বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

ভোটের মাঠে ডেটার খেলা


  • অর্ণব মিত্র উৎসব   |
  • প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২০:০৪
ভোটের মাঠে ডেটার খেলা
ছবি: এআই

নির্বাচন বা ভোট শুধু একটি শব্দ নয়। এটি ধারণ করে আপামর মানুষের আশা, ক্ষোভ, ভালোবাসা আর ঘৃণা। একসময় ভোট মানেই ছিল রঙিন পোস্টারে মুখচেনা প্রতিশ্রুতি, চায়ের দোকানে জমে ওঠা বিতর্ক, মিছিল-স্লোগানে কাঁপা দুপুর আর ইশতেহারের পাতায় পাতায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সময় তার ছন্দ বদলেছে। এখন ভোটে জেতা মানে শুধু জনসভায় গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়। মানুষের মনের অলিগলি চিনে নেওয়ার কৌশল জানাটাও এখন নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম হাতিয়ার। আর সেই কৌশলের আধুনিক উপকরণগুলোর একটি হলো ডেটা সায়েন্স, অর্থাৎ তথ্য বিশ্লেষণের বিজ্ঞান।

এখন রাজনীতি ও গণতন্ত্রের নির্বাচনী লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ, তথ্যচিত্র আর সংখ্যার খেলা। ভোটারদের আচরণ, পছন্দ, ভয় ও বিশ্বাস বিশ্লেষণ করে তৈরি হয় একেকটি কৌশল, একেকটি বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য আলাদা প্রচারণা।

বিভিন্ন ধরনের ভোটারের মধ্যে কাকে কী বললে ভোট পাওয়া যেতে পারে, কে কোন বিষয়ে সংবেদনশীল আর কোথায় বিরোধীরা দুর্বল, তা যদি আগেই জানা যায়, তাহলে কেমন হয়? এমন তথ্য হাতে থাকলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তথ্য বিশ্লেষণ। মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, এমনকি গুগলে কী খোঁজা হচ্ছে, সেই তথ্যও বিশ্লেষণ করা হতে পারে রাজনৈতিক কৌশল তৈরির জন্য। কে ভোট দিতে আগ্রহী, কার কাছে কোন বার্তা পৌঁছানো দরকার, আর কোন বিষয়ে ভোটারদের সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তা বোঝার চেষ্টা করা হয় এসব তথ্যের সাহায্যে। রাজনীতির মাঠে মানুষের মনই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য।

ভারতের উদাহরণ দেওয়া যাক। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির প্রচারণায় তথ্যপ্রযুক্তি ও ভোটারদের তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবহার বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন অঞ্চল ও ভোটারগোষ্ঠীর মনোভাব বোঝার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়। কোন এলাকায় তরুণদের কাছে বেকারত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কোথায় কৃষকদের সমস্যা বেশি আলোচিত, কিংবা কোন অঞ্চলে কোন বিষয় নিয়ে প্রচারণা চালানো দরকার, এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রচারের বার্তা তৈরির সুযোগ তৈরি হয়। রাজনীতির প্রচারণা অনেকটা পণ্য বা ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের মতো নির্দিষ্ট ক্রেতা বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সাজানো হতে থাকে।

২০১৯ সালের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণার ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়। বিজেপির প্রচারণায় নমো (NaMo) অ্যাপ, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহৃত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে কোথায় প্রচারণা জোরদার করা দরকার, কোন বার্তা বেশি সাড়া পাচ্ছে এবং কী ধরনের প্রচারসামগ্রী বেশি ছড়াচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়। জনপ্রিয় হ্যাশট্যাগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচারণাও এই কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে এসে তথ্যের ব্যবহার আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। শুধু বিজেপি নয়, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ডিজিটাল প্রচারণা ও তথ্য বিশ্লেষণের নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে। ভোটারদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য আলাদা বার্তা তৈরির কৌশল গুরুত্ব পায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে বক্তৃতা, ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য প্রচারসামগ্রী তৈরির সুযোগও বাড়ে। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করা হয়। এসব বিশ্লেষণ থেকে কোনো এলাকার মানুষের মনোভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হলেও অনলাইনে পাওয়া প্রতিক্রিয়া দিয়ে পুরো এলাকার মানুষের মতামত নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না।

বিশ্বজুড়েই নির্বাচনী প্রচারণায় তথ্য বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ভোটারদের তথ্য বিভিন্ন দলে ভাগ করতে কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয়। তথ্য সহজে বোঝার জন্য তৈরি করা হয় নানা ধরনের চিত্র ও লেখচিত্র। মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যবহার করা হয় স্বয়ংক্রিয় কথোপকথনের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য শনাক্ত ও যাচাই করার কাজেও প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া সম্ভব। রাজনীতির লড়াই তাই এখন শুধু জনসভা, মিছিল কিংবা প্রচারপত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বড় অংশ চলছে ডিজিটাল পরিসরেও।

তবে তথ্যের এই ব্যবহার শুধু নির্বাচনী কৌশল তৈরির প্রশ্ন নয়। ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ, ভুল বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তি যেমন ভোটারদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ায়, তেমনি এর অপব্যবহার মানুষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ভোটের মাঠে তথ্যের খেলা বুঝতে হলে প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নৈতিক ব্যবহার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। 


ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

         

  রেটিং: ০

এই বিভাগের আরও পোস্ট

অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?

অ্যালগরিদম মানুষের, নাকি মানুষ অ্যালগরিদমের?

  • মো. মাজহার উদ্দিন ভূঁঞা|
  •  ২৩-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

ভোটের মাঠে ডেটার খেলা

ভোটের মাঠে ডেটার খেলা

  • অর্ণব মিত্র উৎসব |
  •  ১১-১০-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বাঁচবে যেসব পেশা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে বাঁচবে যেসব পেশা

  • সানজিদা সিদ্দিকী মনমী |
  •  ২৭-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

প্রাচীন সভ্যতার ৮ আবিষ্কার, যেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব

প্রাচীন সভ্যতার ৮ আবিষ্কার, যেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ১১-০৯-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

যে আবিষ্কারগুলো বদলে দিয়েছিল আধুনিক বিশ্ব

যে আবিষ্কারগুলো বদলে দিয়েছিল আধুনিক বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ২৮-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০

দুর্ঘটনা থেকে আবিষ্কার: যেভাবে হঠাৎ পাওয়া জিনিস বদলে দিয়েছে বিশ্ব

দুর্ঘটনা থেকে আবিষ্কার: যেভাবে হঠাৎ পাওয়া জিনিস বদলে দিয়েছে বিশ্ব

  • জীবনজয়ী ডেস্ক |
  •  ২১-০৮-২০২৬
ক্যাটাগরি: বিজ্ঞান-প্রযুক্তি

০