্যোগে যুক্ত করেন। তারা ম্যাককার্টির দেয়া অর্থের সঙ্গে আরও তিন গুণ অর্থ যোগ করেন।

ওসিওলা ম্যাককার্টি ফান্ডটি এখনো চালু আছে। ২০২৫ সালে সাউদার্ন মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, এই ফান্ডের টাকা সুদে-আসলে বেড়ে এক মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। 

(এখানে পড়ুন: অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া) 

কৃতজ্ঞ দেশবাসী এই শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে নানাভাবে সম্মান দেখিয়েছে। ১৯৯৮ সালে তাঁকে প্রেসিডেনশিয়াল সিটিজেনস মেডেল দেয়া হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ওসিওলা ম্যাককার্টিকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৮ সালে খোদ সাউদার্ন মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে এটি প্রথম সম্মানসূচক ডিগ্রি।

১৯৯৬ সালে এই মহিয়সী নারী মারা যান। 


ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী

ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ১৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

০

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫

 আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

আর্জেন্টিনা: প্লাজা দে মায়োর মায়েরা

  • নওসিন সাদিয়া|
  •  ১৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

অযোধ্যা: শহর-ই-আউলিয়া

  • স্বর্ণেন্দু দত্ত |
  •  ১০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

ক্রিস্টোফার ম্যাকক্যান্ডলেস: নিঃশব্দে প্রকৃতির পথে

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ০৫-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫