জর্জ আর আর মার্টিনের বিখ্যাত সৃষ্টি আ সং অফ দ্য আইস অ্যান্ড ফায়ার এবং এর টেলিভিশন অভিযোজন গেম অফ থ্রোনস -এর দর্শকেরা ডায়ারওলফের সঙ্গে পরিচিত। স্টার্ক পরিবারের প্রতীক হিসেবে গল্পে ডায়ারওলফ শুধু ভয়ংকর শিকারি নয়, আনুগত্য ও আভিজাত্যেরও প্রতীক। ডায়ারওলফ কেবল কল্পকাহিনির প্রাণী নয়। বাস্তবেই একসময় উত্তর আমেরিকায় বিচরণ করত এই বিলুপ্ত শিকারি ক্যানিড।
২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান কলোসাল বায়োসায়েন্সেস ঘোষণা করে, জেনেটিক প্রকৌশলের মাধ্যমে তারা বিলুপ্ত ডায়ারওলফের কিছু বৈশিষ্ট্য পুনর্নির্মাণ করেছে। তিনটি শাবকের জন্মের পর প্রতিষ্ঠানটি এগুলোকে ডায়ারওলফ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এগুলো প্রকৃত ডায়ারওলফ নয়; বরং ডায়ারওলফের নির্বাচিত বৈশিষ্ট্য ধারণকারী জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত গ্রে উলফ। কলোসাল বায়োসায়েন্সেস, দ্য গার্ডিয়ানসহ কয়েকটি সূত্র অবলম্বনে লিখিত জীবনজয়ী প্রতিবেদন।
ডায়ারওলফের ইতিকথা
ডায়ারওলফের বৈজ্ঞানিক নাম এনোসায়ন ডাইরাস (Aenocyon dirus)। প্লাইস্টোসিন তথা বরফ যুগে (আনুমানিক ২৬ লাখ বছর আগে থেকে ১২ হাজার বছর আগে পর্যন্ত) উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী এই প্রাণী ছিল বড় আকারের শিকারি ক্যানিড। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রাচীন ডিএনএ গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়ারওলফ ও আধুনিক গ্রে উলফ দেখতে কাছাকাছি হলেও তারা বিবর্তনের স্বতন্ত্র শাখার সদস্য। তাদের বিবর্তনীয় পথ কয়েক মিলিয়ন বছর আগে আলাদা হয়ে যায়।
বিজ্ঞানের ‘জাদু’
কলোসালের গবেষকেরা একটি প্রায় ৭২ হাজার বছরের পুরোনো ডায়ারওলফের নমুনা এবং ১৩ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি দাঁত থেকে পাওয়া প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। এরপর গ্রে উলফের কোষে ১৪টি জিনে মোট ২০টি নির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা হয়। কলোসালের দাবি অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়ারওলফের কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যেমন বড় মাথার খুলি, প্রশস্ত কাঁধ, পেশিবহুল পা ও হালকা রঙের পশম পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাচীন ডায়ারওলফের ডিএনএ সরাসরি গ্রে উলফের জিনোমে বসানো হয়নি। বরং CRISPR প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রে উলফের বিদ্যমান জিনে নির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা হয়। এরপর পরিবর্তিত কোষের নিউক্লিয়াস ক্লোনিং প্রযুক্তিতে ব্যবহার করে তৈরি ভ্রূণ সারোগেট কুকুরের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
এভাবেই জন্ম নেয় রোমুলাস, রেমাস ও খালিসি। রোমুলাস ও রেমাসের জন্ম ২০২৪ সালের অক্টোবরে এবং খালিসির জন্ম ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে।
মজার বিষয় হলো, ডায়ারওলফকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে পরিচিত করে তোলা জর্জ আর আর মার্টিন কলোসালের একজন বিনিয়োগকারী ও সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা। ফলে তাঁর কল্পনায় জনপ্রিয় হওয়া প্রাণীকে ঘিরে বাস্তব বিজ্ঞানের এই উদ্যোগে রূপকথা ও প্রযুক্তির এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রার উল্টোপিঠ
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সত্যিই ডায়ারওলফ?
এখানেই বিতর্ক। কলোসাল এগুলোকে ডি-এক্সটিঙ্কশন বা বিলুপ্তি থেকে ফিরিয়ে আনার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু সমালোচক বিজ্ঞানীদের মতে, কয়েকটি জিনে পরিবর্তন এনে একটি গ্রে উলফকে বিলুপ্ত ডায়ারওলফে পরিণত করা যায় না। একটি প্রজাতির বৈশিষ্ট্য তার বিপুল জিনগত বিন্যাস, জিনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের ফল।
আরও বড় প্রশ্ন বাস্তুতন্ত্র নিয়ে। ডায়ারওলফ যে পৃথিবীতে বাস করত, সেই জলবায়ু, আবাসস্থল, খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাণী আজ আর নেই। ফলে তার কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য পুনর্নির্মাণ করা গেলেও সেই প্রাণীকে তার হারানো পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, বর্তমানের অসংখ্য প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, জীবিত ও বিপন্ন প্রজাতি রক্ষায় এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বিলুপ্ত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য পুনর্নির্মাণ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
ডায়ারওলফের গল্প তাই শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাফল্যের গল্প নয়। এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে: আমরা কি হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর কিছু বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে চাই, নাকি তার সম্পূর্ণ বিবর্তনীয় পরিচয় ও বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকাও ফিরিয়ে আনতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। আর সেই কারণেই ডায়ারওলফের ‘প্রত্যাবর্তন’ যতটা চমকপ্রদ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এর বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক বিতর্ক।