হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অ্যাশ সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনোভেশন (২০২৫), আরটিএস ল্যাব (২০২৪) এবং এমআইটি টেকনোলজি রিভিউতে (২০২৩) প্রকাশিত লেখার আলোকে জীবনজয়ী প্রতিবেদন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎই চোখে পড়ল আপনার প্রিয় রাজনীতিবিদের একটি ঝকঝকে বক্তৃতা। দেখেই ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন। লাইক, শেয়ারও করে ফেললেন। কিন্তু অল্প সময় পর জানতে পারলেন, এটি আপনার প্রিয় সেই রাজনীতিবিদের দেওয়া কোনো বক্তৃতাই ছিল না। বরং সেটি তৈরি করা হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence-AI) সাহায্যে, যা কিছু সময়ের জন্য আপনার উপলব্ধি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।
হ্যাঁ, বিষয়টি এখন আর কল্পনা নয়; বাস্তবতা। রাজনৈতিক অঙ্গনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে এ-সংক্রান্ত নানা তথ্য উঠে এসেছে। ভবিষ্যৎ বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রাজনীতিতে কতটা ইতিবাচক ও নেতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে এবং ইতোমধ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েই এই আলোচনা।
প্রযুক্তির উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে রাজনীতির মঞ্চেও। আর সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে এআই। এর ব্যবহার ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ভারতের গত নির্বাচনী প্রচারণায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে এআই শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন তৈরি, ভোটারদের লক্ষ্যভিত্তিকভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃত্রিম কণ্ঠস্বর বা ভিডিও তৈরির মতো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ডিপফেক ভিডিও বা এআই-নির্ভর ভয়েস ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রার্থী বা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বক্তব্যের মতো কনটেন্ট তৈরি করে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য ভাষা ও ভয়েস মডেলের সহায়তায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের কাছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বার্তা পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে একই ধরনের অডিও বার্তা সব ভোটারের কাছে পাঠানো হতো, সেখানে এখন ভিন্ন ভিন্ন ভোটারের কাছে তাদের আগ্রহ ও উদ্বেগ অনুযায়ী ভিন্ন বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অনেক ভোটারের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে যে প্রার্থী যেন তাদের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ও সমস্যার কথাই বলছেন।
তবে হার্ভার্ডের অ্যাশ সেন্টারের বিশ্লেষণ এআইয়ের নীতিগত দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তারা কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—
১. কোন ধরনের এআই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে এবং কোনটি সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হবে? ২. এআই ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য বা অপপ্রচার ছড়ানো হলে তার দায়ভার কে নেবে? ৩. এআই আধুনিক বিশ্বের নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠছে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কারা?
এমআইটি টেকনোলজি রিভিউর একটি প্রতিবেদনে এআই রাজনীতিকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন করতে পারে, তার ছয়টি প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রথমত, মানুষের দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে এআই খসড়া আইনপ্রস্তাব তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও আইনসভায় এমন কিছু বিল উপস্থাপিত হয়েছে, যেগুলোর খসড়া তৈরির প্রক্রিয়ায় এআইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। একইভাবে কিছু আইনপ্রণেতা তাদের বক্তব্য বা নীতিগত নথি তৈরিতেও এআই ব্যবহার করছেন।
দ্বিতীয়ত, এআই বিদ্যমান আইন বিশ্লেষণ করে ছোট ছোট সংশোধনী বা পরিবর্তনের প্রস্তাব দিতে পারে। এই ধরনের ক্ষুদ্র আইনগত পরিবর্তনকে অনেক ক্ষেত্রে ‘মাইক্রোলেজিসলেশন’ বলা হয়।
তৃতীয়ত, রাজনীতিতে এআইয়ের বড় প্রভাবগুলোর অনেকটাই দৃশ্যমান হবে না। রাজনৈতিক প্রচারণাকারী, জরিপকারী ও কৌশল নির্ধারকেরা জনমত বিশ্লেষণ এবং কার্যকর বার্তা তৈরির ক্ষেত্রে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এআই নিজেই আরও কার্যকর রাজনৈতিক বার্তা তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, এআই-নির্ভর রাজনৈতিক উদ্যোগ বা মতাদর্শভিত্তিক সংগঠনের ধারণাও সামনে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে ২০২২ সালের ডেনমার্কের ‘সিনথেটিক পার্টি’র কথা উল্লেখ করা যায়। একটি শিল্পীগোষ্ঠী তৈরি করা এআই চ্যাটবট মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘোষণাপত্র বিশ্লেষণ করে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। যদিও তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন অর্জন করতে পারেনি।
পঞ্চমত, আধুনিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তহবিল সংগ্রহ। এই ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এমনকি ‘অটো-হাসলিং’ নামে একটি ধারণা নিয়ে কাজ হচ্ছে, যেখানে এআই নিজেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আয় সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ষষ্ঠত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি নীতিনির্ধারণ ও সেবাপ্রদান ব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই নীতিনির্ধারণকে আরও তথ্যভিত্তিক, কার্যকর ও দ্রুততর করতে পারে।
এআইকে কেবল হুমকি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এটি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করে তুলতে পারে। ভোটার শিক্ষা, নীতিনির্ধারণ এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
নিঃসন্দেহে এআই রাজনীতিকে বদলে দিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন আমাদের জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি নতুন ধরনের সংকট তৈরি করবে, তা নির্ভর করবে এর ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত কাঠামোর ওপর। তাই প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া নয়, বরং দায়িত্বশীল ও নৈতিকভাবে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।