তখন অবশ্য এসবের অনেক কিছুই আজকের মতো ছিল না। সময়ের সঙ্গে বদলেছে ব্যবহার, উন্নত হয়েছে প্রযুক্তি, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে বদলে গেছে ধারণাটিও। তবু প্রাচীন মানুষের সেই উদ্ভাবনী চিন্তার ওপরই গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
চলুন হিস্ট্রি ডট কমের সৌজন্যে ফিরে দেখা যাক এমন আটটি উদ্ভাবনের গল্প।
আজকের কাগজের বহু আগে, প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ সালের দিকে মিসরীয়রা প্যাপিরাস উদ্ভিদ থেকে লেখার উপযোগী পাতলা ও শক্ত উপকরণ তৈরি করেছিল। নীল নদের তীরে প্রচুর জন্মানো প্যাপিরাস গাছের ভেতরের নরম অংশ বা মজ্জা লম্বা করে কেটে একটির সঙ্গে আরেকটি বুনে দেওয়া হতো। এরপর চাপ দিয়ে সেগুলোকে একসঙ্গে আটকে তৈরি করা হতো পাতলা শিট।
শুধু লেখার উপকরণই নয়, মিসরীয়রা কাটা নলখাগড়া দিয়ে এমন কলমও বানিয়েছিল, যা প্যাপিরাসের ওপর লেখার জন্য যথেষ্ট শক্ত ছিল। কালি তৈরিতে তারা কালি বা কালো কালি-জাতীয় উপাদানের সঙ্গে মোম ও উদ্ভিজ্জ আঠা ব্যবহার করত।
এই প্রাচীন প্রযুক্তির স্থায়িত্বও বিস্ময়কর। প্যাপিরাসে লেখা বহু নথি আজও টিকে আছে এবং কিছু ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় পরেও পড়া যায়।
চোখের চারপাশে গাঢ় কাজল বা কোল ব্যবহার করার চলও নতুন নয়। প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ সালেই প্রাচীন মিসরীয়রা চোখ সাজাতে কোল তৈরি করত। এর জন্য তারা ধোঁয়ার কালি বা কালো উপাদানের সঙ্গে গ্যালেনা নামের একটি খনিজ মিশিয়ে নিত।
প্রাচীন কিছু চিত্রে মিসরীয়দের সবুজ চোখের প্রসাধন ব্যবহার করতেও দেখা যায়। এই রং তৈরি করতে গ্যালেনার সঙ্গে ম্যালাকাইট নামের আরেকটি খনিজ ব্যবহার করা হতো।
মজার বিষয় হলো, শুধু নারীরাই নয়, প্রাচীন মিসরে পুরুষরাও চোখে কোল ব্যবহার করতেন। সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর কিছু চিকিৎসাগত ও সুরক্ষামূলক গুণ আছে বলেও তারা বিশ্বাস করতেন। এমনকি অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার সঙ্গেও এর ব্যবহারকে যুক্ত করা হতো।
‘গণতন্ত্র’ শব্দটির উৎস প্রাচীন গ্রিক শব্দ ডেমোক্রাতিয়া, যার অর্থ মোটামুটি ‘জনগণের শাসন’। খ্রিষ্টপূর্ব ৫০৭ সালের দিকে এথেন্সের শাসক ক্লেইস্থেনিসের সংস্কারের মাধ্যমে এথেন্সে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা গণতান্ত্রিক শাসনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে।
এই ব্যবস্থায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল। এক্লেসিয়া বা সাধারণ সভা আইন প্রণয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিত। বুলে ছিল বিভিন্ন এথেনীয় গোত্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি পরিষদ। আর ডিকাস্টেরিয়া ছিল জনগণের অংশগ্রহণে পরিচালিত আদালতব্যবস্থা।
তবে এই গণতন্ত্র আজকের গণতন্ত্রের মতো সর্বজনীন ছিল না। ১৮ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ নাগরিকরাই মূলত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ পেতেন। ফলে এথেন্সের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত।
তবু জনগণের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নাগরিকের ভূমিকা এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রাচীন গ্রিসে যে ধারণাগুলোর বিকাশ হয়েছিল, তা পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আজ ম্যারাথন মানেই দীর্ঘ দূরত্বের একটি জনপ্রিয় দৌড় প্রতিযোগিতা। কিন্তু এর গল্পের শুরু যুদ্ধের মাঠে।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯০ সালে ম্যারাথনের যুদ্ধে পারসিকদের বিরুদ্ধে এথেনীয়দের বিজয়ের খবর পৌঁছে দিতে এক গ্রিক সৈনিক ম্যারাথন থেকে এথেন্স পর্যন্ত দৌড়েছিলেন। দূরত্ব ছিল ২৬ মাইলের কিছু বেশি। এথেন্সে পৌঁছে খবর দেওয়ার পরই তিনি মারা যান বলে প্রচলিত আছে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই গল্পের সঙ্গে আরেক গ্রিক বার্তাবাহক ফেইডিপ্পিডিসের কাহিনি মিশে যায়। যুদ্ধের আগেই ফেইডিপ্পিডিস এথেন্স থেকে স্পার্টা পর্যন্ত দৌড়ে পারসিক আক্রমণের খবর জানিয়েছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার অসমতল পথ তিনি মাত্র দুই দিনে পাড়ি দিয়েছিলেন বলে বলা হয়।
আধুনিক ম্যারাথন দৌড় অবশ্য আরও পরে শুরু হয়। ১৮৯৬ সালে এথেন্সে পুনরায় আয়োজিত অলিম্পিক গেমসে প্রথম আধুনিক ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়। সেটিতে জয়ী হন গ্রিক দৌড়বিদ স্পাইরিডন লুইস।
আজকের শহর, সেতু কিংবা ভবন কংক্রিট ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। অথচ এর একটি প্রাচীন সংস্করণ প্রায় ২১০০ বছর আগেই ব্যবহার করত রোমানরা।
রোমানরা ওপুস ক্যায়েমেন্তিসিয়াম, অর্থাৎ রোমান কংক্রিট, তৈরিতে চুনাপাথর ও আগ্নেয়গিরির ছাই মিশিয়ে এক ধরনের মর্টার তৈরি করত। এর সঙ্গে ইটের টুকরা কিংবা আগ্নেয়গিরির পাথর মিশিয়ে তৈরি করা হতো নির্মাণের মূল উপকরণ।
এই উপাদান দিয়েই রাস্তা, সেতু, জলপথ, ভবনসহ অসংখ্য স্থাপনা তৈরি হয়েছিল। রোমের প্যানথিয়ন ও কলোসিয়ামের মতো বিখ্যাত স্থাপনাতেও রোমান নির্মাণপ্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়।
আধুনিক কংক্রিটের তুলনায় রোমান কংক্রিট তুলনামূলক দুর্বল হলেও এর স্থায়িত্ব বিস্ময়কর। সমুদ্রের পানির মতো ক্ষয়কারী পরিবেশেও বহু শতাব্দী ধরে এর কিছু স্থাপনা টিকে আছে।
খবর প্রকাশের ধারণাটিও আধুনিক পৃথিবীর একচেটিয়া আবিষ্কার নয়।
প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১৩১ সালে প্রাচীন রোমে প্রকাশিত অ্যাক্টা ডিউর্না, অর্থাৎ ‘দৈনিক ঘটনাবলি’, ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ঘটনার লিখিত বিবরণ। সামরিক বিজয়, গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই, বিভিন্ন খেলা, জন্ম-মৃত্যুর খবর এমনকি মানুষের আগ্রহের নানা ঘটনাও এতে থাকত।
এসব খবর ধাতু বা পাথরের ওপর লিখে জনসমাগমপূর্ণ জায়গায়, যেমন রোমান ফোরামে, প্রদর্শন করা হতো। পরবর্তী সময়ে জুলিয়াস সিজারের প্রথম কনসালত্বের সময় অ্যাক্টা সেনাটুস নামের আরেক ধরনের নথিতে রোমান সিনেটের কার্যক্রম লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়।
আধুনিক সংবাদপত্রের মতো মুদ্রিত কাগজে এগুলো প্রকাশিত হতো না। কিন্তু নিয়মিতভাবে জনসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড প্রকাশের কারণে অ্যাক্টা ডিউর্নাকে আধুনিক সংবাদপত্রের একটি প্রাচীন পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চকোলেটের গল্পও শুরু হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে, আমেরিকা মহাদেশে।
মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়া, অ্যাজটেক ও টলটেক সভ্যতার মানুষ তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে কোকো গাছ চাষ করত। কোকো বীজ ব্যবহার করে তারা এক ধরনের ফেনাযুক্ত পানীয় তৈরি করত। এটি তাদের কাছে একই সঙ্গে শক্তিবর্ধক পানীয়, মন প্রফুল্ল করার উপাদান এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়াতে সক্ষম পানীয় হিসেবে পরিচিত ছিল।
মায়াদের কাছে কোকো গাছ ছিল পবিত্র। কোকো বীজের মূল্য এত বেশি ছিল যে একসময় তা মুদ্রার মতোও ব্যবহার করা হতো।
ষোড়শ শতকে সোনা ও রুপার সন্ধানে আমেরিকা মহাদেশে যাওয়া স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা কোকো ও চকোলেটের সঙ্গে ইউরোপীয়দের পরিচয় করিয়ে দেয়। এরপর ইউরোপে চকোলেটের জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই জনপ্রিয়তা যে আজও কমেনি, তা বলাই বাহুল্য।
সংখ্যার জগতে শূন্যকে আমরা এতটাই স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করি যে এর গুরুত্ব আলাদা করে ভাবি না। অথচ মানবসভ্যতার ইতিহাসে শূন্যের ধারণা তুলনামূলকভাবে অনেক পরে বিকশিত হয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালের পর কোনো এক সময়ে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা সুমেরীয় গণনাপদ্ধতিকে আরও উন্নত করে একটি শূন্য-সদৃশ প্রতীককে স্থানধারক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। অর্থাৎ কোনো একটি ঘরে সংখ্যা না থাকার বিষয়টি বোঝাতে এই প্রতীক ব্যবহৃত হতো। মায়া সভ্যতাতেও প্রায় একই সময়ে স্বাধীনভাবে শূন্যকে স্থানধারক হিসেবে ব্যবহারের ধারণা তৈরি হয়। তারা জটিল বর্ষপঞ্জি ব্যবস্থায় এর ব্যবহার করত।
তবে তখনও শূন্যকে আজকের অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়নি। গণিতের সমীকরণে এর ব্যবহারও ছিল না।
শূন্যের ধারণা আরও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় সপ্তম শতকে ভারতে। হিন্দু জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যকে একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করে গাণিতিক হিসাব ও সমীকরণে এর ব্যবহারের নিয়ম ব্যাখ্যা করেন।
আজকের গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কম্পিউটিংয়ের কথা ভাবলে বোঝা যায়, শূন্যের এই ধারণা মানবসভ্যতার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন সভ্যতাগুলোর এসব উদ্ভাবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। আধুনিক পৃথিবীর অনেক ‘নতুন’ ধারণার আসলে শিকড় বহু দূরের অতীতে। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বদলেছে, উন্নত হয়েছে, কখনো নতুন অর্থ পেয়েছে। কিন্তু মানুষের কৌতূহল, প্রয়োজন আর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা যে হাজার হাজার বছর ধরেই একইভাবে কাজ করে আসছে, এসব উদ্ভাবনের ইতিহাস তারই প্রমাণ।