ডেসমন্ড টুটু: এক আলোর পথযাত্রী


  • জীবনজয়ী ডেস্ক  ঢাকা, বাংলাদেশ |
  • প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:৫০
ডেসমন্ড টুটু: এক আলোর পথযাত্রী
ডেসমন্ড টুটু। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

একটি দেশ তখনও বর্ণবৈষম্যের ক্ষত বয়ে চলেছে। আর সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কখনো রাজপথে, কখনো চার্চের মঞ্চে, কখনো বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তিনি।

নেলসন ম্যান্ডেলার পাশে থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে ওঠা সেই মানুষটি ডেসমন্ড টুটু। আজ তার জন্মদিন। 


প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার পাশাপাশি টুটু ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের শাসনের পুরোনো ব্যবস্থা অ্যাপার্টহেইডের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠগুলোর একজন।

অ্যাপার্টহেইডের অবসানের পরও তার ভূমিকা থামেনি। অ্যাংলিকান এই ধর্মযাজক নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের। বিভক্ত ও সংকটময় দক্ষিণ আফ্রিকায় তাই অনেকের কাছেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের বিবেক।

টুটুর মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট রামাফোসা তাকে বর্ণনা করেন ‘তুলনাহীন এক দেশপ্রেমিক’ হিসেবে। তার মতে, টুটু ছিলেন নীতি ও বাস্তববোধের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একজন নেতা।


কেপটাউনের ওয়েসিস ফ্রেইল কেয়ার সেন্টারে সেদিন সকালে শান্তিপূর্ণভাবে টুটুর মৃত্যু হয় বলে জানান তার কার্যালয়ের সমন্বয়কারী রামফেলা মামফেলে। পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।

এরপর একে একে আসতে থাকে বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধা। 

নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশন তাকে অসাধারণ একজন মানুষ হিসেবে স্মরণ করে। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা বলেন, টুটু ছিলেন সত্যিকারের মানবতাবাদী এবং মানবাধিকারের দৃঢ় সমর্থক।

পোপ ফ্রান্সিস তার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেন। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় অ্যাপার্টহেইডের অবসানে টুটু ‘নির্ণায়ক অবদান’ রেখেছিলেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন স্মরণ করেন তার আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ও অদম্য রসবোধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন বলেন, তাঁর উত্তরাধিকার সীমান্ত ছাড়িয়ে যুগের পর যুগ প্রতিধ্বনিত হবে।

আর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে টুটু ছিলেন একজন ‘নৈতিক দিশারি’।

১৯৮৪ সালে অ্যাপার্টহেইডের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পান টুটু।

নেলসন ম্যান্ডেলার মতো নেতারা যখন কারাগারে বন্দি, টুটু তখন দেশের সীমানা পেরিয়ে কথা বলে যাচ্ছিলেন। অ্যাংলিকান চার্চে তার অবস্থান এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারের মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিশ্বের সামনে তুলে ধরছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংগ্রাম।

২৭ বছর কারাগারে থাকার পর ম্যান্ডেলা যখন মুক্তি পেলেন, কেপটাউন সিটি হলের একটি বারান্দায় তাকে নিয়ে যান টুটু। সেখান থেকেই ম্যান্ডেলা মুক্তির পর তাঁর প্রথম জনসম্মুখের ভাষণ দেন।

এরপর আসে ১৯৯৪ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে টুটু তুলনা করেছিলেন ‘প্রেমে পড়ার’ সঙ্গে।

আর ম্যান্ডেলা যখন দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন, তখনও তাঁর পাশে ছিলেন টুটু।

অ্যাপার্টহেইডের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও টুটু পরে সমালোচনা করেন কৃষ্ণাঙ্গ রাজনৈতিক অভিজাতদেরও।

এমনকি তার সহযোগী ম্যান্ডেলাকেও রেহাই দেননি। ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে যে ‘সুবিধাভোগী মানসিকতা’ তৈরি হয়েছিল, তার সমালোচনা করেন তিনি। পরে ম্যান্ডেলার গ্রাসা মাচেলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও প্রকাশ্যে তাঁকে তিরস্কার করেন।

২০১৩ সালে ম্যান্ডেলার দল থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেন টুটু। দক্ষিণ আফ্রিকাকে তখন তিনি বলেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে অসম সমাজ’।

জীবনের শেষদিকে তিনি সহায়তায় মৃত্যুর অধিকারের পক্ষেও প্রচার শুরু করেন। ২০১৬ সালে ওয়াশিংটন পোস্ট-এ তিনি লিখেছিলেন, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের কখন এবং কীভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন, তা বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।

সহযোদ্ধা ও রাজনীতিক রেভারেন্ড অ্যালান বোয়েসাকের ভাষায়, টুটু জানতেন তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীরা এখনো সহিংসতার শিকার হন, সংবিধান থাকা সত্ত্বেও এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য রয়ে গেছে।

তাই সংগ্রামের যে দায়িত্ব তিনি একসময় নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের হাতেও সেটিই তুলে দিতে চেয়েছিলেন টুটু।

কারণ তার নিজের উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট: কাজ এখনো শেষ হয়নি।



ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

বেসি কোলম্যান: তাঁর আকাশে ওড়া ঠেকানো যায়নি

বেসি কোলম্যান: তাঁর আকাশে ওড়া ঠেকানো যায়নি

  • জাওয়াহ বিনতে মিজান স্বর্ণা|
  •  ১৬-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

০

ডেসমন্ড টুটু: এক আলোর পথযাত্রী

ডেসমন্ড টুটু: এক আলোর পথযাত্রী

  • জীবনজয়ী ডেস্ক|
  •  ০৭-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

০

কেন মেরি ‘কুশ্রীতম নারীর’ শিরোপা নিয়েছিলেন?

কেন মেরি ‘কুশ্রীতম নারীর’ শিরোপা নিয়েছিলেন?

  • মো. গালিব বাশীর|
  •  ০৩-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

০

ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী

ওসিওলা ম্যাককার্টি: মহৎপ্রাণ এক রজকিনী

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ১৯-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

০

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

‘মৃত্যুদেবী’: স্নাইপার লুডমিলা পাভলিচেঙ্কো

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ০৮-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

রোজা পার্কস: অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ

  • সুপ্তি রায়|
  •  ৩০-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: অসাধারণ সাধারণেরা

৫