বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?


  • মো. মাজহার উদ্দিন ভূঁঞা  |
  • প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫৮
অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?
ছবি: এআই

ধরা আক, নাম তার  সুরুজ। একজন ডেলিভারিম্যান। জীবিকার তাগিদে ভোরের আলো ফুটতেই মোটরবাইকের ইঞ্জিন গর্জন তুলে সে মহানগরী ঢাকার কোলাহলে বেরিয়ে পড়ে। একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে প্রথমেই সুরুজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখে। এরপর অ্যাপে আসা একটি নতুন অর্ডার গ্রহণ করে। অ্যাপ তাকে নির্দেশ দেয়, ৩০ মিনিটের মধ্যে ধানমন্ডি থেকে গুলশানে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। সে দ্রুত রাস্তায় নেমে পড়ে, ট্রাফিকের ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায়। সে জানে না, কার জন্য সে কী ডেলিভারি করছে। তার গতি, তার কাজ, এমনকি তার উপার্জনও নির্ধারণ করছে একটি অদৃশ্য শক্তি; অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদম তার প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর না জেনেই সে ছুটে চলে। এভাবে শুরু হয় একটি সাধারণ দিন, যেখানে মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে ডিজিটাল একটি সফটওয়্যার। অ্যালগরিদম!

গত এক দশকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সারা বিশ্বে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। পাঠাও, ফুডপান্ডা, উবারের মতো অ্যাপগুলো বাংলাদেশে অনেক তরুণের রোজগারের উপায় ও জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলো অ্যালগরিদম। এটি ঠিক করে কে কোন অর্ডার পাবে, কোন পথে যাবে, এমনকি কে কেমন কাজ করছে, তার মূল্যায়নও করে। অর্থাৎ, এটি রাইডারদের মধ্যে অর্ডার বণ্টন করে, ডেলিভারির রুট নির্ধারণ করে এবং তাঁদের কাজের দক্ষতা মূল্যায়ন করে। উদাহরণস্বরূপ, গুড ফুড (কল্পিত নাম) নামের একটি ফুড ডেলিভারি অ্যাপ তাৎক্ষণিক তথ্য ব্যবহার করে রাইডারদের কাছে অর্ডার পাঠায়। এতে কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব হয় বটে, কিন্তু রাইডারের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, অ্যালগরিদমের এই দক্ষতা আসলে কর্মীদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তাদের সময়, আচরণ ও জীবনযাত্রাকে বাস্তবিক অর্থেই প্রভাবিত করছে। 

এই ‘অ্যালগরিদমিক ম্যানেজমেন্ট’ শুরুতে কর্মীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় সমাধান বলে মনে হয়েছিল। অনেকেই একে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। এখানে নিজের সময় নিজেই বেছে নেওয়া যায়, কোনো বদরাগী বসের তিরস্কার শুনতে হয় না। কিন্তু এই স্বাধীনতা অনেকটা মরীচিকার মতো। যেমন ধরুন, একদিন এক রাইডার ট্রাফিক জ্যামে আটকে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে একটি ডেলিভারি সম্পন্ন করতে পারলেন না। অ্যাপ তাকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তার রেটিং কমিয়ে দিল এবং পারিশ্রমিকও কেটে নিল। এ ধরনের ঘটনা কর্মীদের মনে প্রশ্ন জাগায়, অ্যালগরিদম কি সত্যিই একটি সমাধান? নাকি এর অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া তাদের নতুন এক অনিশ্চয়তার খাঁচায় বন্দী করেছে?

এমন অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে, যেগুলো কর্মীদের ওপর অ্যালগরিদমের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এর গভীর প্রভাব পড়ছে তাদের দৈনন্দিন জীবনে; তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অনেক ফুড ডেলিভারি রাইডার প্রায়ই ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। কারণ, অ্যালগরিদমের নির্ধারিত লক্ষ্য—সময়মতো খাবার বা পণ্য পৌঁছে দেওয়া—পূরণ করতে না পারলে তাদের রেটিং কমে যায়, যা ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়। সময়মতো ডেলিভারি করতে গিয়ে তারা কখনো কখনো ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুতগতিতে মোটরবাইক চালান। ফলে তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। দ্রুত ডেলিভারি করতে গিয়ে কোনো রাইডার ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হলেও অ্যাপ চলবে নিজের নিয়মেই। সেখানে তার জন্য কোনো বিশেষ বিরতি বা বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা তাদের ব্যক্তিগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কেড়ে নেয়। ফলে শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। 

অনেক রাইডার রাতের বেলা ক্লান্ত হয়ে অ্যাপ বন্ধ করতে চাইলেও অ্যালগরিদমের ‘ইনসেনটিভ’ বা অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন তাকে আরও কাজ করতে উৎসাহিত করে। এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের স্বাধীন ইচ্ছাকে সীমিত করে তাদের অ্যালগরিদমের দাসে পরিণত করে। অ্যালগরিদমের এই আধিপত্য প্রশ্ন তোলে, মানুষ কি সত্যিই নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রক, নাকি অ্যালগরিদম মানুষকে নিজের পুতুল বানিয়ে ফেলেছে?

অ্যালগরিদমের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো এর অস্বচ্ছতা। ও জটিলতা বেশির ভাগ প্ল্যাটফর্মকর্মী জানেন না, কীভাবে অ্যালগরিদম তাদের কাজ বেছে দেয়, পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে বা রেটিং কমায়। অনেক সময় ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে কাজ করা কর্মীরা দেখতে পান, তাদের কাজের জন্য প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকের চেয়ে কম টাকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি অ্যাপের সাপোর্ট টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পান না। কখনো এমন জটিল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, যা তারা ঠিকমতো বুঝতেই পারেন না। এই অস্বচ্ছতা ও তথ্যগত জটিলতা কর্মীদের মনে অস্থিরতা ও অবিশ্বাস তৈরি করে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, অ্যালগরিদম বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু প্ল্যাটফর্মে নারী রাইডারদের কম অর্ডার দেওয়া হয়, কারণ অ্যালগরিদম তাদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এ ধরনের বৈষম্য কর্মীদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

অ্যালগরিদম কেবল কর্মীদের কাজই নিয়ন্ত্রণ করে না, তাদের সামাজিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলো কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করে দেয়। ফলে কর্মীরা একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া, কাজের ধরন এমন যে প্ল্যাটফর্মকর্মীরা মূলত বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেন। তাদের একত্র হওয়ার সুযোগ খুব একটা হয় না। ফলে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা বা সম্মিলিতভাবে দাবি উত্থাপনের সুযোগ কমে যায়। কখনো কখনো প্ল্যাটফর্মকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। তবু এসব প্রচেষ্টা সাধারণত শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেয় না।

বাস্তবতা হচ্ছে, অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এবার একটু আশার কথা বলা আক। 

অ্যালগরিদম বর্তমানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকলেও এটিকে আবার মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় প্ল্যাটফর্মকর্মীরা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে অ্যালগরিদমের অস্বচ্ছতা ও শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। উদাহরণস্বরূপ, অনেক জায়গায় ফেসবুকে রাইডাররা তাদের রেটিং কমে যাওয়া বা পারিশ্রমিক কেটে নেওয়ার অভিযোগ করছেন। এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে কিছুটা হলেও আলোচনা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সম্মিলিত প্রতিরোধের একটি ভিত্তি তৈরি হতে পারে। কোম্পানির মুনাফার বাইরেও কর্মীদের অধিকার তখন বড় বিষয় হিসেবে উঠে আসবে।

এ ছাড়া, অনেক দেশে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। জনপরিসরেও এ দাবি উঠছে। উদাহরণস্বরূপ, অ্যালগরিদমের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করার বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় আলোচনা চলছে। পুরোনো শ্রম আইন সংস্কার করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

মনে রাখা জরুরি, অ্যালগরিদম হয়তো একটি শক্তিশালী ও দক্ষ হাতিয়ার, কিন্তু এর জন্ম মূলত মানুষের সেবা করার জন্যই। তাই এর নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই মানুষের হাতে থাকতে হবে। আর এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে।  


ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?

অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?

  • মো. মাজহার উদ্দিন ভূঁঞা|
  •  ২৩-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

ভোটের মাঠে ডেটার খেলা

ভোটের মাঠে ডেটার খেলা

  • অর্ণব মিত্র উৎসব |
  •  ১১-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বাঁচবে যেসব পেশা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বাঁচবে যেসব পেশা

  • সানজিদা সিদ্দিকী মনমী |
  •  ২৭-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

প্রাচীন সভ্যতার ৮ আবিষ্কার, যেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব

প্রাচীন সভ্যতার ৮ আবিষ্কার, যেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ১১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

যে আবিষ্কারগুলো বদলে দিয়েছিল আধুনিক বিশ্ব

যে আবিষ্কারগুলো বদলে দিয়েছিল আধুনিক বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ২৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

দুর্ঘটনা থেকে আবিষ্কার: যেভাবে হঠাৎ পাওয়া জিনিস বদলে দিয়েছে বিশ্ব

দুর্ঘটনা থেকে আবিষ্কার: যেভাবে হঠাৎ পাওয়া জিনিস বদলে দিয়েছে বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০