আমি মোঃ জাহেদ আলম। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস। তৃতীয় সপ্তাহের ঘটনা। আমরা যাচ্ছি জাপান থেকে ইরানের দিকে। আমাদের জাহাজের নাম এম ভি মারসানা।
জাপান উপকূল ছাড়ার তিন-চার দিন পরের কথা। আমার ডিউটি চলছিল। সময় তখন রাত আটটার কাছাকাছি। আমি ইঞ্জিন রুম থেকে ডেকে এসে একটু ঘোরাঘুরি করছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার অ্যাকোমোডেশনের পাশেই একটি বকজাতীয় পাখি। একটু অন্ধকার ছিল তখন; তবে খুব বেশি নয়। তেমন কিছু চিন্তা-ভাবনা না করেই, বকটিকে আমি খপ করে ধরে ফেললাম। ধরা মাত্র আমার মাথায় একটা চিন্তা ভর করল। আগামীকালই আমি এটাকে জবাই করে খাব। ভাবনামতো কাজ। আমার রুমের ওদিকে একটা ছোট বাড়তি রুম ছিল। বকটাকে সে রুমে নিয়ে রাখলাম। একটু পানিও দিলাম। তারপরে কাজে ফিরলাম।
সকালবেলা আমি বক নিয়ে যাই চিফ কুকের কাছে। উদ্দেশ্য জবাইয়ের বন্দোবস্ত করা। ঠিক সে সময় আমাকে দেখতে পেলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন সাহেব। তখন আমি বকটাকে জবাই দিতে উদ্যত।
আমার কাজ দেখে হাহাকার করে উঠলেন ক্যাপ্টেন, “আরে ভাই, কী করেন! কী করেন!”
আমি বললাম, “ভাই, গত রাতে আমি এটাকে পেয়েছি। এখন জবাই করে খাব।”
ক্যাপ্টেন বললেন, “কী বলেন আপনি! না না না! এই পাখিটা আমাদের কাছে এসে আশ্রয়ের আশায়। আপনি একে ছেড়ে দেন। এ সেই সুদূর কোনো এক দেশ থেকে এখানে এসে পড়ছে। দেখেন তো কোথাও কোনো পাহাড় নাই, মাটি নাই। কে জানে কেমন করে আমাদের কাছে আসছে আশ্রয় নিতে। আপনি একে খেয়ে ফেললে কেমন হয় ব্যাপারটা!”
আমার তখনও দোনোমনা মন। কিন্তু ক্যাপ্টেন সাহেব ছাড়লেন না। তিনি বারবার একই কথা বলতে থাকলেন। কী আর করা—একপর্যায়ে আমি বকটিকে ছেড়ে দিই। ছাড়া পেয়ে পাখি শূন্যে উড়াল দেয়। এদিকে আমার মনে তখন অনেক রাগ জমে উঠেছে। আমার বক আমি খাব, তাতে ক্যাপ্টেনের কী?
পরের দিন সকালে নাস্তা করতে গেলাম ক্যান্টিনে। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দেখা।
তিনি বললেন, “পাখিটাকে ছেড়ে দিতে বলায় আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছিলেন?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমার রাগ হয়েছিল। আপনি আমার পাখি আমাকে খেতে দিলেন না, এটা ভেবে আমার রাগ হয়েছিল। তবে জানেন, রাতে বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে আমার মনের মধ্যে একটা পরিবর্তন চলে এসেছিল।”
“সেটা কী রকম?”, ক্যাপ্টেন জানতে আগ্রহী হলেন।
“আপনি বলেছিলেন পাখিটা তো আমাদের কাছে আশ্রয়ের জন্য এসেছে। আমি যদি একে খেয়েই ফেললাম, তাইলে আমরা একে কী সহায়তা দিলাম? এই কথাটা ভাবতে ভাবতে আমার মনে অনেক অনুশোচনা আসল। আমি ভাবলাম, হায়রে, পাখিটা আসল আশ্রয় পেতে, আর আমি একে খেয়ে ফেলতে যাচ্ছিলাম। আমার অনেক খারাপ লাগতে থাকল। আমি বারবার আল্লাহর কাছে মাফ চাইলাম।”
ক্যাপ্টেন সাহেব আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
আমার মনের মধ্যে জমে থাকা আরো কথা মুখে আনলাম।
“আমি আল্লাহর কাছে মাফ চেয়েছি। বলেছি, আল্লাহ, এটা তো আমার একদম ঠিক হয়নি। আমি পাখিটারে খেয়ে ফেলতে চাইছিলাম। আমি যদি একে খেয়ে ফেলতাম তাহলে কী হতো! এসব ভাবতে ভাবতে আমার চোখ ভিজে দিয়েছিল।”
কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। ঘটনাটা এখনো আমার মনে দাগ কেটে আছে। সেদিন কী ভয়ংকর কাজটাই না আমি করতে যাচ্ছিলাম। ক্যাপ্টেন সাহেবের সুপরামর্শে আমি একটি হিংস্র কাজ করা থেকে বেঁচে গেলাম।